সবং: ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচনে নজিরবিহীন ভরাডুবির পর এবার তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে তীব্র আদি-নব্য দ্বন্দ্ব ও ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটল। দলের বহু শক্ত ঘাঁটিতে ঘাসফুল শিবির উপড়ে গিয়ে গেরুয়া ঝড় ওঠার পর থেকেই দলের নিচুতলা থেকে শুরু করে শীর্ষস্তরের নেতারাও একে অপরের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে শুরু করেছেন।
এই চরম অস্বস্তিকর আবহের মধ্যেই এবার সম্পূর্ণ ‘বেসুরো’ গাইলেন রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী তথা তৃণমূলের অত্যন্ত বর্ষীয়ান নেতা মানস ভূঁইয়া। নিজের নির্বাচনী কেন্দ্র সবংয়ে পরাজয়ের দায় নিজের ঘাড়ে নিলেও দলের সর্বোচ্চ নেতৃত্বকে কড়া ভাষায় বিঁধেছেন তিনি। একইসঙ্গে ‘মেদিনীপুরের ছেলে’ তথা রাজ্যের নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর দরাজ প্রশংসা করে তিনি বলেন, “শুভেন্দু মেদিনীপুরের সন্তান। ওকে বিলক্ষণ চিনি। মেদিনীপুরের একজন মানুষ হিসাবে শুভেন্দুর মুখ্যমন্ত্রী হওয়ায় গর্ব অনুভব করছি।”
আজ, সোমবার দুপুরে সবংয়ে দলীয় কার্যালয়ে আয়োজিত একটি সাংবাদিক সম্মেলনে মানস ভূঁইয়া স্পষ্ট জানান, গোটা রাজ্যে দলের এই ঐতিহাসিক বিপর্যয়ের জন্য কোনও এক জন ব্যক্তিকে বলির পাঁঠা বানানো ঠিক নয়। সবংয়ে নিজের হারের দায় তিনি নিজেই গ্রহণ করেছেন, তবে এর নেপথ্যে দলের অভ্যন্তরীণ কিছু গুরুতর ত্রুটি ও একাংশের অন্তর্ঘাতের সম্ভাবনাকে তিনি উড়িয়ে দেননি। এক সময় সবংয়ে তাঁরই অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও ছায়াসঙ্গী অমল পণ্ডা এবার বিজেপির টিকিটে দাঁড়িয়ে মানসবাবুকে পরাজিত করেছেন। এই প্রসঙ্গে বিস্ফোরক অভিযোগ তুলে বর্ষীয়ান নেতা বলেন, “অমল পণ্ডাকে বিজেপির প্রার্থী করার নেপথ্যে কলকাতার তৃণমূল ভবন থেকে শুরু করে দলের ঘাটাল সাংগঠনিক জেলার এক শীর্ষ নেতার সুনির্দিষ্ট ভূমিকা ছিল।”
সাংবাদিক সম্মেলনে রীতিমতো অভিমানী সুরে রাজ্যের এই প্রাক্তন মন্ত্রী বলেন, “২০১১ সালে রাজ্যে বামফ্রন্ট সরকারকে হটিয়ে ঐতিহাসিক পরিবর্তনের সময় তৎকালীন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি হিসেবে আমি জোট গঠনে কাঠবিড়ালির ভূমিকা পালন করেছিলাম। কিন্তু, সেই কঠিন কাজের স্বীকৃতি আজ পর্যন্ত দলের কেউ দেয়নি। এমনকী, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেও কোনও দিন এই ভূমিকার স্বীকৃতিস্বরূপ একটি কথাও বলতে শোনা যায়নি।”
উল্লেখ্য, ২০১১ সালে পরিবর্তনের সেই সন্ধিক্ষণে কংগ্রেসের সঙ্গে জোট করেই ক্ষমতায় এসেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আর সেই সময় প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি হিসেবে জোটের অন্যতম কাণ্ডারি ছিলেন এই মানস ভূঁইয়াই। এত বছর পর দলের চরম দুর্দিনে সেই পুরনো আক্ষেপ ও বঞ্চনার কথাই যেন তাঁর গলায় ঝরে পড়ল।
এদিকে দলের হারের জন্য একাংশ যখন সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে কাঠগড়ায় তুলছেন, তখন কিন্তু কৌশলে অভিষেকের পাশেই দাঁড়িয়েছেন মানস। দলের অন্যান্য নেতাদের চাতক বৃত্তিকে আক্রমণ করে তিনি বলেন, “এই হারের দায় কারও একার নয়। সাফল্য হলে আমার, আর ব্যর্থতা এলে দায় অন্যের — রাজনীতিতে এই সংস্কৃতি থেকে এবার মুক্তি চাই। এখন অনেকেই ওঁর (অভিষেক) ঘাড়ে দোষ চাপাচ্ছেন। অথচ এক সময় এই নেতারাই ওঁর সঙ্গে দেখা করার জন্য চাতক পাখির মতো উন্মুখ হয়ে বসে থাকত।”
নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে ধোঁয়াশা বজায় রাখলেও রাজ্যের নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ভূয়সী প্রশংসা শোনা যায় তাঁর মুখে। শুভেন্দুর উদ্দেশে মানস ভূঁইয়ার আন্তরিক আবেদন, “আপনি বাংলা ও মেদিনীপুরের মানুষের চোখের জল মোছান। রাজ্যে শান্তি ফিরিয়ে আনুন। শুভেন্দুর সঙ্গে যোগাযোগ হলে অবশ্যই কথা বলব।”
প্রসঙ্গত, ১৯৮২ সাল থেকে একটানা সবং কেন্দ্রের বিধায়ক ছিলেন মানস ভূঁইয়া। বাম আমলের চরম দাপটের দিনগুলিতেও সবংয়ের এই দুর্গ হাতছাড়া হয়নি তাঁর। প্রথমে কংগ্রেস এবং পরবর্তীতে ২০১৬ সালে তৃণমূলে যোগ দেওয়ার পরও সবংয়ে মানস ভূঁইয়া ছিলেন অপরাজেয়। কিন্তু, ছাব্বিশের এই বিধানসভা নির্বাচনে মোদী-শুভেন্দুর গেরুয়া ঝড়ে শেষ পর্যন্ত কুপোকাৎ হন এই বর্ষীয়ান রাজনীতিকও।

রোববার, ১৪ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৫ মে ২০২৬

প্রিয় পাঠক, কারিগরি ত্রুটির জন্য আমাদের ওয়েবসাইটি কয়েকঘণ্টা বন্ধ থাকায় আমরা আন্তরিক দুঃখিত। ভবিষ্যতে এরকম ত্রুটি এড়াতে আমরা বদ্ধপরিকর।
— হিডেন স্টোরিজ পরিবার
আপনার মতামত লিখুন