উত্তরপাড়া: গভীর রাতে অসহ্য পেটে ব্যথা নিয়ে নার্সিংহোমে ভর্তি হয়েছিল ১৬ বছরের এক কিশোরী। আর ভোর হতেই এক বুক কুয়াশা ও আঁধারের মধ্যে ঘটে গেল এক হিমশীতল নৃশংস ঘটনা। প্রসবের পর নিজের রক্তমাংসের সদ্যোজাত সন্তানকে নার্সিংহোমের দোতলার জানলা দিয়ে নিচে কঠিন চত্বরে ছুড়ে ফেলে দেওয়ার চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠল সেই নাবালিকার বিরুদ্ধে!
হুগলির উত্তরপাড়া পুরসভার ১৫ নম্বর ওয়ার্ডের একটি বেসরকারি নার্সিংহোমে ঘটল এই শিউরে ওঠার মতো ঘটনা। এই মর্মান্তিক কাণ্ডে সমগ্র উত্তরপাড়া ও হাওড়া সংলগ্ন এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য, ক্ষোভ ও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের খবর, হাওড়ার বাসিন্দা ওই কিশোরীকে শুক্রবার গভীর রাতে পেটে মারাত্মক যন্ত্রণার জেরে দ্রুত উত্তরপাড়ার এই বেসরকারি নার্সিংহোমে নিয়ে আসেন পরিবারের সদস্যরা। চিকিৎসকেরা প্রাথমিক পরীক্ষার ব্যবস্থা করেন।
তবে পরিবার ও স্বজনদের দাবি, মেয়েটি যে পূর্ণ গর্ভবতী বা সন্তানসম্ভবা ছিল, সে বিষয়ে তারা সম্পূর্ণ অন্ধকারে ছিলেন। পেটে ব্যথার আড়ালে যে লুকানো ছিল প্রসববেদনা, তা তারা টের পাননি।
নার্সিংহোম কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে জানানো হয়েছে, রক্ত পরীক্ষা ও চিকিৎসকদের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণের মাঝেই ভোররাতের দিকে কিশোরী নিজে বাথরুমে যায়। সেখানেই সে এক ফুটফুটে সন্তানের জন্ম দেয়।
আরও পড়ুন: কালীপুজোর আগেই রোমাঞ্চ! নামছে পারদ, ধোঁয়ার লড়াই দিল্লির সঙ্গে
তবে গর্ভাবস্থার কথা আড়াল করতে এবং সমাজ ও পরিবারের হাত থেকে বাঁচার তাগিদে চরম ও নৃশংস পথ বেছে নেয় সেই নাবালিকা। অভিযোগ, বাথরুমের জানলা খুলে নবাগত সদ্যোজাতকে নিচে ছুড়ে ফেলে দেয় সে, যাতে শিশুটির মৃত্যু ঘটে এবং গর্ভাবস্থার সমস্ত প্রমাণ এক লহমায় লোপাট হয়ে যায়।
ভোরের দিকে নার্সিংহোমের বাইরে থাকা স্থানীয় এক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, ওপর থেকে ভারী কিছু পড়ার বিকট শব্দ পেয়ে তিনি কৌতুহলবশত ছুটে যান। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, নার্সিংহোমের পেছনের রাস্তায় রক্তভেজা কাদার মধ্যে নিথর ও রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে এক সদ্যোজাত শিশু।
মুহূর্তের মধ্যে ঘটনাটি জানাজানি হতেই এলাকায় শোরগোল পড়ে যায়। খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায় উত্তরপাড়া থানার বিশাল পুলিশ বাহিনী। পুলিশ উদ্ধার করে শিশুটিকে এবং পুরো এলাকা ঘিরে ফেলে তদন্ত শুরু করে।
এই নৃশংস ঘটনা সামনে আসার পর একাধিক গুরুতর প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে আইনি ও প্রশাসনিক স্তরে। প্রথমত, মাত্র ১৬ বছরের এক নাবালিকা কীভাবে গর্ভবতী হলো? এর নেপথ্যে কি কোনও যৌন নির্যাতন বা পকসো (POCSO) আইনের অধীনস্থ গুরুতর অপরাধ জড়িয়ে রয়েছে?
দ্বিতীয়ত, পেটে ব্যথা নিয়ে ভর্তি হওয়া একটি নাবালিকা যখন নার্সিংহোমের বাথরুমে গিয়ে সন্তান প্রসব করছে, তখন নার্সিংহোম কর্তৃপক্ষের ডিউটিতে থাকা নার্স বা স্বাস্থ্যকর্মীরা কী করছিলেন? এত বড় এক কায়িক ও শারীরিক প্রক্রিয়ার সময়ে নার্সিংহোমের নজরদারি কেন শূন্যের কোঠায় ছিল?
উত্তরপাড়া থানার পুলিশ জানিয়েছে, পুরো বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীলতার সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কীভাবে ওই নাবালিকা অন্তঃসত্ত্বা হল এবং এর পেছনে অন্য কোনও প্রভাবশালী বা পরিচিত ব্যক্তির ভূমিকা রয়েছে কি না, তা বের করতে নাবালিকার পরিবারের লোকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। পাশাপাশি, চিকিৎসায় গাফিলতি বা নজরদারির চরম অভাবের দায়ে নার্সিংহোম কর্তৃপক্ষের ভূমিকাও নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
এদিকে, এই অমানবিক ঘটনার খবরে ফুঁসে উঠেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। নিষ্পাপ সদ্যোজাতকে জানলা দিয়ে ছুড়ে ফেলে দেওয়ার এই মর্মান্তিক ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে দোষী ও এর নেপথ্যে থাকা সমস্ত অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির দাবি তুলেছেন উত্তরপাড়ার সর্বস্তরের নাগরিক।
Leave a comment