কলকাতা: শনিবার সন্ধ্যায় যেখানে উৎসবের আলো আর আনন্দের জোয়ারে গমগম করছিল উত্তর কলকাতার চোরবাগান এলাকা, মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে সেখানে নেমে এসেছে এক অচেনা নিস্তব্ধতা ও গভীর বিষাদ। পুজো মণ্ডপের ঠিক পাশেই এদিক-ওদিক ছড়িয়ে রয়েছে দর্শনার্থীদের ছোট-বড় জুতো, যা সেই রাতের বিভীষিকা ও মৃত্যুর গ্রাসের নীরব সাক্ষী হয়ে রয়েছে। সপ্তমীর রাতে পদপিষ্ট হয়ে শিশু সহ ১৯ জনের মর্মান্তিক মৃত্যুর পর রবিবারের সকালে চোরবাগানের চেনা ছবিটা সম্পূর্ণ বদলে গেছে। মণ্ডপ সংলগ্ন বাড়ির বেশিরভাগ জানালা এখন বন্ধ, স্থানীয় বাসিন্দারা আতঙ্ক ও শোকে এখনও বিশ্বাসই করতে পারছেন না যে তাঁদের ঘরের পাশেই এমন একটি নজিরবিহীন বিপর্যয় ঘটে গেছে।
রবিবার সকালে ঘটনাস্থলে পৌঁছতেই দেখা গেল, চোরবাগান মণ্ডপের আশপাশের প্রায় কুড়ি মিটার এলাকা শক্ত ব্যারিকেডে ঘিরে রেখেছে পুলিশ। সরু গলি ধরে এগোতেই চোখে পড়ে রাস্তায় বিক্ষিপ্তভাবে পড়ে থাকা জুতো ও জিনিসপত্র, যা দেখেই আন্দাজ করা যায় সেই সময় ঠিক কতটা ভয়াবহ বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছিল। স্থানীয় এক বাসিন্দা শিউরে উঠে জানান, সারারাত দু’চোখের পাতা এক করতে পারেননি তাঁরা, চোখের সামনে কেবল সেই আর্তনাদ আর হুড়োহুড়ির ছবিটাই ভেসে উঠছে। প্রতিদিন যে পাড়া সকালের রোদ ও মানুষের কলকাকলিতে জেগে উঠত, আজকের সকালে সেই পাড়ার প্রতিটি জানালা যেন এক অজানা আতঙ্কে অবরুদ্ধ। অনেকেই বলছেন, প্রতি বছরই এখানে ভিড় হয়, কিন্তু সরু গলি ও সীমিত জায়গার মধ্যে এত মানুষের ঢল সামাল দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত পুলিশ বা স্বেচ্ছাসেবক ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিল না।
শনিবার সন্ধ্যার সেই অভিশপ্ত মুহূর্তের স্মৃতিচারণ করে এলাকাবাসী জানান, সেদিনও উপচে পড়া ভিড় ছিল সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ থেকে মণ্ডপমুখী রাস্তায়। এর মধ্যেই হঠাৎ অঝোরে বৃষ্টি নামায় লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা হাজার হাজার মানুষ একসঙ্গে হুড়মুড় করে মণ্ডপের ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করেন। মণ্ডপের ভেতর প্রবেশের পর একটি বৃত্তাকার বা 'এলিভেটেড করিডর' দিয়ে ৩৬০ ডিগ্রি ঘুরে বেরোনোর কথা থাকলেও, অতিরিক্ত ধাক্কাধাক্কিতে সেই পথেই মুহূর্তের মধ্যে বিপর্যয় নেমে আসে। স্থানীয়দের একাংশ পুলিশ ও প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ উগরে দিয়ে প্রশ্ন তুলছেন, এত সরু রাস্তা ও কম জায়গার পুজোয় পুলিশ এবং দমকলের অনুমতি কীভাবে মিলল? উল্লেখ্য, এই পুজোর আয়োজকদের সঙ্গে স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের নাম জড়িয়ে থাকায় নিরাপত্তা ও ভিড় ব্যবস্থাপনার গাফিলতি নিয়ে জোরদার বিতর্ক শুরু হয়েছে।

রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৮ অক্টোবর ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন