কলকাতা: মাছ চুরি করে মেছোভূত, রাতের অন্ধকারে প্রিয়জনের গলায় ডাক দেয় নিশি! আবার বটগাছের ডালে বাস ব্রহ্মদৈত্যের। ভূত চতুর্দশী মানেই শুধু চোদ্দো প্রদীপ নয়,বাঙালির লোককথায় লুকিয়ে থাকা বিচিত্র সব ভূতের গল্পও। পেতনি, শাকচুন্নি, মামদো থেকে স্কন্ধকাটা—জেনে নিন বাংলার ভূতেদের অদ্ভুত জগৎ।
বাংলার সংস্কৃতিতে ভূত মানেই এক অন্যরকম রহস্য। ছোটবেলায় ঠাকুমা-দিদিমার মুখে শোনা গল্প,গ্রামের নির্জন রাস্তা,পুকুরপাড়ের অন্ধকার কিংবা পুরনো বটগাছ—সব কিছুর সঙ্গেই যেন জড়িয়ে রয়েছে ভূতের অস্তিত্বের নানা কাহিনি। বাঙালির লোকবিশ্বাসে ভূত কখনও ভয়ংকর, কখনও উপকারী, আবার কখনও রীতিমতো হাস্যকর। বাংলা সাহিত্য ও লোককথায় এই ভূতেদের নিয়ে রয়েছে বিচিত্র সব বর্ণনা।
ভূত চতুর্দশীর আবহে ফিরে দেখা যাক বাংলার পরিচিত ও অপরিচিত কিছু ভূতকে। অবশ্যই এগুলি লোকবিশ্বাস ও প্রচলিত কাহিনি,বাস্তব কোনও প্রমাণিত ঘটনা নয়।
আরও পড়ুন : কার্টুনের বাইরেও রয়েছে শাকচুন্নির অদ্ভুত গল্প!
১. পেতনি: অতৃপ্ত বাসনার অশরীরী
বাংলার ভূতের গল্পে পেতনি বেশ পরিচিত একটি নাম। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী,অবিবাহিত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করা কোনও নারীর অতৃপ্ত আত্মাকেই পেতনি বলা হয়। লোককথায় এদের উদ্দেশ্য অনেক সময় অশুভ বলে বর্ণনা করা হয়েছে। নির্জন রাস্তা,বাঁশবাগান কিংবা গ্রামের অন্ধকার পরিবেশে পেতনির উপস্থিতির গল্প বহুদিন ধরেই প্রচলিত।
২. শাকচুন্নি: শাঁখা-পলা পরা রহস্যময়ী
শাকচুন্নি নামটির উৎপত্তি সংস্কৃত ‘শঙ্খচূর্ণী’ শব্দ থেকে বলে মনে করা হয়। লোকবিশ্বাসে বিবাহিত হিন্দু নারীর আত্মাকে শাকচুন্নি বলা হয়। সাদা শাড়ি, হাতে শাঁখা-পলা—এই সাজেই নাকি তাদের দেখা মেলে। প্রচলিত গল্প অনুযায়ী,শেওড়া গাছ এদের বিশেষ পছন্দের বাসস্থান। অন্যের বিবাহিত জীবনের প্রতি আকর্ষণও শাকচুন্নির গল্পের একটি পরিচিত বৈশিষ্ট্য।
৩. পেঁচাপেঁচি: জঙ্গলের রহস্যময় জুটি
নাম শুনেই বোঝা যায়, এরা একা নয়, জোড়ায় থাকতে ভালোবাসে। লোককথায় পুরুষ ভূতকে পেঁচা এবং স্ত্রী ভূতকে পেঁচি বলা হয়। সাধারণত গভীর জঙ্গলেই এদের বাস বলে মনে করা হয়। শিকার ধরার গল্পও রয়েছে এদের ঘিরে। তাই রাতের অন্ধকারে নির্জন জঙ্গলে একা ঘোরাফেরা করলে পেঁচাপেঁচির ভয় দেখানো হয় ছোটদের।
৪. মেছোভূত: মাছের লোভে সব করতে পারে!
মাছে-ভাতে বাঙালি,তাই বাঙালির ভূতেদের মধ্যেও মাছের প্রতি ভালোবাসা থাকবে না,তা কি হয়? মেছোভূত যেন একেবারে খাঁটি বাঙালি। লোককথা অনুযায়ী,পুকুর বা জলাশয়ের আশপাশে এদের বসবাস। মাছই এদের প্রধান খাদ্য। শুধু পুকুরের মাছ নয়,কখনও বাড়ির রান্নাঘর কিংবা জেলেদের নৌকা থেকেও মাছ চুরি করার গল্প শোনা যায়। মানুষের বিশেষ ক্ষতি না করলেও মাছ হাতে রাতে একা বাড়ি ফেরার সময় মেছোভূতের ভয় দেখানো হয়।
৫. নিশি: প্রিয়জনের গলায় ডাক!
