মুম্বই: ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অন্যতম বৃহত্তম জুয়া বা বাজি হিসেবে চিহ্নিত হতে চলেছে পরিচালক নীতেশ তিওয়ারির বহু প্রতীক্ষিত ‘রামায়ণ’। রণবীর কাপুর, যশ এবং সাই পল্লবীর মত হেভিওয়েট তারকাখচিত এবং প্রযোজক নমিত মালহোত্রা ও যশের যৌথ ব্যানার সমর্থিত এই মেগা প্রজেক্ট নিয়ে উত্তেজনার পারদ চড়েছে তুঙ্গে।
হাজার হাজার কোটি টাকার বিশাল বাজেটের এই ছবি ঘিরে যেমন আকাশছোঁয়া প্রত্যাশা রয়েছে, তেমনই প্রশ্ন উঠছে, এই সিনেমা কি আদতে লগ্নি তুলতে পারবে? বক্স অফিসে ‘ধুরন্ধর ২’ (Dhurandhar 2)-এর মতো ছবির রেকর্ড ভেঙে ভারতের সর্বোচ্চ আয়কারী সিনেমার খেতাব ছিনিয়ে নিতে পারবে কি না, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই জোর চর্চা শুরু হয়েছে বাণিজ্য মহলে।
প্রখ্যাত ট্রেড অ্যানালিস্ট রমেশ বালা, অক্ষয় রাঠি এবং কোমল নাহটার সঙ্গে কথা বলে এই সিনেমার বক্স অফিস ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
প্রথম দিনের ওপেনিং ও ‘ধুরন্ধর ২’-এর সঙ্গে তুলনা
বিশেষজ্ঞরা একবাক্যে স্বীকার করেছেন যে, বক্স অফিসে ধামাকা এন্ট্রি হতে চলেছে ‘রামায়ণ’। ট্রেড অ্যানালিস্ট রমেশ বালার মতে, ছবিটির প্রথম দিনে ভারতে প্রায় ১২৫ কোটি টাকার গ্রস কালেকশন হতে পারে।
উল্লেখ্য, ট্রেড ট্র্যাকার সাকনিল্কের তথ্য অনুযায়ী, ‘ধুরন্ধর ২’ প্রথম দিনে ভারতে ১০২.৫৫ কোটি টাকা আয় করেছিল। তবে বালার মতে, সরাসরি এই দুই ছবির তুলনা টানা কিছুটা জটিল। কারণ ‘ধুরন্ধর ২’ একটি সিক্যুয়েল হওয়ায় তার প্রচারে আলাদা উন্মাদনা ছিল।
অন্যদিকে, ‘রামায়ণ’-এর ক্ষেত্রে আইম্যাক্স (IMAX)-এর মতো প্রিমিয়াম ফরম্যাট এবং উত্তর ভারতে ছবির শক্তিশালী আবেদন দারুণ প্রভাব ফেলবে। বিশেষ করে হিন্দি বেল্ট থেকে বড় ওপেনিং আসার জোরালো সম্ভাবনা দেখছেন তিনি।
যদিও প্রদর্শক ও ট্রেড অ্যানালিস্ট অক্ষয় রাঠির হিসাব কিছুটা রক্ষণশীল। তাঁর প্রাক্কলন অনুযায়ী, সব ভাষা মিলিয়ে দেশজুড়ে প্রথম দিনের গ্রস কালেকশন ১০০ কোটি টাকার কাছাকাছি হতে পারে। তবে রিলিজের সময়কাল নিয়ে সামান্য উদ্বেগের কথাও শুনিয়েছেন তিনি।
প্রাক-দীপাবলি (Pre-Diwali) ওই সময়ে সাধারণ মানুষ উৎসবের কেনাকাটা ও সামাজিকভাবে ব্যস্ত থাকায় ওপেনিংয়ে সামান্য প্রভাব পড়তে পারে। প্রবীণ বাণিজ্য বিশ্লেষক কোমল নাহাটাও মনে করেন যে, প্রথম দিনে ‘ধুরন্ধর ২’-কে টপকে যাওয়া কঠিন হবে। বিশেষ করে মন্দার বা তুলনামূলক কম চাহিদার সময়ে মুক্তির কারণে প্রথম দিনে হিন্দিতে প্রায় ৬০ কোটি এবং সব ভাষা মিলিয়ে ১০০ কোটি বা তার বেশি কালেকশন হতে পারে বলে তাঁর ধারণা।
আরও পড়ুন: রামায়ণের অপেক্ষায় ভারত! মুক্তির আগেও নীতেশের সিনেমা ঘিরে একগুচ্ছ বিতর্ক
পৌরাণিক আবেদন, তারকাশক্তি ও ভিএফএক্স-এর ম্যাজিক
