Hidden Stories (বাংলা)
সর্বশেষ

৬টি ঘরের লাইসেন্সে চলত ১৯টি অবৈধ রুম, ছিল না ফায়ার এক্সিট! দিল্লির জতুগৃহে ২১ জনের মৃত্যুর নেপথ্যে কোন ভয়ঙ্কর দুর্নীতি?

৬টি ঘরের লাইসেন্সে চলত ১৯টি অবৈধ রুম, ছিল না ফায়ার এক্সিট! দিল্লির জতুগৃহে ২১ জনের মৃত্যুর নেপথ্যে কোন ভয়ঙ্কর দুর্নীতি?
ছবি সংগৃহীত

নয়াদিল্লি: পকেটসই বাজেটে দেশের রাজধানীর বুকে ঝাঁ চকচকে থাকার জায়গা! তাই চিকিৎসার প্রয়োজনে কিংবা ঘুরতে আসা বিদেশি নাগরিকদের কাছে অত্যন্ত পছন্দের ঠিকানা ছিল দক্ষিণ দিল্লির মালব্য নগরের এই 'বেড-অ্যান্ড-ব্রেকফাস্ট' (BnB) হোটেলটি। কিন্তু বুধবার সাতসকালে লাগা এক প্রলয়ঙ্কারী আগুনে ভস্মীভূত হয়ে গেল গোটা বহুতল, যাতে জীবন্ত পুড়ে ছাই হয়ে গেছেন অন্তত ২১ জন নিষ্পাপ মানুষ। 


আর এই হাড়হিম করা ট্র্যাজেডির কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তদন্তে নেমে চক্ষু চড়কগাছ পুলিশের। প্রাথমিক তদন্তের পর জানা গেছে, হোটেলটি আক্ষরিক অর্থেই একটা অবৈধ 'জতুগৃহ' ছাড়া আর কিছুই ছিল না। বহুতলটির ভিতরে এমনভাবে বেআইনি নির্মাণ ও দুর্নীতির জাল বিছানো ছিল যে, আগুন লাগার পর সাধারণ মানুষের বাঁচার সব পথ এক লহমায় বন্ধ হয়ে যায়। আশঙ্কাজনক অবস্থায় এখনও প্রায় ৪০ জন দিল্লির এইমস (AIIMS) হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন।


তদন্তকারীরা হোটেলের ধ্বংসস্তূপ খতিয়ে দেখে যে চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এনেছেন, তা শুনলে যে কারও গায়ের লোম খাড়া হয়ে যাবে। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, ওই আবাসিক এলাকায় সর্বোচ্চ আটটি রুম এবং ১৬টি বেড রাখার অনুমোদন মেলে। নথি বলছে, হোটেলটির আসল লাইসেন্স ছিল মাত্র ছ’টি ঘর খোলার! কিন্তু বহুতলটির আসল ব্লু-প্রিন্ট বা নকশাকে সম্পূর্ণ বুড়ো আঙুল দেখিয়ে, স্রেফ অতিরিক্ত মুনাফা লোটার চক্করে সেখানে রাতারাতি তৈরি করে ফেলা হয়েছিল ১৯টি অতিরিক্ত অবৈধ ঘর। 'ফ্লোরিস স্টে' নামে নথিভুক্ত এই হোটেলের বেআইনি ঘরগুলোর অনেকগুলিতেই আলো-বাতাস ঢোকার কোনও জানলা বা ভেন্টিলেশনের নূন্যতম ব্যবস্থাও ছিল না। ফলে আগুন লাগার সঙ্গে সঙ্গেই পুরো বহুতলটি বিষাক্ত ধোঁয়ার গ্যাস চেম্বারে পরিণত হয়।


এই বহুতলে নিরাপত্তার সমস্ত বিধিকে পদাঘাত করার যে চরম খতিয়ান মিলেছে, তা একপ্রকার অপরাধেরই শামিল। এত বড় একটি হোটেলে আপৎকালীন পরিস্থিতিতে প্রাণ বাঁচিয়ে বেরোনোর জন্য কোনও 'ফায়ার এক্সিট' বা জরুরি নির্গমন দ্বার ছিল না! পুরো বিল্ডিংয়ে ঢোকা এবং বেরোনোর জন্য ছিল স্রেফ একটিমাত্র সরু গেট। হোটেলের ভেতরের করিডরগুলি ছিল অত্যন্ত সংকীর্ণ এবং তার লে-আউট ছিল গোলকধাঁধার মতো জটিল। ফলে আগুন লাগার পর যখন চারদিক ধোঁয়ায় অন্ধ হয়ে যায়, আবাসিকরা বেরোনোর রাস্তা খুঁজে পাননি। এমনকি দমকলকর্মীরা যখন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভিতরে ঢোকেন, এই জটিল ও বেআইনি পরিকাঠামোর কারণে কোন ঘরটি কোথায় অবস্থিত, তা খুঁজে পেতেই তাঁদের মূল্যবান সময় নষ্ট হয়ে যায়।