বাংলার লোকবিশ্বাসে সবচেয়ে রহস্যময় ভূতেদের মধ্যে অন্যতম নিশি। কথিত আছে, গভীর রাতে পরিচিত কোনও মানুষের কণ্ঠস্বর নকল করে নিশি ডাক দেয়। সেই ডাকে সাড়া দিয়ে কেউ বাড়ির বাইরে বেরিয়ে এলে বিপদ হতে পারে বলে বিশ্বাস করা হয়। প্রচলিত গল্পে বলা হয়,নিশি নাকি তিনবারের বেশি ডাকতে পারে না। তাই রাতবিরেতে পরিচিত কারও গলা শুনলেও বাইরে বেরোনোর আগে সতর্ক থাকতে বলা হয়।
৬. ব্রহ্মদৈত্য: উপকারী ভূতের রাজা!
সব ভূতই যে ভয় দেখায়,এমনটা নয়। বাংলার লোককথায় ব্রহ্মদৈত্যকে বরং উপকারী ভূত হিসেবেই দেখা হয়। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী,কোনও ব্রাহ্মণের মৃত্যুর পর তাঁর আত্মা ব্রহ্মদৈত্যে পরিণত হতে পারে। ধুতি ও পৈতে পরা এই ভূতকে সাধারণত বিশাল বটগাছের বাসিন্দা হিসেবে কল্পনা করা হয়। বলা হয়, ব্রহ্মদৈত্য মানুষের উপকারও করে। তাই ভূতেদের দুনিয়ায় তিনি যেন একেবারে ভদ্রলোক।
৭. গেছোভূত: গাছের ডালে কারা থাকে?
নামেই পরিচয়। গাছই এদের ঠিকানা। বাংলার লোককথায় গেছোভূতকে কখনও গাছের ডালে ঝুলতে,কখনও আবার মাথা নিচে দিয়ে ঝুলে থাকতে দেখা যায়। তালগাছ এদের বিশেষ পছন্দের জায়গা বলে প্রচলিত রয়েছে। এদের চেহারা নিয়েও নানা মত রয়েছে। কেউ বানরের মতো,কেউ আবার টিকটিকির মতো দেখতে বলে বর্ণনা করেছেন।
৮. মামদো ভূত: কবরস্থানের অশরীরী
বাংলার লোকবিশ্বাসে মামদো ভূতের একটি আলাদা পরিচিতি রয়েছে। প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী,মুসলিম ব্যক্তির মৃত্যুর পর তাঁর আত্মাকে মামদো ভূত বলা হয়। কবরস্থানের আশপাশে এদের বসবাস বলে মনে করা হয়। লোককথায় মামদো ভূতের পা থাকে না,তারা নাকি হাওয়ায় ভেসে বেড়ায়। কারও মাথায় টুপি, কারও আবার মুখে দাড়ি—এমন বিচিত্র বর্ণনাও পাওয়া যায়।
৯. জোকা ভূত: জলাশয়ের অদ্ভুত বাসিন্দা
পুকুর,ডোবা কিংবা নদীর আশপাশে যাদের বাস,তারাই নাকি জোকা ভূত। লোককথায় এদের উচ্চতা খুব বেশি নয় এবং গায়ের রং কালো বলে বর্ণনা করা হয়। তবে সব জোকা ভূতই যে অশুভ,তা নয়। প্রচলিত গল্পে ভালো জোকা ভূত নাকি মানুষকে ধনসম্পত্তিও দান করতে পারে।
১০. বেঘো ভূত: সুন্দরবনের বাঘের আতঙ্ক!