ব্যবসায়িক অঙ্কের হিসাব যাই হোক না কেন, বিশেষজ্ঞরা একমত যে ‘রামায়ণ’-এর মতো এমন বহুমুখী ইউএসপি খুব কম ভারতীয় ছবিরই থাকে। রমেশ বালার কথায়, অতীতে আমরা রামায়ণ বা মহাভারতের গল্প মূলত ছোট পর্দাতেই বেশি দেখেছি, বড় পর্দায় এই মাপের ভিজ্যুয়াল স্পেকটাকল আগে দেখা যায়নি। রণবীর কাপুর, যশ, সাই পল্লবী এবং এ আর রহমানের মতো হেভিওয়েট নাম থাকার কারণে ছবিটির গ্র্যান্ড ভিজ্যুয়াল প্যাকেজ তৈরি হয়েছে।
অক্ষয় রাঠি মনে করেন, যে গল্প শুনে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ভারতীয়রা বড় হয়েছেন, সেই পরিচিত গল্পে রণবীর ও যশের মতো তারকাদের সংযুক্তি বক্স অফিসে রেকর্ড ঝড় তুলতে বাধ্য। পাশাপাশি, অস্কারজয়ী ভিএফএক্স জায়ান্ট ‘ডিএনইজি’ (DNEG)-র কাজ ছবিটিকে এক অন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবে।
চিনা মার্কেটে ছবিটির সাফল্য নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া থাকলেও, রাঠি ও কোমল নাহটা মনে করেন যে সাইট ও ইমোশনাল জার্নির খাতিরে ‘দঙ্গল’ বা ‘বজরঙ্গি ভাইজান’-এর মতো চিনেও বিরাট সাফল্য পেতে পারে এই ছবি।
চার হাজার কোটির বাজেট বিতর্ক ও লাভের অঙ্ক
ছবির সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হল এর চার হাজার কোটি টাকার বিশাল বাজেট। তবে ট্রেড বিশেষজ্ঞরা এই অংক নিয়ে কিছুটা সংযত থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। রমেশ বালার মতে, চার হাজার কোটি টাকা সম্ভবত দুটি পার্ট মিলিয়ে হতে পারে।
তাছাড়া প্রযোজক নমিত মালহোত্রার নিজস্ব ভিএফএক্স কোম্পানি কাজ করায় অনেক খরচই সাশ্রয় হতে পারে। কোমল নাহটার অনুমান, প্রথম পর্বের বাজেট বড়জোর ১২০০ কোটি টাকার কাছাকাছি হতে পারে।
ওটিটি, স্যাটেলাইট এবং নন-থিয়েট্রিক্যাল রাইটস বিক্রির পাশাপাশি রিপিট ভিউয়ারশিপের ওপর নির্ভর করেই ছবির লাভ ঘরে তোলার রাস্তা পরিষ্কার হবে বলে মত বিশেষজ্ঞদের।
হাজার-দেড় হাজার কোটির লক্ষ্য ও প্রিমিয়াম টিকিট প্রাইসিং
সব মিলিয়ে, ‘রামায়ণ’ শেষ পর্যন্ত সর্বকালের সর্বোচ্চ আয়কারী ভারতীয় ছবি হতে পারবে কি না, তা নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে। রমেশ বালার মতে, বিষয়বস্তু যদি দর্শকের মনঃপুত হয়, তবে থিয়েট্রিক্যাল কালেকশন অনায়াসেই ১০০০ থেকে ১৫০০ কোটি বা তার বেশি হতে পারে। অক্ষয় রাঠিও এই ভারতীয় সিনেমার বিশ্বজোড়া বাজার খোলার একটি সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখছেন।
অন্যদিকে, আইম্যাক্স টিকিটের দাম দুই হাজার টাকা পর্যন্ত হওয়া নিয়ে বিতর্ক তৈরি হলেও বিশেষজ্ঞরা এটিকে কৌশলগতভাবে ভুল দেখছেন না। নির্মাতাদের বিপুল বিনিয়োগ তুলে আনার জন্য এই ধরনের উচ্চ টিকিট মূল্য প্রথম সপ্তাহে কাজ করলেও পরবর্তী সময়ে দাম নামিয়ে আনা হতে পারে বলে মত তাঁদের।
সব মিলিয়ে, দর্শকের মুখে মুখে প্রশংসা ছড়িয়ে পড়লে নীতেশ তিওয়ারির এই রূপকথার বক্স অফিস যে নতুন ইতিহাস তৈরি করতে চলেছে, সে বিষয়ে এক প্রকার নিশ্চিত বাণিজ্য মহল।
Leave a comment