কলকাতা: যুদ্ধ চলছে সুদূর মধ্যপ্রাচ্যে, কিন্তু তার বারুদের গন্ধ আর ক্ষেপণাস্ত্রের ধোঁয়া এবার সরাসরি আঘাত হানছে ভারতের আমজনতার রুটিরুজিতে। ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের জেরে বিশ্বজুড়ে তেলের বাজার অগ্নিগর্ভ। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় এক ভয়াবহ অচলবস্থার মুখে দাঁড়িয়ে দেশ। পরিস্থিতি এতটাই সংক্রামক যে, শিল্পমহল থেকে শুরু করে সাধারণ গিগ ওয়ার্কার—সবার কপালেই এখন চিন্তার ভাঁজ। অনেকেই মনে করছেন, লকডাউন না হলেও চোখের সামনে এক ‘অদৃশ্য লকডাউন’ শুরু হয়ে গেছে।
ভারতের জিডিপি-র একটা বড় অংশ খরচ হয় জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানিতে। বর্তমানে ডিজেল ও গ্যাসের জোগানে টান পড়ায় সবথেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (MSME)। হাওড়ার জালান কমপ্লেক্স থেকে শুরু করে আসানসোল-দুর্গাপুরের ইস্পাত ও সিমেন্ট কারখানা— সর্বত্রই ‘ধীরে চলো’ নীতি। কাঁচামালের অভাব আর চুল্লি জ্বালানোর ডিজেল না থাকায় অনেক কারখানাই উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে। শিলিগুড়িতে ইতিমধ্যেই একটি কারখানা ঝাঁপ বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে। শিল্পমহলের আশঙ্কা, উৎপাদন বন্ধ হলে অনিবার্যভাবেই আসবে কর্মী সংকোচনের খাঁড়া।
সবথেকে বড় ধাক্কা লেগেছে অ্যাপ-নির্ভর পরিষেবাগুলোতে। সুইগি, জোমাটো বা উবর-র্যাপিডো চালকদের আয় এক ধাক্কায় অনেকটাই কমেছে। একদিকে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, অন্যদিকে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পাওয়ায় কমেছে অনলাইনের অর্ডার। মহানগরের বেশ কিছু নামী রেস্তরাঁ ইতিমধ্যেই তালা বন্ধ। হোটেল ও রেস্তরাঁ সংগঠন এইচআরএআই (HRAI)-এর সভাপতি সুদেশ পোদ্দার জানিয়েছেন, জ্বালানি সংকটে রাজ্যে কয়েক লক্ষ মানুষ কাজ হারানোর আশঙ্কায় রয়েছেন।
এমনকি মিষ্টি শিল্পের মতো অত্যন্ত জনবহুল ক্ষেত্রেও দেখা দিয়েছে হাহাকার। প্রখ্যাত মিষ্টি উৎপাদক ধীমান দাশের মতে, গ্যাসের জোগান কমে যাওয়ায় এবং ভরতুকি উঠে যাওয়ায় এই শিল্প এখন গভীর সংকটে।
বিমান চলাচল বন্ধ, জলপথ অবিন্যস্ত—সব মিলিয়ে এক অচল অর্থনীতির অশনিসংকেত। মোবাইল টাওয়ারের ডিজেল থেকে শুরু করে রান্নার গ্যাস, সব ক্ষেত্রেই জোগানের সংকট প্রকট হচ্ছে। ফসমির রাজ্য সভাপতি বিশ্বনাথ ভট্টাচার্য মনে করছেন, এই অস্থিরতা দীর্ঘমেয়াদী হলে তা সামলানো কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়বে।
করোনাকালে মানুষ ঘরবন্দি ছিলেন ঠিকই, কিন্তু এবারের লড়াইটা আরও কঠিন। কারণ সব কিছু সচল দেখা গেলেও, জ্বালানি আর কাঁচামালের অভাবে নিঃশব্দে ধেয়ে আসছে অর্থনৈতিক মন্দা। মধ্যপ্রাচ্যের বারুদের গন্ধ কতদিন স্থায়ী হবে, তার ওপরই এখন নির্ভর করছে ভারতের কোটি কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা।

শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১২ মার্চ ২০২৬

প্রিয় পাঠক, কারিগরি ত্রুটির জন্য আমাদের ওয়েবসাইটি কয়েকঘণ্টা বন্ধ থাকায় আমরা আন্তরিক দুঃখিত। ভবিষ্যতে এরকম ত্রুটি এড়াতে আমরা বদ্ধপরিকর।
— হিডেন স্টোরিজ পরিবার
আপনার মতামত লিখুন