অভিযোগের তালিকা এখানেই শেষ নয়; হোটেলটিতে কোনও কার্যকর ফায়ার অ্যালার্ম বা আগুন নেভানোর পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপক সিলিন্ডার ছিল না, যা ছিল তাও অকেজো। প্রয়োজনীয় সরকারি ছাড়পত্র ছাড়াই কীভাবে প্রশাসনের নাকের ডগায় বছরের পর বছর ধরে দিল্লির বুকে এই মরণফাঁদ চলছিল, তা নিয়ে এখন স্থানীয় পুরসভা ও পুলিশ প্রশাসনের দিকে তীব্র ক্ষোভের আঙুল তুলেছেন সাধারণ মানুষ। দিল্লির সরকারি সূত্রের খবর, এই ভয়াবহ কাণ্ডের পর নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন। তড়িঘড়ি দিল্লির সমস্ত ছোট হোটেল, গেস্টহাউস ও এই ধরনের বেসরকারি হোম-স্টেগুলিতে ব্যাপক তল্লাশি ও স্ক্রুটিনি চালানোর কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই অগ্নিকাণ্ড আবারও প্রমাণ করে দিল যে, মানুষের জীবনের দাম সস্তা করে দিয়ে কেবল বাণিজ্যিক লাভের লোভ শেষ পর্যন্ত কতটা মর্মান্তিক ও নারকীয় পরিণতি ডেকে আনতে পারে।

বিষয় : delhinews illegalconstruction lemongreenhotel malvianagartragedy delhihotelfire

আপনার মতামত লিখুন

Hidden Stories (বাংলা)

শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬


৬টি ঘরের লাইসেন্সে চলত ১৯টি অবৈধ রুম, ছিল না ফায়ার এক্সিট! দিল্লির জতুগৃহে ২১ জনের মৃত্যুর নেপথ্যে কোন ভয়ঙ্কর দুর্নীতি?

