কলকাতা: "মনে কি দ্বিধা রেখে গেলে চলে!" কবিগুরুর এই অমর সৃষ্টিই যেন এখন বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছে তৃণমূলের বিক্ষুব্ধ সাংসদ শতাব্দী রায়ের বর্তমান মানসিক পরিস্থিতিকে। যে 'দিদি' তাঁকে চার-চারবার সাংসদ করে দিল্লির দরবারে পাঠালেন, তাঁর হাত ছাড়ার মুহূর্তে বীরভূমের এই দাপুটে অভিনেত্রীর মনে কি সত্যিই কোনো দ্বিধা কাজ করছে? তৃণমূল ছেড়ে দিলেও মনটা কি এখনও পড়ে রয়েছে কালীঘাটের সেই চেনা গলিতেই? সম্প্রতি সর্বভারতীয় এক সংবাদমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শতাব্দীর বিস্ফোরক ও আবেগঘন বয়ানে কিন্তু মিলল ঠিক তেমনই ইঙ্গিত। কাকলি ঘোষ দস্তিদারের নেতৃত্বে যে সমস্ত সাংসদরা ঘাসফুল শিবিরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছেন, শতাব্দী রায় তাঁদের মধ্যে অন্যতম শীর্ষ মুখ। গত সোমবার রাতে দিল্লিতে শতাব্দীর খাস বাসভবনেই বসেছিল এক হাইভোল্টেজ বৈঠক, যেখানে সশরীরে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী স্বয়ং। তারপর থেকেই বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে রীতিমতো অকপট শতাব্দী, নির্দ্বিধায় উগরে দিচ্ছেন নিজের মনের ভেতরের সমস্ত অনুভূতির কথা।
রাজনৈতিক মহলে দীর্ঘদিন ধরেই একটা চর্চা রয়েছে যে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হাত না ধরলে শতাব্দী রায়ের হয়তো রাজনীতিবিদ হয়ে ওঠাই হতো না, সাংসদ হওয়া তো অনেক দূরের কথা। আর আজ যখন বাংলায় বিজেপির কাছে শতাধিক আসনের ফারাকে মুখ থুবড়ে পড়েছে তৃণমূল কংগ্রেস, তখন সেই নেত্রীকে ছেড়ে আসা কি সত্যিই নৈতিক? সাক্ষাৎকারে এই কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি হয়ে শতাব্দীর জবাব, "রাজনৈতিক দিক থেকে হয়তো সিদ্ধান্তটা ঠিকই নিয়েছি। তবে আবেগ দিয়ে ভাবলে নীতিগত দিক থেকে হয়তো এটা ঠিক নয়।" একটা সময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সমস্ত মিটিং-মিছিলে যাঁকে সামনের সারিতে দেখা যেত, আজ শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে বৈঠকের পর সেই শতাব্দী রায়ই বিজেপি নেতৃত্বাধীন জোট এনডিএ-কে সমর্থন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এই চরম মুহূর্তে দাঁড়িয়ে দিদিকে কী বার্তা দিতে চান? আবেগতাড়িত গলায় বিদ্রোহী সাংসদ শুধু বললেন, ”মিস ইউ দিদি।”
‘মুখ্যমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীর আশীর্বাদে দায়িত্ব পালন করব
কিন্তু কেন এই দলবদল? কীসের এত অভিমান? শতাব্দীর যুক্তি, পরাজয়ের আসল কারণটা মানতেই রাজি নন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, আর ঠিক এখানেই তাঁর তীব্র আপত্তি। তিনি সাফ জানান, দুর্নীতিই যে দলের এই বিপর্যয়ের আসল কারণ, তা এখন জলের মতো পরিষ্কার। কিন্তু তারপরও সেটা কিছুতেই মানতে চাইলেন না দলনেত্রী। ২০২৬-এর বিধানসভা ভোটের ফল প্রকাশের পরই কালীঘাটে এক জরুরি বৈঠক ডেকেছিলেন তৃণমূল সুপ্রিমো। শতাব্দী আশা করেছিলেন, সেখানে হারের ময়নাতদন্ত হবে, কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল উল্টো ছবি। সংবাদমাধ্যমের সামনে সেদিন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করেছিলেন, তিনি হারেননি, তাঁকে চক্রান্ত করে হারানো হয়েছে। এমনকি মুখ্যমন্ত্রী পদ থেকে ইস্তফা দিতেও রাজি হননি তিনি। শতাব্দী রায়ের অভিযোগ, "আমাদের কাউকে সেদিন মুখ খুলতে দেওয়া হয়নি, মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা ছিল না। পরিষ্কার বলে দেওয়া হয়েছিল, কিছু বলার থাকলে তা লিখে জানাতে।"
ওই সাক্ষাৎকারে শতাব্দী স্পষ্ট করে দিয়েছেন, কালীঘাটের সেই বৈঠকের দিনই তিনি বুঝে গিয়েছিলেন যে তৃণমূলের সঙ্গে আর থাকা সম্ভব নয়। আসলে কী চেয়েছিলেন তাঁরা? শতাব্দী বলেন, ”আমরা চেয়েছিলাম হারের কারণগুলো নিয়ে খোলামেলা আলোচনা হোক। আইপ্যাক এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে কথা হোক। দুর্নীতি যে একটা বড় চ্যালেঞ্জ ছিল, তা স্বীকার করা হোক। কিন্তু দলনেত্রী কোনো আলোচনাতেই রাজি হননি। সেদিনই বুঝেছিলাম, এই দলে কোনো পরিবর্তন বা নতুন ধারণার জায়গা নেই।” তবে রাজনীতি বা নীতির লড়াই বাদ দিলে, আবেগের জায়গা থেকে মমতাকে ছেড়ে আসার একটা তীব্র যন্ত্রণা রয়েছে শতাব্দীর মনে। তিনি অকপটে স্বীকার করেছেন, ”মানতে পারছি না যে আমি দিদির সঙ্গে নেই। আমার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য খুব খারাপ লাগছে।” তবে আগামী দিনে তৃণমূলের ভবিষ্যৎ কী? শতাব্দী মনে করেন, এখন আর কোনো পথ খোলা নেই, কংগ্রেসের সঙ্গে জোট করাই একমাত্র উপায়। কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কোনোদিনই নিজেকে কোনো জোটে 'সেকেন্ড ম্যান' হিসেবে দেখতে চাইবেন না, এটাই বাস্তব।

রোববার, ১৪ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১১ জুন ২০২৬

প্রিয় পাঠক, কারিগরি ত্রুটির জন্য আমাদের ওয়েবসাইটি কয়েকঘণ্টা বন্ধ থাকায় আমরা আন্তরিক দুঃখিত। ভবিষ্যতে এরকম ত্রুটি এড়াতে আমরা বদ্ধপরিকর।
— হিডেন স্টোরিজ পরিবার
আপনার মতামত লিখুন