কলকাতা: বঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে শোচনীয় পরাজয়ের পর তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে যখন কার্যত গৃহযুদ্ধ বা ‘মুষল পর্ব’ শুরু হয়েছে, ঠিক তখনই মোক্ষম চাল দিল কংগ্রেস। বাংলায় ঘাসফুল শিবিরের এই চরম ডামাডোল এবং অভ্যন্তরীণ ভাঙনের আবহে এবার ঢাকঢোল পিটিয়ে ‘ঘর ওয়াপসি’র ডাক দিল হাত শিবির।
প্রদেশ কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্ব শনিবার স্পষ্ট জানিয়ে দিল, যেসব নেতার রাজনৈতিক জন্ম বা বেড়ে ওঠা কংগ্রেসে হয়েছিল, তারা যেন এবার পুরনো ঘরে ফিরে আসে! রাজনৈতিক মহলের মতে, তৃণমূলের বর্তমান শোচনীয় দশায় এই বার্তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তবে কি এই আহ্বানের সুদূরপ্রসারী লক্ষ্যে খোদ তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও রয়েছেন? এখন সেটাই পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির অন্যতম চর্চার বিষয়।
শনিবার প্রদেশ কংগ্রেসের রাজ্য পর্যবেক্ষক গুলাম আহমেদ মীর এবং শুভঙ্কর সরকাররা যৌথভাবে তৃণমূলের সেইসব নেতাদের কংগ্রেসে ফেরার আহ্বান জানান, যাঁরা একসময় ‘হাত’ চিহ্নের হাত ধরেই রাজনীতিতে এসেছিলেন। গুলাম আহমেদ মীর বলেন, “যাঁদের জন্ম কংগ্রেসে, কংগ্রেসে যাঁদের চোখ ফুটেছে এবং দল যাঁদের লালন-পালন করেছে — কিন্তু কোনও পরিস্থিতিতে, চাপে বা ক্ষোভে অন্য দলে চলে গিয়েছিলেন, তাঁরা ফিরে আসুন।
বিজেপির বিরুদ্ধে এই লড়াইটা এখন দ্বিতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের মতো। কংগ্রেস লড়াই থেকে পিছু হটবে না।” কংগ্রেস নেতৃত্বের এই প্রকাশ্য ডাক যে আদতে তৃণমূলের ক্ষুব্ধ ও দিশেহারা প্রথম সারির নেতাদের উদ্দেশ্যেই, তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই কূটনৈতিক মহলের।
বিধানসভা নির্বাচনের ফলপ্রকাশের পর সোনিয়া গান্ধী ও রাহুল গান্ধী স্বয়ং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে ফোনে কথা বলে লোকসভার ‘ইন্ডিয়া’ জোটকে মজবুত করার বার্তা দিয়েছিলেন। এরপর সাংবাদিক বৈঠকে এসে মমতাও জানান, তিনি বিজেপিকে হারাতে ‘ফ্রি বার্ড’ বা মুক্ত বিহঙ্গের মতো খাটতে রাজি। কিন্তু, সবচেয়ে বড় চমক ছিল ওই বৈঠকেই এক সাংবাদিকের করা প্রশ্ন। মমতাকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, আগামী দিনে কি কংগ্রেসের সঙ্গে তৃণমূলের মিশে যাওয়ার কোনও সম্ভাবনা রয়েছে? তৃণমূলনেত্রী তা ফুৎকারে উড়িয়ে না দিয়ে অত্যন্ত কৌশলে উত্তর দেন, “এটা ভবিষ্যতের কৌশলগত ব্যাপার। এখানে উত্তর দেব না।” মমতার এই সংক্ষিপ্ত ও রহস্যময় জবাব দুই দলের সংযুক্তির জল্পনাকে এক ধাক্কায় বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
নির্বাচনী বিপর্যয়ের পর এই মুহূর্তে এ রাজ্যে তৃণমূলের অবস্থা কার্যত হালভাঙা নৌকার মতো। একের পর এক পুরসভা ও পঞ্চায়েত হাতছাড়া হচ্ছে, দলের কর্মসূচিতে কর্মীরা আসছেন না, এমনকী নেত্রীর ডাকা বৈঠকেও বহু সাংসদ-বিধায়ক গরহাজির থাকছেন। কংগ্রেস সূত্রের চাঞ্চল্যকর দাবি, তৃণমূলের সংখ্যালঘু বিধায়কদের একটা বড় অংশ ইতিমধ্যেই কংগ্রেসের সঙ্গে তলে তলে যোগাযোগ শুরু করে দিয়েছেন। এমনকী, নিচুতলার কর্মী-সমর্থকরাও রাজনৈতিক নিরাপত্তার তাগিদে ‘হাত’ ধরতে মরিয়া।
তবে ঢালাও যোগদানের ক্ষেত্রে একটি কড়া ফিল্টারও রাখছে কংগ্রেস। শনিবার প্রদেশ নেতৃত্বের তরফে জানানো হয়েছে, দলবদলু নেতাদের স্ক্রুটিনির জন্য একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হচ্ছে। কংগ্রেসী ভাবধারার সৎ নেতাদের স্বাগত জানানো হলেও, যাঁরা এতদিন ক্ষমতার অপব্যবহার করে মানুষের ওপর অত্যাচার করেছেন বা দুর্নীতিতে যুক্ত থেকে নিজেদের ভাবমূর্তি কালিমালিপ্ত করেছেন, তাঁদের কিন্তু কোনওভাবেই দলে নেওয়া হবে না। সব মিলিয়ে, নির্বাচনের পর বাংলার রাজনৈতিক সমীকরণ যে এক তীব্র ওলটপালটের দিকে যাচ্ছে, তা বলাই বাহুল্য।

রোববার, ১৪ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৩ মে ২০২৬

প্রিয় পাঠক, কারিগরি ত্রুটির জন্য আমাদের ওয়েবসাইটি কয়েকঘণ্টা বন্ধ থাকায় আমরা আন্তরিক দুঃখিত। ভবিষ্যতে এরকম ত্রুটি এড়াতে আমরা বদ্ধপরিকর।
— হিডেন স্টোরিজ পরিবার
আপনার মতামত লিখুন