প্রকাশের তারিখ : ০৩ জুন ২০২৬

featured Image
নয়াদিল্লি: পকেটসই বাজেটে দেশের রাজধানীর বুকে ঝাঁ চকচকে থাকার জায়গা! তাই চিকিৎসার প্রয়োজনে কিংবা ঘুরতে আসা বিদেশি নাগরিকদের কাছে অত্যন্ত পছন্দের ঠিকানা ছিল দক্ষিণ দিল্লির মালব্য নগরের এই 'বেড-অ্যান্ড-ব্রেকফাস্ট' (BnB) হোটেলটি। কিন্তু বুধবার সাতসকালে লাগা এক প্রলয়ঙ্কারী আগুনে ভস্মীভূত হয়ে গেল গোটা বহুতল, যাতে জীবন্ত পুড়ে ছাই হয়ে গেছেন অন্তত ২১ জন নিষ্পাপ মানুষ। আর এই হাড়হিম করা ট্র্যাজেডির কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তদন্তে নেমে চক্ষু চড়কগাছ পুলিশের। প্রাথমিক তদন্তের পর জানা গেছে, হোটেলটি আক্ষরিক অর্থেই একটা অবৈধ 'জতুগৃহ' ছাড়া আর কিছুই ছিল না। বহুতলটির ভিতরে এমনভাবে বেআইনি নির্মাণ ও দুর্নীতির জাল বিছানো ছিল যে, আগুন লাগার পর সাধারণ মানুষের বাঁচার সব পথ এক লহমায় বন্ধ হয়ে যায়। আশঙ্কাজনক অবস্থায় এখনও প্রায় ৪০ জন দিল্লির এইমস (AIIMS) হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন।তদন্তকারীরা হোটেলের ধ্বংসস্তূপ খতিয়ে দেখে যে চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এনেছেন, তা শুনলে যে কারও গায়ের লোম খাড়া হয়ে যাবে। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, ওই আবাসিক এলাকায় সর্বোচ্চ আটটি রুম এবং ১৬টি বেড রাখার অনুমোদন মেলে। নথি বলছে, হোটেলটির আসল লাইসেন্স ছিল মাত্র ছ’টি ঘর খোলার! কিন্তু বহুতলটির আসল ব্লু-প্রিন্ট বা নকশাকে সম্পূর্ণ বুড়ো আঙুল দেখিয়ে, স্রেফ অতিরিক্ত মুনাফা লোটার চক্করে সেখানে রাতারাতি তৈরি করে ফেলা হয়েছিল ১৯টি অতিরিক্ত অবৈধ ঘর। 'ফ্লোরিস স্টে' নামে নথিভুক্ত এই হোটেলের বেআইনি ঘরগুলোর অনেকগুলিতেই আলো-বাতাস ঢোকার কোনও জানলা বা ভেন্টিলেশনের নূন্যতম ব্যবস্থাও ছিল না। ফলে আগুন লাগার সঙ্গে সঙ্গেই পুরো বহুতলটি বিষাক্ত ধোঁয়ার গ্যাস চেম্বারে পরিণত হয়।এই বহুতলে নিরাপত্তার সমস্ত বিধিকে পদাঘাত করার যে চরম খতিয়ান মিলেছে, তা একপ্রকার অপরাধেরই শামিল। এত বড় একটি হোটেলে আপৎকালীন পরিস্থিতিতে প্রাণ বাঁচিয়ে বেরোনোর জন্য কোনও 'ফায়ার এক্সিট' বা জরুরি নির্গমন দ্বার ছিল না! পুরো বিল্ডিংয়ে ঢোকা এবং বেরোনোর জন্য ছিল স্রেফ একটিমাত্র সরু গেট। হোটেলের ভেতরের করিডরগুলি ছিল অত্যন্ত সংকীর্ণ এবং তার লে-আউট ছিল গোলকধাঁধার মতো জটিল। ফলে আগুন লাগার পর যখন চারদিক ধোঁয়ায় অন্ধ হয়ে যায়, আবাসিকরা বেরোনোর রাস্তা খুঁজে পাননি। এমনকি দমকলকর্মীরা যখন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভিতরে ঢোকেন, এই জটিল ও বেআইনি পরিকাঠামোর কারণে কোন ঘরটি কোথায় অবস্থিত, তা খুঁজে পেতেই তাঁদের মূল্যবান সময় নষ্ট হয়ে যায়।অভিযোগের তালিকা এখানেই শেষ নয়; হোটেলটিতে কোনও কার্যকর ফায়ার অ্যালার্ম বা আগুন নেভানোর পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপক সিলিন্ডার ছিল না, যা ছিল তাও অকেজো। প্রয়োজনীয় সরকারি ছাড়পত্র ছাড়াই কীভাবে প্রশাসনের নাকের ডগায় বছরের পর বছর ধরে দিল্লির বুকে এই মরণফাঁদ চলছিল, তা নিয়ে এখন স্থানীয় পুরসভা ও পুলিশ প্রশাসনের দিকে তীব্র ক্ষোভের আঙুল তুলেছেন সাধারণ মানুষ। দিল্লির সরকারি সূত্রের খবর, এই ভয়াবহ কাণ্ডের পর নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন। তড়িঘড়ি দিল্লির সমস্ত ছোট হোটেল, গেস্টহাউস ও এই ধরনের বেসরকারি হোম-স্টেগুলিতে ব্যাপক তল্লাশি ও স্ক্রুটিনি চালানোর কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই অগ্নিকাণ্ড আবারও প্রমাণ করে দিল যে, মানুষের জীবনের দাম সস্তা করে দিয়ে কেবল বাণিজ্যিক লাভের লোভ শেষ পর্যন্ত কতটা মর্মান্তিক ও নারকীয় পরিণতি ডেকে আনতে পারে।

Hidden Stories (বাংলা)


কপিরাইট © ২০২৬ Hidden Stories (বাংলা) । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

দৃষ্টি আকর্ষণ

প্রিয় পাঠক, কারিগরি ত্রুটির জন্য আমাদের ওয়েবসাইটি কয়েকঘণ্টা বন্ধ থাকায় আমরা আন্তরিক দুঃখিত। ভবিষ্যতে এরকম ত্রুটি এড়াতে আমরা বদ্ধপরিকর।

— হিডেন স্টোরিজ পরিবার