কলকাতা: তিলোত্তমার সেরা উৎসব দুর্গাপুজোর পাস বিলি ঘিরে কোটি কোটি টাকার মেগা দুর্নীতি মামলায় অবশেষে আরও জাঁকিয়ে বসল আইনি কোপ। তৃণমূল সরকারের প্রাক্তন মন্ত্রী তথা বিশিষ্ট গায়ক ইন্দ্রনীল সেনকে আগামী ২১ নভেম্বর পর্যন্ত জেল হেফাজতে পাঠানোর নির্দেশ দিল ব্যাঙ্কশাল আদালত। শুক্রবার এই হাইপ্রোফাইল মামলার গুরুত্বপূর্ণ শুনানিতে আলিপুর ও ব্যাঙ্কশাল আদালতের অলিন্দে চরম নাটকীয় পরিস্থিতি তৈরি হয়। তদন্তকারী সংস্থার তরফে আদালতে ফাঁস করা হয় প্রাক্তন মন্ত্রীর একাধিক বেনামি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট এবং অবৈধ আর্থিক লেনদেনের শিউরে ওঠার মতো বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর নথিপত্র।
শুক্রবার শুনানির শুরুতেই সরকারি আইনজীবী আদালতে বিস্ফোরক তথ্য পেশ করে জানান, অভিযুক্ত ইন্দ্রনীল সেনের দু’টি নির্দিষ্ট ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে এই মুহূর্তে নগদ ২৭ লক্ষ টাকা গচ্ছিত রয়েছে। শুধু তা-ই নয়, তদন্তের স্বার্থে ইতোমধ্যে বাজেয়াপ্ত ও ফ্রিজ করা তাঁর একাধিক ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট মিলিয়ে মোট ১০ কোটি টাকার বিশাল আর্থিক লেনদেনের হদিস পাওয়া গিয়েছে।
সরকারি পক্ষের আইনজীবীরা স্পষ্ট জানান, শুক্রবার দিনভর চালানো তল্লাশি অভিযানে পুলিশ আরও ১৩টি নতুন এবং অত্যন্ত সংবেদনশীল নথি উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে। দুর্নীতির জাল কত দূর বিস্তৃত, তা উন্মোচন করতে এই নথিপত্রগুলি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই ও ফরেনসিক পরীক্ষা করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
আরও পড়ুন : দুর্নীতির কাঁচা টাকা মেয়ের কোম্পানিতে? লালবাজারে হাজিরা প্রাক্তন মন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেনের মেয়ের
তদন্তকারী আধিকারিকদের পেশ করা রিপোর্টে আরও এক চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। অভিযোগ, নিজের পরিচয় আড়াল করতে ও দুর্নীতির কালো টাকা লেনদেন নির্বিঘ্নে চালাতে একাধিক নিকটাত্মীয়ের নামে সিম কার্ড তুলেছিলেন প্রাক্তন মন্ত্রী।
সেই সব বেনামি সিম কার্ড ব্যবহার করেই পুজো পাসের বেআইনি কোটি কোটি টাকার লেনদেন সম্পন্ন করা হতো। ফলে প্রাক্তন মন্ত্রীর ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি বাজেয়াপ্ত করে তার সমস্ত ডিজিটাল ডেটা, কল রেকর্ডস ও চ্যাট হিস্ট্রি খতিয়ে দেখা অত্যন্ত প্রয়োজন বলে আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তদন্তকারীরা।
শুনানি চলাকালীন সরকারি পক্ষের তরফে জানানো হয়, দুর্নীতির এই মেগা চক্রান্তের শিকড়ে পৌঁছতে সরকারের একাধিক দফতর থেকে বেশ কিছু নথি তলব করা হয়েছে। কিন্তু সামনে টানা সরকারি ছুটি থাকার কারণে সেই সব নথিপত্র হাতে পেতে সামান্য সময় লাগতে পারে। সেই যুক্তি তুলে ধরেই আপাতত পুলিশি হেফাজতের মেয়াদ আর না বাড়িয়ে অভিযুক্ত প্রাক্তন মন্ত্রীকে ২১ নভেম্বর পর্যন্ত জেল হেফাজতে রাখার আর্জি জানান তাঁরা।
আরও পড়ুন: দুর্নীতির চূড়ামণি ইন্দ্রনীল! দাবি লালবাজারের, গ্রেফতার এবার টালা প্রত্যয়ের ধ্রুবজ্যোতি
অন্যদিকে, শুনানি চলাকালীন প্রাক্তন মন্ত্রীর আইনজীবীরা তাঁর শারীরিক অবস্থা ও সামাজিক মর্যাদার কথা বিবেচনা করে জেলে প্রথম শ্রেণির বন্দির (First Class Prisoner) মর্যাদার আবেদন জানান। বিচারক সেই আবেদন মঞ্জুর করে ইন্দ্রনীল সেনকে জেলে প্রথম শ্রেণির বন্দির সুবিধা দেওয়ার নির্দেশ দেন। তবে আদালতের এই রায়ের তীব্র বিরোধিতা করেন অভিযোগকারীর আইনজীবী।
তিনি সরাসরি প্রশ্ন তুলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন যে, ঠিক কোন আইনি ভিত্তিতে এবং কী যুক্তিতে এমন একজন গুরুতর আর্থিক দুর্নীতিতে অভিযুক্ত প্রাক্তন মন্ত্রীকে বিশেষ ভিআইপি বন্দির মর্যাদা দেওয়া হবে? এ বিষয়ে আদালতে বিস্তারিত ও পৃথক শুনানির প্রয়োজন রয়েছে বলে সোচ্চার হন তিনি। সব পক্ষের দীর্ঘ সওয়াল-জবাব শোনার পর বিচারক ২১ নভেম্বর পর্যন্ত ইন্দ্রনীলকে জেল হেফাজতে রাখার নির্দেশ বহাল রাখেন।
Leave a comment