নয়াদিল্লি: গ্রেফতারির ফাঁদ এড়ানোর ফন্দি নাকি আইনি অজ্ঞতা? ইতিমধ্যেই পুলিশি জালে বন্দি থাকার পরও সুপ্রিম কোর্টে আগাম জামিনের দ্রুত শুনানির আর্জি জানিয়ে তীব্র আইনি জটিলতা ও ভর্ৎসনার মুখে পড়লেন রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেন। শুক্রবার সুপ্রিম কোর্টে বিচারপতি এই মামলার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন তোলেন এবং সাফ জানিয়ে দেন যে, একজন ব্যক্তি ইতিমধ্যেই গ্রেফতার হওয়ার পর তাঁর আগাম জামিনের আবেদনের কোনো আইনি প্রাসঙ্গিকতাই থাকে না। বিচারপতি এই মামলার কড়া সমালোচনা করার পাশাপাশি প্রাক্তন মন্ত্রীকে তদন্তে সম্পূর্ণ সহযোগিতার পরামর্শ দেন এবং প্রয়োজনে নিয়মিত জামিনের আর্জি জানানোর কথা বলেন। আদালতের এই কঠোর পর্যবেক্ষণের পরেই আর এক মুহূর্তও সময় নষ্ট না করে নিজের আইনজীবীর মাধ্যমে আগাম জামিনের মামলাটি আদালত থেকে প্রত্যাহার করে নেন ইন্দ্রনীল সেন।
উল্লেখ্য, ইউনেসকোর নাম ও লোগো জাল করে পুজোর পাস বিক্রির চাঞ্চল্যকর অভিযোগের তীর রয়েছে এই প্রাক্তন মন্ত্রীর বিরুদ্ধে। কিন্তু দুর্নীতির জাল যে কতদূর বিস্তৃত, তা গোয়েন্দাদের তদন্তে উঠে আসতেই চোখ কপালে ওঠার জোগাড় হয়েছে। তদন্তকারীদের সূত্রে জানা গিয়েছে, কেবল পুজোর পাস বিক্রিই নয়, বরং বইমেলা, গানমেলা, চলচ্চিত্র উৎসব এবং টুরিস্ট লজ সংস্কারের মতো একাধিক সরকারি প্রকল্পের মেগা টেন্ডার নিয়মবহির্ভূতভাবে নিজের ঘনিষ্ঠদের পাইয়ে দেওয়া হয়েছিল। এই দুর্নীতির বহর ৩০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে বলে অভিযোগ। মন্ত্রিত্বের প্রভাব খাটিয়ে নিজের এবং আত্মীয়দের বিভিন্ন সংস্থার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে কাটমানির বিরাট অংকের টাকা সরিয়েছেন তিনি। এই মামলায় ইতিমধ্যেই ধৃতকে জেরা করে তিন জনের গোপন জবানবন্দি নথিভুক্ত করেছে পুলিশ এবং ১২ দিনের হেফাজত চেয়ে আদালতে আবেদন করা হয়, যার ভিত্তিতে বিচারক প্রাক্তন মন্ত্রীকে আগামী ১০ নভেম্বর পর্যন্ত পুলিশ হেফাজতের নির্দেশ দিয়েছেন।
তদন্তে নেমে গোয়েন্দারা জানতে পেরেছেন, ইন্দ্রনীল সেনের ঘনিষ্ঠ বেশ কিছু ভুয়ো ও নামসর্বস্ব সংস্থা যেমন— মাস আর্ট সোসাইটি, গিডি ক্রিয়েশন, থার্ড আই ক্রিয়েশন এবং রূপকার—নিয়মিত মোটা অঙ্কের সরকারি টেন্ডার পেত। মেলা ও উৎসবের স্টল বা ইভেন্ট পরিচালনার কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও গিডি ক্রিয়েশন প্রায় ৫৩ কোটি এবং থার্ড আই ক্রিয়েশন ৫০ কোটি টাকার বেশি কাজ বাগিয়ে নিয়েছিল। এর মধ্যে শুধু গিডি থেকে সরাসরি ১ কোটি ২৮ লক্ষ টাকা ঢুকেছে স্বয়ং ইন্দ্রনীলের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে। পাশাপাশি, রূপকার সংস্থাও ৮ কোটির বেশি টাকার কাজ পায়। তদন্তকারীদের দাবি, ক্ষমতার অপব্যবহার করে অন্তত ২০টি আলাদা ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে এই কাটমানির টাকা ঘুরপথে ইন্দ্রনীল সেনের স্ত্রী ও মেয়ের অ্যাকাউন্টেও স্থানান্তরিত করা হয়েছে। আগামী দিনে এই বিশাল আর্থিক কেলেঙ্কারির শিকড় কত দূর গভীরে ছড়িয়ে রয়েছে, তা জানতে ম্যারাথন জেরা শুরু করেছেন গোয়েন্দারা।
Leave a comment