কলকাতা: বাংলায় বিধানসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর ঠিক এক মাস কাটতে না কাটতেই কার্যত ল্যাজেগোবরে অবস্থা ঘাসফুল শিবিরের। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের একচ্ছত্র কব্জা থেকে দলকে কার্যত বের করে এনেছেন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর অনুগামীরা। বিধানসভায় জোড়াফুলের সিংহভাগ বিধায়ককে পাশে নিয়ে ঋতব্রতরা নতুন দল গঠন করতেই রাজ্য রাজনীতিতে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন— তৃণমূলের কয়েক’শ কোটি টাকার দলীয় তহবিলের দখল এবার কার হাতে যাবে?
বহিরঙ্গে যখন ঘাসফুল প্রতীক হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কা তাড়া করছে, তখন অন্দরে তৃণমূল (ম) অর্থাৎ মমতা শিবিরের সবচেয়ে বড় চিন্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে দলের বিশাল কোষাগারকে বাঁচানো। কারণ এই বিপুল অর্থ চলে গেলে আগামী দিনে বিরোধী রাজনীতির কর্মসূচি চালানোই মমতার পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়বে। কালীঘাট ঘনিষ্ঠ এক নেতার কথায়, দিদি এখন আক্ষেপ করছেন যে গত ১৫ বছর মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে বেতন না তুলে হয়তো ভুলই করেছেন, কারণ দুর্দিনে বিত্তশালী হওয়া কোনও নেতাই নিজের তিজোরি খুলবেন না।
তৃণমূলের এই আশঙ্কার নেপথ্যে রয়েছে দলটির অভাবনীয় আর্থিক প্রতিপত্তি। নির্বাচন কমিশনে ঘোষিত বিগত পাঁচটি আর্থিক বছরের খতিয়ান দেখলেই স্পষ্ট হয় তৃণমূলের রাজকীয় তহবিলের বহর। ২০২০-২১ আর্থিক বছরে দলটির আয় ছিল ১৩২.৫৩ কোটি টাকা, যা ২০২১-২২ সালে লাফিয়ে দাঁড়ায় ৫৪৫.৭৪ কোটিতে। এরপর ২০২২-২৩ সালে ৩৩৩.৪৫ কোটি এবং ২০২৩-২৪ আর্থিক বছরে তা এক ধাক্কায় বেড়ে হয় রেকর্ড ৬৪৬.৩৯ কোটি টাকা। এমনকী ২০২৪-২৫ সালেও দলটির ঘরে এসেছিল ২১৯.৩৫ কোটি টাকা। অ্যাসোসিয়েশন ফর ডেমোক্রটিক রিফর্মস (ADR)-এর ম্যাচিং ডেটা অনুযায়ী, ইলেক্টোরাল বন্ডের মাধ্যমে দেশজুড়ে বিজেপির পরেই সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়েছিল তৃণমূল। বন্ড মারফত তারা পেয়েছিল প্রায় ১,৫৯২.৫২ কোটি টাকা, যার মধ্যে লটারি কিং 'ফিউচার গেমিং' একাই দিয়েছিল ৫৪২ কোটি টাকা এবং হলদিয়া এনার্জি দিয়েছিল ২৮১ কোটি টাকা। বন্ড বন্ধ হওয়ার পরও ২০২৪-২৫ সালে প্রুডেন্ট বা টাইগারের মতো বিভিন্ন ইলেক্টোরাল ট্রাস্টের মাধ্যমে ১৮৪.৫ কোটি টাকা অনুদান পেয়ে দেশের সমস্ত আঞ্চলিক দলগুলির মধ্যে আয়ের নিরিখে শীর্ষে ছিল তৃণমূলই।
লোকসভা নির্বাচনে ২২৭.৫৯ কোটি টাকা খরচের পর এবং সদ্য সমাপ্ত ২০২৬ সালের বিধানসভা ভোটের বিপুল খরচা বাদ দিলেও রাজনৈতিক মহলের ধারণা, তৃণমূলের মূল ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টগুলোতে এই মুহূর্তে খুব কম করে ৫০০ থেকে ৭০০ কোটি টাকার তহবিল অক্ষত থাকার কথা। এই বিপুল টাকার চাবি কার হাতে থাকবে, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই কালীঘাটে তৎপরতা তুঙ্গে।
তৃণমূল (ম)-এর এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, দলের সব কমিটি এই মুহূর্তে ভেঙে দেওয়া হয়েছে, ফলে বর্তমান কোষাধ্যক্ষ কে তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে চাইলেই নব্য গোষ্ঠী বা ঋতব্রতরা এই তহবিলে হাত দিতে পারবে না। বিধানসভায় যে কায়দায় বিরোধী দলনেতা নির্বাচন করা হয়েছে, তার বৈধতা নিয়েই প্রশ্ন তুলছে মমতার অনুগামীরা। দলের সংবিধান খতিয়ে দেখে খুব দ্রুত শীর্ষ আদালতের দ্বারস্থ হতে চলেছে কালীঘাট। এখন দেখার, বিধায়ক ও প্রতীক হারানোর পর দলের এই মেগা ফান্ডের চাবি মমতা নিজেরা ধরে রাখতে পারেন নাকি তাও চলে যায় বিদ্রোহীদের পকেটে।

রোববার, ১৪ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৪ জুন ২০২৬

প্রিয় পাঠক, কারিগরি ত্রুটির জন্য আমাদের ওয়েবসাইটি কয়েকঘণ্টা বন্ধ থাকায় আমরা আন্তরিক দুঃখিত। ভবিষ্যতে এরকম ত্রুটি এড়াতে আমরা বদ্ধপরিকর।
— হিডেন স্টোরিজ পরিবার
আপনার মতামত লিখুন