কলকাতা: কালীঘাটের পটুয়াপাড়ায় ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ির সামনে শনিবার দুপুরে নতুন করে তীব্র চাঞ্চল্য ও রাজনৈতিক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ল। শুক্রবার গভীর রাতের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর শনিবার দুপুরে অভিষেকের জন্মদিনের উৎসব এবং স্থানীয় পটুয়াপাড়ার কালী প্রতিমা বিক্রির রাস্তা বন্ধ হওয়াকে কেন্দ্র করে ফের দফায় দফায় ধুন্ধুমার পরিস্থিতি তৈরি হয়।
এলাকার পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠতেই আচমকা অভিষেকের বাসভবনের ভিতর থেকে মাইক হাতে রাজপথে বেরিয়ে আসেন তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বোচ্চ নেত্রী তথা প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সোজা কাঠের একটি চেয়ারের ওপর উঠে দাঁড়িয়ে পুলিশ প্রশাসন ও বিজেপিকে একযোগে নিশানা করেন তিনি। এমনকি কলকাতার পুলিশ কমিশনার অজয় নন্দের সরাসরি পদত্যাগ দাবি করে লালবাজারের ভূমিকা নিয়ে তোপ দাগেন তিনি।
শনিবার সকালে অভিষেকের জন্মদিন পালন এবং রাস্তার ওপর ব্যারিকেড দেওয়াকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে পটুয়াপাড়া চত্বর। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বিজেপি কর্মী-সমর্থকদের একাংশের অভিযোগ, অভিষেকের জন্মদিন পালনের জন্য রাস্তা পুরো বন্ধ করে ব্যারিকেড দেওয়া হয়েছে। রবিবারের কালীপুজোর ঠিক আগে বহু পুণ্যার্থী ও উদ্যোক্তা প্রতিমা কিনতে এসে ফিরে যাচ্ছেন।
প্রতিমা ডেলিভারি দিতে না পারায় পটুয়াপাড়ার মৃৎশিল্পীরা ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন। এর প্রতিবাদেই বিজেপি সমর্থক ও স্থানীয়দের একাংশ ব্যারিকেড তুলে দেওয়ার দাবিতে রাজপথে বিক্ষোভ শুরু করেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশ এলে পুলিশের সঙ্গেও তীব্র বচসা বাধে বিক্ষোভকারীদের।
ঘটনার খবর পেয়েই ঘর থেকে সোজা মাইক হাতে পটুয়াপাড়ার রাস্তায় নেমে আসেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি মাইকে চিৎকার করে সমবেত কর্মী-সমর্থকদের নির্দেশ দেন, ‘‘সবাইকে অনুরোধ করছি, অবিলম্বে রাস্তার একাংশ খালি করে দিন। এখানে বহু মানুষ কালী প্রতিমা কিনতে আসছেন, মৃৎশিল্পীদের ব্যবসার যেন কোনও ক্ষতি না হয়। যাঁরা অভিষেককে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাতে আসছেন, তাঁরা রাস্তার বাঁ দিক ধরে এক লাইনে আসবেন। ডান দিকটা সাধারণ মানুষের গাড়ি চলাচলের জন্য খুলে রাখুন।’’ একই সঙ্গে ক্ষুব্ধ মমতা হুঁশিয়ারির সুরে বলেন, ‘‘আমি কোথাও যাচ্ছি না, আমি এখানেই রাজপথে থাকছি।’’
এর পরই বিজেপি এবং কলকাতা পুলিশের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার শুরু করেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী। সিপি অজয় নন্দকে সরাসরি কাঠগড়ায় তুলে মমতা বলেন, ‘‘কাল রাতে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ঝামেলা করানো হয়েছে। আমাদের বোনেদের শাখা পর্যন্ত ভেঙে দেওয়া হয়েছে। আমরা বারবার পুলিশকে জানাচ্ছি, কিন্তু কোনও কাজ হচ্ছে না। অজয় নন্দাজি, আপনি আমার কথা শুনুন! এক দিকে হামলা চালাবেন, আর এক দিকে মিথ্যা মামলা দেবেন! এসব করতে করতে একদিন বিজেপির হাতের পুতুল হয়ে নিজেদের চেয়ার হারাবেন।’’

একই সঙ্গে তাঁর বাড়ির সামনে এবার বেআইনিভাবে একটি কালীপুজোর অনুমতি দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ তুলে মমতা বলেন, ‘‘অনুমতি দিয়ে আমার বাড়ির পুজো ও চলাচলে বাধা তৈরি করা হচ্ছে। কালীঘাট থানা না সামলালে আমি সোজা কালীঘাট মন্দিরের সামনে গিয়ে পুজো করব।’’
মমতার এই নজিরবিহীন আক্রমণ ও রাজপথে নামার ঘটনাকে তীব্র কটাক্ষ করেছে রাজ্য বিজেপি নেতৃত্ব। বিজেপির রাজ্য মুখপাত্র দেবজিৎ সরকার পাল্টা তোপ দেগে বলেন, ‘‘বিভিন্ন ভুয়ো ইস্যুতে রাজ্যে রাজনৈতিক নৈরাজ্য সৃষ্টির চেষ্টা করছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মূল ঘটনা হলো, অভিষেক পটুয়াপাড়ার রাস্তা পুরো আটকে দিয়েছিলেন যাতে কালী প্রতিমা মণ্ডপে পৌঁছতে না পারে। স্থানীয় মৃৎশিল্পী ও মানুষ প্রতিবাদ করায় গণ্ডগোল হয়। আসলে এটি মমতার দলীয় দুই গোষ্ঠীর মধ্যে মারামারি— কে আগে অভিষেককে কেক খাওয়াবে, তা নিয়ে ঝামেলা!’’
প্রসঙ্গত, শুক্রবার গভীর রাতে অভিষেকের বাসভবনের বাইরে ব্যানার-কাটআউট ছেঁড়া এবং ‘চোর’ স্লোগান দেওয়াকে কেন্দ্র করে তৃণমূল ও বিজেপি কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘাত বাঁধে। দফায় দফায় ইট ছোড়াছুড়ি ও হাতাহাতিতে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এলাকা।
শনিবার এলাকা জুড়ে ১৬৩ ধারা (সাবেক ১৪৪ ধারা) জারি রাখা হলেও দুপুরের দিকে রাস্তা খোলা ও কেক কাটাকে কেন্দ্র করে নতুন করে সংঘাত ছড়ায়। একদিকে ‘ইন্ডিয়া’ (INDIA) জোটে থাকার কারণে কেন্দ্রের রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অভিযোগ তুলেছেন মমতা, অন্যদিকে কালীপুজোর মুখে দক্ষিণ কলকাতার এই প্রাণকেন্দ্রে লাগাতার অশান্তিতে উদ্বেগ বাড়ছে সাধারণ নাগরিক ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের।
Leave a comment