মালদহ: গরিব মানুষের চিকিৎসার জন্য তৈরি সরকারি প্রকল্পের টাকা লুঠ করে কি দেদার চলছে আন্তর্জাতিক মাদক পাচারের কারবার? এমনই এক অবিশ্বাস্য দুর্নীতির বিস্ফোরক পর্দাফাঁস হল মালদহ জেলায়। বিগত তৃণমূল সরকারের আমলে চালু হওয়া ‘স্বাস্থ্যসাথী’ কার্ডকে হাতিয়ার করে ভুয়া রোগী ভর্তি দেখিয়ে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করার মারাত্মক অভিযোগ উঠেছে জেলার একাধিক নার্সিংহোমের বিরুদ্ধে। জেলা স্বাস্থ্য দপ্তরের প্রাথমিক তদন্তে এই বিপুল অঙ্কের আর্থিক কেলেঙ্কারি সামনে আসতেই নড়েচড়ে বসেছে জেলা প্রশাসন। ইতিমধ্যেই কড়া পদক্ষেপ নিয়ে জেলার ৩০টিরও বেশি নার্সিংহোমের লাইসেন্স সাসপেন্ড করা হয়েছে, শোকজ করা হয়েছে আরও ১০টিকে এবং নজরদারির তালিকায় রাখা হয়েছে আরও অন্তত ২৫টি নার্সিংহোমকে। কিন্তু এই সবকিছুর মাঝেই সবচেয়ে বড় বোমাটি ফাটিয়েছে বিজেপি। তাদের দাবি, এই লুঠের টাকা সরাসরি বিনিয়োগ করা হয়েছে ব্রাউন সুগার ও ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত পারের বেআইনি মাদক পাচারের ব্যবসায়।
অভিযোগ, গত কয়েক বছরে মালদহ জেলার ১২ নম্বর জাতীয় সড়কের দুই ধারে, বিশেষ করে যদুপুর, গাবগাছি থেকে শুরু করে বড়নগর ডাঙা ও কালিয়াচক এলাকায় কোনো ন্যূনতম পরিকাঠামো ছাড়াই ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠেছে একের পর এক নার্সিংহোম। স্বাস্থ্য দপ্তরের লাইসেন্স ছাড়াই এই সমস্ত হাসপাতালে রমরমিয়ে চলছিল অপারেশন ও জটিল সব চিকিৎসা। শুধু তাই নয়, সরকারি আধিকারিকদের চোখে ধুলো দিতে এবং প্রভাব খাটাতে কোনো কোনো নার্সিংহোমের নাম দেওয়া হয়েছিল খোদ ‘বিশ্ব বাংলা’। প্রাথমিক তদন্তে প্রকাশ, শহরের আমবাজারের একটি এবং সুজাপুরের বড়নগর ডাঙার একটি নামী নার্সিংহোম সবচেয়ে বেশি টাকা লোপাট করেছে। গ্রামের সাধারণ মানুষের অজান্তেই তাঁদের স্বাস্থ্যসাথী কার্ড ব্যবহার করে কোনো চিকিৎসা না করিয়েই ভুয়া বিলের মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ টাকা রাজকোষ থেকে তুলে নেওয়া হতো, যা নিয়ে খোদ স্থানীয় চিকিৎসকেরাই পূর্বতন সরকারের উদাসীনতার দিকে আঙুল তুলেছেন।
এই জালিয়াতির খবর সামনে আসতেই জেলাজুড়ে তীব্র রাজনৈতিক তোলপাড় শুরু হয়েছে। মালদহ জেলা বিজেপি সভাপতি অজয় গঙ্গোপাধ্যায় এক চরম বিস্ফোরক দাবি করে জানিয়েছেন, এই ৩০০ কোটি টাকার জালিয়াতি শুধু স্বাস্থ্য ক্ষেত্রের দুর্নীতি নয়, এর পেছনে রয়েছে এক গভীর আন্তর্জাতিক মাদক সাম্রাজ্য। তাঁর অভিযোগ, “লুঠ হওয়া এই সরকারি টাকা সরাসরি ব্রাউন সুগারের কারবারে বিনিয়োগ করা হয়েছে। সেই তালিকায় যেমন কালিয়াচকের নার্সিংহোমগুলি রয়েছে, তেমনই রয়েছে শহর লাগোয়া গাবগাছি ও যদুপুর এলাকার ব্যাঙের ছাতার মতো গজানো হাসপাতালগুলি।” বিজেপির আরও মারাত্মক অভিযোগ, বাংলাদেশ সীমান্তের কুখ্যাত মাদক পাচারকারী ও চিহ্নিত অপরাধীরাই কালো টাকা সাদা করতে মালদহে মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে এই ভুয়ো নার্সিংহোমগুলি খুলে বসেছিল। ইংলিশবাজারের যদুপুর এলাকাতেই সামান্য দূরত্বের মধ্যে প্রায় ২৫টি এমন সন্দেহজনক নার্সিংহোম তৈরি হয়েছে বলে দাবি তাদের।
নার্সিংহোমের আড়ালে মাদক মাফিয়াদের এই ভয়ংকর যোগসূত্র সামনে আসার পর সাধারণ মানুষের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে। কারণ এই চক্রের কারণে হাজার হাজার গরিব মানুষ প্রকৃত চিকিৎসা পরিষেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছিলেন। জেলা বিজেপি সভাপতি অজয় গঙ্গোপাধ্যায় সাফ জানিয়েছেন, এই চক্রের শিকড় অনেক গভীরে ছড়ানো এবং এর পেছনে থাকা রাঘববোয়ালদের টেনে বের করতে তাঁরা নতুন সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও উচ্চপর্যায়ের তদন্তকারী সংস্থার কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করতে চলেছেন। রাজ্যে নতুন ডবল ইঞ্জিন সরকার আসার পরেই যেভাবে প্রশাসন জট খুলতে শুরু করেছে, তাতে মালদহের এই মাদক ও নার্সিংহোম মাফিয়াদের খেল যে এবার পুরোপুরি খতম হতে চলেছে, তা বলাই বাহুল্য।

শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৫ মে ২০২৬

প্রিয় পাঠক, কারিগরি ত্রুটির জন্য আমাদের ওয়েবসাইটি কয়েকঘণ্টা বন্ধ থাকায় আমরা আন্তরিক দুঃখিত। ভবিষ্যতে এরকম ত্রুটি এড়াতে আমরা বদ্ধপরিকর।
— হিডেন স্টোরিজ পরিবার
আপনার মতামত লিখুন