নয়াদিল্লি: ভারতে জরুরি অবস্থা জারির পাঁচ দশক পার করে ফের একবার সেই বিতর্কিত অধ্যায় নিয়ে মুখ খুললেন কংগ্রেসের রাজ্যসভার সাংসদ তথা কংগ্রেসের প্রাক্তন সভানেত্রী সনিয়া গান্ধী। আগামী ১০ নভেম্বর বিশ্বজুড়ে মুক্তি পেতে চলেছে তাঁর বহুপ্রতীক্ষিত স্মৃতিকথা ‘বিলংগিং: অ্যা জার্নি অফ লাভ’ (Belonging: A Journey Of Love)।
বই প্রকাশের ঠিক প্রাক্কালে ‘দ্য হিন্দু’ সংবাদপত্রকে দেওয়া এক বিস্ফোরক সাক্ষাৎকারে সনিয়া দাবি করেছেন, ১৯৭৫ সালের জরুরি অবস্থার সময়ে হওয়া নানা ‘অতিরঞ্জন’ বা অতিরিক্ত আচরণের জন্য শুধু সঞ্জয় গান্ধীকে বলির পাঁঠা বা এককভাবে দায়ী করা ঠিক নয়। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর ওপর তাঁর কিছু প্রবীণ দলীয় সহকর্মীর মারাত্মক রাজনৈতিক চাপ ছিল। সনিয়ার এই বক্তব্যে জাতীয় রাজনীতিতে নতুন করে শোরগোল পড়ে গিয়েছে।
সাক্ষাৎকারে প্রবীণ সাংবাদিক এন রামের প্রশ্নের জবাবে ৭৯ বছর বয়সি কংগ্রেস নেত্রী বলেন, ‘‘জরুরি অবস্থার সমস্ত ঘটনার জন্য কেবল সঞ্জয়ই দায়ী ছিল না, যদিও সাধারণ মানুষের মনে সঞ্জয় এবং জরুরি অবস্থা সমার্থক হয়ে উঠেছে। সেই সময়ে ইন্দিরাজির ওপর তাঁর কিছু প্রবীণ সহকর্মীর তরফ থেকে মারাত্মক চাপ ছিল। ইন্দিরাজির আশপাশে রাজীবের মতো খুব কম মানুষই ছিলেন, যাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি ও চিন্তাভাবনা একটু ভিন্ন ছিল। রাজীব বাইরে থেকে শোনা বিভিন্ন অভাব-অভিযোগ ও মানুষের মতামতের কথা নিয়মিত নিজের মাকে জানাতেন।’’
তবে শেষ পর্যন্ত ইন্দিরা গান্ধী নিজেই নিজের বিচক্ষণতা দিয়ে পুরো পরিস্থিতিটি অনুধাবন করতে পেরেছিলেন এবং প্রয়োজনীয় সংশোধনী পদক্ষেপ নিয়েছিলেন বলে জানান সনিয়া। তাঁর কথায়, ‘‘আমার শাশুড়ি নিজের প্রজ্ঞা দিয়েই অবশেষে পরিস্থিতি বুঝতে পেরেছিলেন এবং তা সমাধানের উদ্যোগ নিয়েছিলেন।’’
জরুরি অবস্থার সেই অন্ধকার অধ্যায়কে কি ‘স্বৈরাচারী ও গণতন্ত্রবিরোধী’ বলা সঠিক নয়? এই প্রশ্নের জবাবে সনিয়া অত্যন্ত খোলামেলাভাবে স্বীকার করে নেন যে, সেই সময়ে সাধারণ নাগরিকদের গণতান্ত্রিক অধিকার নিঃসন্দেহে খর্ব করা হয়েছিল।
সনিয়া বলেন, ‘‘জরুরি অবস্থা উঠে যাওয়ার পরই আমি ঘটনার মূল ভয়াবহতা অনুধাবন করতে পেরেছিলাম। হ্যাঁ, এ কথা সত্যি যে সে সময়ে নাগরিকদের গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছিল, ‘হেবিয়াস কর্পাস’ বা বন্দি প্রত্যক্ষীকরণের মৌলিক অধিকার স্থগিত রাখা হয়েছিল। তবে যা-ই করা হয়েছিল, তা কিন্তু সম্পূর্ণ সংবিধানের কাঠামোর ভেতরে থেকেই করা হয়েছিল।’’
আরও পড়ুন: লালুর কাছে সনিয়া! জটের সলতে পাকানোর কাজ কি শুরু?