সুন্দরবনের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বেঘো ভূতের গল্প। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, বাঘের আক্রমণে যাঁদের মৃত্যু হয়, তাঁদের আত্মাই নাকি বেঘো ভূত হয়ে ওঠে। জঙ্গলে মধু সংগ্রহ করতে যাওয়া মানুষদের ভয় দেখানো কিংবা বাঘের মতো ডাক দেওয়ার গল্প রয়েছে এদের ঘিরে। সুন্দরবনের গভীর জঙ্গল ও বাঘের আতঙ্কের সঙ্গে মিশে এই লোককথা আরও রহস্যময় হয়ে উঠেছে।
১১. স্কন্ধকাটা: মাথাহীন ভূতের ভয়
বাংলার ভূতের গল্পে স্কন্ধকাটা অন্যতম ভয়ংকর চরিত্র। নামের মধ্যেই রয়েছে তার পরিচয়। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, মৃত্যুর সময় যাঁদের মাথা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তাঁদের আত্মা নাকি স্কন্ধকাটা ভূতে পরিণত হয়। মাথাহীন এই ভূত নিজের হারানো মাথা খুঁজে বেড়ায় বলে প্রচলিত রয়েছে। বাংলা সাহিত্যের ভূতেদের তালিকায় এটি অন্যতম পরিচিত চরিত্র।
১২. কানাভুলো: পথ হারিয়ে বিপদে পড়বেন না তো?
নির্জন মাঠ কিংবা গ্রামের ফাঁকা রাস্তা দিয়ে রাতে ফিরছেন? সাবধান! লোককথায় কানাভুলো ভূতের কথা রয়েছে,যারা পথচারীদের ভুল পথে চালিত করে। কথিত, একা বা দলছুট মানুষকে নির্দিষ্ট জায়গায় নিয়ে গিয়ে বিপদে ফেলে এরা। গ্রামের প্রবীণদের মুখে শোনা এই গল্পের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে রাতের অন্ধকারে পথ হারানোর ভয়।
১৩. দেও: জলাশয়ের আতঙ্ক
পুকুর, ডোবা কিংবা নদীর আশপাশে দেও ভূতের বসবাস বলে প্রচলিত বিশ্বাস। লোককথা অনুযায়ী,একা স্নান করতে যাওয়া মানুষকে জলের তলায় টেনে নিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা রয়েছে এদের। জলাশয়কে ঘিরে গ্রামবাংলায় যে নানা ধরনের ভয় ও সতর্কতার গল্প প্রচলিত,দেও ভূতের কাহিনি তারই একটি অংশ।
১৪. ডাইনি ও ডাকিনী: ভূত নয়, লোকবিশ্বাসের ভয়ংকর চরিত্র
ডাইনি কিন্তু প্রচলিত অর্থে ভূত নয়। লোককথায় কালো জাদু ও অলৌকিক বিদ্যায় পারদর্শী নারীদের ডাইনি হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে। অন্যদিকে ডাকিনীকে অনেক সময় ডাইনিদের অনুগত অশরীরী চরিত্র হিসেবে বর্ণনা করা হয়। তবে ডাইনি অপবাদকে কেন্দ্র করে বাস্তবে বহু নিরীহ নারীকে নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। তাই এই ধরনের কুসংস্কার থেকে দূরে থাকা জরুরি।
১৫. চোরাচুন্নি: মরেও চুরির অভ্যাস যায়নি!
চোরাচুন্নি নামের মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে তার কাহিনি। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী,চুরি করতে গিয়ে কোনও ব্যক্তির মৃত্যু হলে তিনি নাকি চোরাচুন্নি হয়ে ওঠেন। মৃত্যুর পরেও তাঁর চুরির অভ্যাস যায় না! প্রচলিত গল্পে গঙ্গাজলকে চোরাচুন্নি তাড়ানোর উপায় বলা হয়েছে।
ভূত চতুর্দশী মানেই বাঙালির ভূতের গল্প।
পেতনি থেকে ব্রহ্মদৈত্য, মেছোভূত থেকে মামদো—বাংলার ভূতের জগৎ যে কতটা বৈচিত্র্যময়,এই লোককথাগুলিই তার প্রমাণ। অঞ্চলভেদে এই গল্পগুলির বর্ণনা ও চরিত্রের বৈশিষ্ট্যও বদলে যায়। কোথাও ভূত ভয় দেখায়,কোথাও আবার মানুষের উপকার করে। বাংলা সাহিত্য,লোকসংস্কৃতি ও প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা গল্পের মধ্যেই বেঁচে রয়েছে এই বিচিত্র চরিত্রগুলি।
ভূত সত্যি আছে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক থাকতেই পারে। কিন্তু বাঙালির আড্ডায় ভূতের গল্পের জনপ্রিয়তা যে আজও অটুট,তা নিয়ে সন্দেহ নেই। তাই ভূত চতুর্দশীর রাতে চোদ্দো প্রদীপ জ্বালানোর পাশাপাশি ঠাকুমা-দিদিমার ঝুলি থেকে একটা ভূতের গল্পও বেরিয়ে আসুক।
Leave a comment