কলকাতা: রাজধানী দিল্লির মারাত্মক দূষণের ছবি এবার কি তবে তিলোত্তমা কলকাতাতেও আছড়ে পড়তে চলেছে? দীপাবলি ও কালীপুজোর ঠিক দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে এই মুহূর্তে সবথেকে বড় এবং ভয়ের প্রশ্নটি হয়ে দাঁড়িয়েছে এটাই।
উৎসবের আনন্দ যখন চারদিকে ঠিক তখনই উৎসবের অনুষঙ্গ হিসেবে আসা লাগাতার বাজি ফাটানো এবং আবহাওয়ার খামখেয়ালিপনায় কলকাতার বাতাসে মিশতে শুরু করেছে অদৃশ্য বিষ। আলিপুর আবহাওয়া দফতর ও দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের রিপোর্ট বলছে, উৎসবের আলোর রোশনাইয়ের মাঝেই বিষাক্ত ধোঁয়াশা ও দূষণের কড়াল গ্রাসে ঢেকেছে শহর কলকাতা।
তবে একদিকে যখন দূষণের কালো মেঘে আকাশ ভারাক্রান্ত, ঠিক তখনই রাজ্যবাসীর জন্য সামান্য স্বস্তির বার্তা নিয়ে বঙ্গে নামতে শুরু করেছে শীতের আমেজ। দীপাবলির ঠিক আগে থেকেই রাতের পারদ পতনের পূর্বাভাস দিয়েছে হাওয়া অফিস।
গত ৬ নভেম্বর কলকাতার বাতাসের গুণগত মান বা একিউআই (AQI) রেকর্ড করা হয়েছে ১৯৬-এ। এর মধ্যে সবথেকে বিপজ্জনক বিষয় হলো পিএম ২.৫ (PM 2.5)-এর মাত্রা পৌঁছে গিয়েছে ১১৮ মাইক্রোগ্রামে।
ভারতীয় পরিবেশ মন্ত্রকের নির্ধারিত জাতীয় মানদণ্ড অনুযায়ী, দৈনিক প্রতি ঘনমিটার বাতাসে পিএম ১০ এবং পিএম ২.৫-এর নিরাপদ মাত্রা যথাক্রমে সর্বোচ্চ ১০০ এবং ৬০ মাইক্রোগ্রাম হওয়ার কথা। কিন্তু বর্তমান কলকাতার প্রতি ঘনমিটার বাতাসে ১০৫ মাইক্রোগ্রাম পিএম ১০ এবং ১১৮ মাইক্রোগ্রাম পিএম ২.৫ পাওয়া যাওয়ার অর্থ স্পষ্ট এই বিষাক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস নেওয়া মানে নিজের ফুসফুসকে তিলে তিলে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া।
পরিবেশবিদ ও চিকিৎসকদের মতে, পিএম ২.৫ হল অত্যন্ত সূক্ষ্ম ধূলিকণা, যা সহজেই মানবদেহের ফুসফুসের একদম গভীরে প্রবেশ করতে পারে। ফলে এই ধরনের দূষিত বায়ুতে দীর্ঘক্ষণ শ্বাস নিলে শুধু যে ফুসফুস ক্ষতিগ্রস্ত হয় তা নয়, মারাত্মক প্রভাব পড়ে হার্ট বা হৃদযন্ত্র, চোখ ও সংবেদনশীল ত্বকের ওপরও।
বিশেষ করে হাঁপানি রোগী, শিশু এবং বয়স্কদের ক্ষেত্রে এই দূষণ বড় ধরনের শারীরিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। কালীপুজো ও দীপাবলির রাতে এই দূষণের মাত্রা আরও বহু গুণে বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের আশঙ্কা, এখনই যদি দূষণের সূচক ৩০০ পার করে যায়, তবে দীপাবলির রাতে তা ৪০০-এর গণ্ডিও ছাড়িয়ে যেতে পারে। বিশেষ করে বাতাসে জলীয় বাষ্প বা আর্দ্রতা বাড়লে এই দূষিত কণাগুলি অনেক বেশি সময় ধরে ভূপৃষ্ঠের কাছাকাছি ভেসে থাকে, যা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তোলে।