জরুরি অবস্থা জারির প্রেক্ষাপট বর্ণনা করতে গিয়ে তৎকালীন সময়ের রাজনৈতিক অস্থিরতার কথা মনে করিয়ে দেন সনিয়া। তাঁর মতে, ইন্দিরার দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি দেখলে দেখা যাবে, দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া চরম বিশৃঙ্খলা ও সহিংস পরিস্থিতি সামাল দিতে তাঁকে হিমশিম খেতে হচ্ছিল।
সনিয়া বলেন, ‘‘সেই সময়ে হিংসাত্মক প্রতিবাদ-বিক্ষোভ চলছিল, সরকারি দফতর ও গণপরিবহনে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হচ্ছিল, পরিকল্পিতভাবে দেশজুড়ে অসন্তোষ ছড়ানো হচ্ছিল। এমনকি আমলাতন্ত্র ও সশস্ত্র বাহিনীকে সরকারি নির্দেশ অমান্য করার প্রকাশ্য আহ্বান জানানো হয়েছিল। সেই উত্তাল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতেই জরুরি অবস্থার মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল ইন্দিরার সরকারকে।’’
স্মৃতিচারণায় সনিয়া আরও মনে করিয়ে দেন যে, শেষ পর্যন্ত গণতান্ত্রিক পথেই সেই জরুরি অবস্থার অবসান ঘটেছিল এবং খোদ ইন্দিরা গান্ধীই এর জন্য অনুশোচনা প্রকাশ করেছিলেন। সনিয়ার কথায়, ‘‘পিছন ফিরে তাকালে এখন ঘটনাগুলিকে আরও স্পষ্ট ও নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করা সম্ভব। আমাদের ভুলে যাওয়া উচিত নয় যে, ইন্দিরা গান্ধী নিজেই উপলব্ধি করেছিলেন কী ঘটছে এবং তিনি নিজেই ১৯৭৭ সালের মার্চ মাসে সাধারণ নির্বাচনের ডাক দিয়েছিলেন। নির্বাচন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। শুধু তা-ই নয়, জরুরি অবস্থার সময়ে হওয়া অনভিপ্রেত ঘটনাগুলির জন্য ইন্দিরা গান্ধী পরে প্রকাশ্যে দুঃখপ্রকাশ করেছিলেন এবং দেশবাসীর কাছে ক্ষমাও চেয়েছিলেন।’’
উল্লেখ্য, ১৯৭৫ সালের ২৫ জুন গভীর রাতে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ফখরুদ্দিন আলি আহমেদ সংবিধানের ৩৫২ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ভারতে জরুরি অবস্থা ঘোষণার নথিতে স্বাক্ষর করেন। পরবর্তী প্রায় ২১ মাস ধরে ১৯৭৭ সালের ২১ মার্চ পর্যন্ত চলেছিল এই জরুরি অবস্থা।
এই দীর্ঘ সময়ে কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে অবাধ ক্ষমতা চলে যায়, খর্ব করা হয় সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং বিরোধী রাজনৈতিক নেতাদের গণহারে গ্রেপ্তার করা হয়। সংবিধানে সংশোধনী এনে দুর্বল করে দেওয়া হয়েছিল বিচারবিভাগীয় পর্যালোচনার অধিকারও।
পাশাপাশি জোর করে বন্ধ্যাকরণের মতো বিতর্কিত প্রচারও চালানো হয়েছিল সেই সময়। সনিয়া গান্ধীর এই নতুন বই প্রকাশের মুখে জরুরি অবস্থা নিয়ে এমন পর্যবেক্ষণ দেশের রাজনৈতিক মহলে নতুন আলোচনার জন্ম দিল।
Leave a comment