বাঙালির ভূতের জগৎ বেশ বৈচিত্র্যময়। সেখানে যেমন আছে মেছোভূত, মামদোভূত, ব্রহ্মদৈত্য, তেমনই রয়েছে শাঁখা-পলা পরা এক রহস্যময়ী নারী আত্মা—শাকচুন্নি। তাঁকে কিন্তু সাধারণ ভূত ভাবলে ভুল হবে! কারণ তাঁর সাজপোশাক থেকে শুরু করে খাবারের পছন্দ, সবকিছুর মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে এক বিবাহিত বাঙালি নারীর পরিচয়।
লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, শাকচুন্নি আসলে এমন এক বিবাহিত নারীর আত্মা, যাঁর জীবনে রয়ে গিয়েছিল কিছু অপূর্ণ ইচ্ছা। কারও বিশ্বাস, স্বামীর সংসারে অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে তাঁর মৃত্যু হয়েছিল। আবার কারও মতে, স্বাভাবিক বিবাহিত জীবনের স্বপ্ন পূরণ হওয়ার আগেই পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হয়েছিল তাঁকে। আর সেই অপূর্ণতাই নাকি তাঁকে মৃত্যুর পরেও সংসারের মায়ায় আটকে রেখেছে।
নামটির উৎপত্তি নিয়ে প্রচলিত ব্যাখ্যা অনুযায়ী, শাকচুন্নি এসেছে ‘শঙ্খচূর্ণী’ শব্দ থেকে। শঙ্খ অর্থাৎ বিবাহিত বাঙালি নারীর হাতে থাকা সাদা শাঁখা। প্রচলিত বাঙালি রীতিতে শাঁখা, পলা ও লোহার চুড়ি বিবাহিত নারীর সাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আর লোককথার শাকচুন্নির হাতেও নাকি থাকে সেই শাঁখা-পলা।
অর্থাৎ, মৃত্যুর পরেও তাঁর হাত থেকে মুছে যায়নি বিবাহিত জীবনের চিহ্ন। বরং সেই সাজই হয়ে উঠেছে তাঁর পরিচয়।
শাকচুন্নির গল্পে আরও একটি মজার বিষয় রয়েছে তাঁর খাবারের পছন্দ। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, মাছ তাঁর ভীষণ প্রিয়। বিশেষ করে ইলিশ মাছের প্রতি রয়েছে আলাদা দুর্বলতা! বাড়িতে মাছ রান্না হচ্ছে শুনলেই নাকি রান্নাঘরের আশপাশে তাঁর আনাগোনা শুরু হয়।
এখানেই শাকচুন্নির সঙ্গে বিধবার আত্মার একটা লোকবিশ্বাসভিত্তিক পার্থক্য টানা হয়। কারণ শাকচুন্নি বিবাহিত নারীর পরিচয় বহন করেন, আর মাছের প্রতি তাঁর ভালোবাসাও সেই পরিচয়ের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়েছে।
লোককথার সবচেয়ে রহস্যময় অংশটি এখানেই। বলা হয়, শাকচুন্নিরা নিজেদের অপূর্ণ বিবাহিত জীবনের আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে চায়। সেই কারণেই কখনও কখনও তাঁরা অন্য বিবাহিত নারীদের লক্ষ্য করেন। এমনকী কোনও তরুণী বিবাহিত নারীর শরীরে ভর করে তাঁর সংসারজীবন নিজেদের মতো করে যাপন করার চেষ্টা করেন বলেও প্রচলিত বিশ্বাস রয়েছে।
কিছু লোককথায় আবার স্বামীর পরিবারের উপর শাকচুন্নির প্রতিশোধ নেওয়ার গল্পও শোনা যায়। তাঁদের স্বভাব নাকি বেশ অভিমানী। সামান্য অপমানেও তাঁরা রেগে যেতে পারেন। আর সাধারণ উপায়ে তাঁদের তাড়ানো যায় না, এমনটাই বিশ্বাস করেন অনেকে। শামানিক আচার-অনুষ্ঠান বা বিশেষ ঝাড়ফুঁকের মাধ্যমেই নাকি তাঁদের বিতাড়িত করা সম্ভব।
সব মিলিয়ে শাকচুন্নি শুধুই একটি ভৌতিক চরিত্র নয়। বাংলার লোকবিশ্বাস, বিবাহিত নারীর সামাজিক পরিচয়, শাঁখা-পলার ঐতিহ্য এবং অপূর্ণ ইচ্ছার এক অদ্ভুত মিশেল।

তাই ভূত চতুর্দশীর রাতে চোদ্দো প্রদীপ জ্বালানোর পাশাপাশি মনে পড়তেই পারে এই শাঁখা-পলা পরা রহস্যময়ী আত্মার কথা। তবে বাড়িতে ইলিশ মাছ রান্না হলে রান্নাঘরের দিকে একটু নজর রাখবেন! কে জানে, কোনও শাকচুন্নির নজর পড়েছে কি না!
Leave a comment