তবে দূষণের এই চরম উদ্বেগের মাঝেও সামান্য হলেও স্বস্তির পরশ বুলিয়ে দিতে চলেছে রাজ্যের আবহাওয়া। কালীপুজোর দোরগোড়ায় এসে বঙ্গে অবশেষে আবহাওয়ার বড় রকম পরিবর্তনের স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলেছে। ফুরফুরে উত্তুরে হাওয়া এবং ভোরের দিকে হালকা শীতের আমেজ জানান দিচ্ছে যে বঙ্গে এবার জাঁকিয়ে শীত পড়ার অপেক্ষা শুরু হয়ে গিয়েছে।
আলিপুর আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, রবিবার রাতের মধ্যেই রাজ্যের তাপমাত্রা প্রায় ২ থেকে ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত নিচে নামতে পারে। এর ফলে রাতের ও ভোরের দিকে শীতের অনুভূতি অনেকটাই জোরালো হবে।
কলকাতার আকাশ আংশিক মেঘলা থাকার সম্ভাবনা থাকলেও বৃষ্টির কোনো বড় আশঙ্কা নেই। শহরের সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রা যথাক্রমে ৩১ ডিগ্রি ও ২২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি ঘোরাফেরা করলেও রাতের দিকে পারদ পতনের ঝোড়ো ইনিংস শুরু হবে।
দক্ষিণবঙ্গের জেলাগুলির মধ্যে হাওড়া, হুগলি, দুই ২৪ পরগনা, পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুর, ঝাড়গ্রাম, বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, পূর্ব ও পশ্চিম বর্ধমান, নদিয়া এবং মুর্শিদাবাদে আবহাওয়া প্রধানত শুষ্ক থাকবে। আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে রাতের তাপমাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে।
তবে পরবর্তী সময়ে ফের সামান্য তাপমাত্রা বাড়তে পারে বলেও জানিয়েছে হাওয়া অফিস। অন্য দিকে, উত্তরবঙ্গের দার্জিলিং, কালিম্পং, জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার, কোচবিহার, মালদহ এবং দুই দিনাজপুরেও বড় ধরনের ভারী বৃষ্টির কোনো সম্ভাবনা নেই, তবে সেখানেও রাতের তাপমাত্রা হ্রাসের ধারা অব্যাহত থাকবে।
সবচেয়ে বড় চমক অপেক্ষা করছে আগামী ১০ নভেম্বর অর্থাৎ ভাইফোঁটার দিন। আবহাওয়া দফতর সূত্রে খবর, ওই দিন থেকে আবহাওয়ায় নতুন মোড় আসতে পারে। ভাইফোঁটায় মালদহ, দুই দিনাজপুর এবং দক্ষিণবঙ্গের নদীয়া, হাওড়া, কলকাতা, দুই ২৪ পরগনা, পূর্ব মেদিনীপুর ও মুর্শিদাবাদের কিছু কিছু এলাকায় হালকা বৃষ্টি বা বিক্ষিপ্ত বজ্রবিদ্যুৎ সহ বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।
অর্থাৎ ভাইফোঁটার উৎসবের দিন হালকা বৃষ্টির ছাঁটে ভিজতে পারে বাংলা। এক দিকে দীপাবলির বাজি ও দূষণের বিষাক্ত কোপ, অন্য দিকে ভোরের বাতাসে হালকা শীতের চাদর দুইয়ের দোটানায় এই মুহূর্তে আবহাওয়ার এক অদ্ভুত সন্ধিক্ষণের সাক্ষী থাকছে তিলোত্তমা সহ গোটা রাজ্যবাসী।
Leave a comment