কলকাতা: বারাসতের বিদায়ী সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদারের ‘বিদ্রোহ’ এবং শুভেন্দু অধিকারীর বৈঠকে যোগদানের কিছুক্ষণের মধ্যেই তৃণমূলের অন্দরে এবার দ্বিতীয় পারমাণবিক বিস্ফোরণটি ঘটালেন প্রবীণ রাজ্যসভা সাংসদ সুখেন্দুশেখর রায়।
বঙ্গে ঘাসফুল শিবিরের শোচনীয় পরাজয় ও সরকার পতনের পর থেকেই দলের প্রবীণ নেতাদের একাংশ যেভাবে ‘বেসুরো’ হতে শুরু করেছেন, সেই তালিকায় নতুন ও সবচেয়ে বড় সংযোজন এই বর্ষীয়ান রাজনীতিক। মঙ্গলবার সকালে সমাজমাধ্যমে রোমান সাম্রাজ্যের ইতিহাসের এক ইঙ্গিতপূর্ণ অধ্যায় তুলে ধরে সুখেন্দুবাবু সরাসরি লিখেছেন, “পশ্চিমবঙ্গের মানুষ অসহনীয় নৈরাজ্যের অবসান ঘটিয়েছেন।” তাঁর এই একটিমাত্র পোস্ট ঘিরেই এখন রাজ্য রাজনীতি ও তৃণমূলের অন্দরে এক চরম হুলুস্থুল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
সোশ্যাল মিডিয়ায় বোমা ফাটানোর পাশাপাশি নিজের ঘনিষ্ঠমহলেও তৃণমূলের এই ভরাডুবির আসল কারণ নিয়ে মুখ খুলেছেন সুখেন্দুশেখর রায়। তাঁর ঘনিষ্ঠদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সুখেন্দুবাবু প্রশ্ন তুলেছেন যে ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে যে দল ২৯টি আসনে জিতে বিজেপিকে কোণঠাসা করে দিয়েছিল, মাত্র দু’বছরের ব্যবধানে সেই তৃণমূলের এমন শোচনীয় বিপর্যয় হলো কী করে? এই পর্যালোচনায় তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন যে আরজি কর হাসপাতালে তরুণী চিকিৎসককে ধর্ষণ ও খুনের ঘটনার পর বাংলার রাজপথে যখন লক্ষ লক্ষ সাধারণ মানুষ নেমেছিলেন, তৃণমূল নেতৃত্ব সেই ‘দেওয়াল লিখন’ পড়তে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছিল।
শুধু তাই নয়, দলের ‘প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি’ নিয়েও তীব্র ক্ষোভ উগরে দিয়ে তিনি ঘনিষ্ঠমহলে মন্তব্য করেছেন যে, পশ্চিমবঙ্গের যেকোনো গ্রামে এখন সবচেয়ে বড় বাড়িটি যাঁর, তিনিই হলেন তৃণমূলের পঞ্চায়েত প্রধান। সাধারণ মানুষ এই দুর্নীতি নিজের খালি চোখে দেখেছে এবং তার ফলেই মানুষ বিকল্প হিসেবে বিজেপিকে বেছে নিয়েছে। বর্ষীয়ান নেতার মতে, ২০১১ সালে মানুষ ভোট দিয়েছিল সিপিএমকে তাড়াতে, আর ২০২৬-এ ভোট দিয়েছে তৃণমূলকে তাড়াতে।
ছয় দশক ধরে বাংলার ও দিল্লির রাজনীতির অলিন্দ চষে ফেলা এই বর্ষীয়ান সাংসদের ‘বেসুরো’ হওয়া তৃণমূলের জন্য এক বিরাট অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অবশ্য সুখেন্দুবাবুর এই সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার ঘটনা প্রথম নয়। ২০২৪ সালের অগস্ট মাসে আরজি কর কাণ্ডের প্রতিবাদে যখন শহর কলকাতার রাজপথ উত্তাল হয়েছিল, তখনও দলীয় অবস্থানের বাইরে গিয়ে তৎকালীন তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে মুখ খুলেছিলেন তিনি। ফরাসি বিপ্লব ও বাস্তিল দুর্গ ধ্বংসের প্রসঙ্গ টেনে তিনি পোস্ট করেছিলেন এবং দক্ষিণ কলকাতার যোধপুর পার্কে নেতাজি মূর্তির সামনে ধর্নাতেও বসেছিলেন। সেবার পুলিশের বিরুদ্ধে ভুল তথ্য দেওয়ার দায়ে পোস্ট মুছে বিতর্কে ইতি টানলেও, এবার রাজ্যের ক্ষমতার পরিবর্তনের পর তাঁর এই ‘নৈরাজ্য অবসান’-এর তত্ত্ব বুঝিয়ে দিচ্ছে যে দলের সাংগঠনিক খোলনলচে এবং শুদ্ধকরণ না করলে আগামী দিনে তৃণমূলের অস্তিত্বই চরম সংকটে পড়বে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একের পর এক প্রবীণ নেতার এই বিদ্রোহ তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ ফাটলকে পুরোপুরি প্রকাশ্য রাস্তায় এনে দাঁড় করিয়েছে। চার দশকের পুরনো নেত্রী কাকলি ঘোষ দস্তিদারকে সংসদীয় দলের মুখ্য সচেতকের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার পরেই তিনি ফেসবুকে ক্ষোভ উগরে দিয়ে রবিবার বারাসত সাংগঠনিক জেলা সভাপতির পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন এবং মঙ্গলবার সকালেই কল্যাণীতে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর প্রশাসনিক বৈঠকে যোগ দিয়ে চমক দিয়েছেন। আর তাঁর এই পদক্ষেপের রেশ কাটতে না কাটতেই রাজ্যসভায় তৃণমূলের অন্যতম প্রবীণ মুখ সুখেন্দুশেখর রায়ের এমন বিস্ফোরক পোস্ট বঙ্গে এক বড়সড় রাজনৈতিক ওলটপুরাণের স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে, যা সামাল দেওয়া বর্তমান পরিস্থিতিতে ঘাসফুল শিবিরের পক্ষে অত্যন্ত কঠিন।

শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৬ মে ২০২৬

প্রিয় পাঠক, কারিগরি ত্রুটির জন্য আমাদের ওয়েবসাইটি কয়েকঘণ্টা বন্ধ থাকায় আমরা আন্তরিক দুঃখিত। ভবিষ্যতে এরকম ত্রুটি এড়াতে আমরা বদ্ধপরিকর।
— হিডেন স্টোরিজ পরিবার
আপনার মতামত লিখুন