ঢাকা: একদিকে দিনে পর দিন বাড়ছে গণপিটুনিতে নৃশংস মৃত্যুর ঘটনা!
অন্যদিকে ন্যূনতম মাসিক বেতন ৩০ হাজার টাকায় উন্নীত করার দাবিতে রবিবার সকাল থেকে আগুনে পুড়ল ঢাকা ও গাজীপুরের রাজপথ। অক্টোবরের শুরুতেই অন্তত ১৫ জনের গণপিটুনিতে মর্মান্তিক মৃত্যুর খবর সামনে আসায় যেখানে গোটা বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলার অবনতি নিয়ে তীব্র শোরগোল শুরু হয়েছে, ঠিক সেই সময়েই ফুঁসে উঠলেন দেশের পোশাকশিল্পের লক্ষাধিক কর্মী।
বেতন বৃদ্ধির দাবিতে রবিবার সকাল থেকে শুরু হওয়া এই শ্রমিক অসন্তোষকে কেন্দ্র করে ঢাকা, মিরপুর, সাভার এবং গাজীপুর এলাকায় কার্যত রণক্ষেত্রের চেহারা নেয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় গাজীপুরে নামানো হয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)-এর বিশেষ বাহিনী।
চলতি বছরের অক্টোবর মাসে শুধু গণপিটুনির বলি হয়েছেন অন্তত ১৫ জন মানুষ, যা নিয়ে সম্প্রতি ‘দ্য ডেইলি স্টার’-এর মতো দেশের প্রথম সারির সংবাদমাধ্যম অত্যন্ত উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকায় সন্দেহবশত দুই পিকআপ ভ্যান চালক, জনি ও মোহাম্মদ নিশাতকে পিটিয়ে মারার ঘটনা হোক কিংবা শহিদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের চত্বরে মানসিক ভারসাম্যহীন এক যুবক আলম শেখকে চোর সন্দেহে খুনের ঘটনা।
দেশের আইনশৃঙ্খলার এই ভেঙে পড়া রূপটি প্রতিনিয়ত সামনে আসছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের সরকারি পরিসংখ্যান বলছে চলতি বছরের প্রথম ন’মাসে ৪০ জনের মৃত্যু হয়েছে। যদিও মানবাধিকার সংগঠন ‘আইন ও সালিশ কেন্দ্র’ (আসক)-এর রিপোর্ট অনুযায়ী সেই সংখ্যাটা ১৭০ জনেরও বেশি। সরকারের কড়া বার্তার পরেও যখন পিটিয়ে মারার বর্বরোচিত সংস্কৃতি থামছে না, ঠিক তখনই অর্থনৈতিক সংকটের চাপে রাস্তায় নেমে পড়েছেন সাধারণ শ্রমিকরা।
রবিবার সকাল থেকে ন্যূনতম মাসিক বেতন ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে রাজধানীর মিরপুর, সাভার ও গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ শুরু করেন তৈরি পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা। আন্দোলন এতটাই উগ্র রূপ নেয় যে মিরপুর ১১ নম্বর মেট্রো স্টেশনের ঠিক নীচেই একটি পুলিশের গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেন বিক্ষোভকারীরা।
রাস্তা অবরোধ করে চলা এই হিংসাত্মক বিক্ষোভের জেরে পুলিশ লাঠিচার্জ করলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ জলকামান, সাউন্ড গ্রেনেড এবং কাঁদুনে গ্যাসের শেল ফাটাতে বাধ্য হয়। কিন্তু পুলিশি ধাওয়া খেয়েও দমে না গিয়ে শ্রমিকেরা পুলিশকে লক্ষ্য করে লাগাতার ইট-পাটকেল ছুড়তে থাকেন। মেট্রো স্টেশনের গেটও সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ।
আরও পড়ুন: এভারেস্টের ট্রেকিং রুটের পরিচিত ঠিকানায় ভয়াবহ আগুন! মুহূর্তে ছড়াল লেলিহান শিখা
একই ছবি দেখা গিয়েছে গাজীপুর ও সাভারের শিল্পাঞ্চলগুলিতেও। গাজীপুরের কালিয়াকৈর চন্দ্রা পল্লীবিদ্যুৎ এলাকায় একটি পিকআপ ভ্যানে এবং একটি পোশাক কারখানার গুদামে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
ঢাকা-টাঙ্গাইল সংযোগকারী গুরুত্বপূর্ণ সড়কটি সম্পূর্ণ অবরোধ করে লাঠিসোঁটা হাতে রাস্তায় অবস্থান নেন শ্রমিকেরা। পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাওয়ায় সাভার ও গাজীপুরের অন্তত ৮০টি কারখানায় জরুরি ভিত্তিতে ছুটি ঘোষণা করতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। আইনশৃঙ্খলার অবনতি রুখতে এবং জনজীবন স্বাভাবিক করতে গাজীপুরে বিজিবি-র অন্তত পাঁচ প্ল্যাটুন বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড হল এই পোশাকশিল্প। প্রায় ৪ হাজার রেজিস্টার্ড কারখানায় কাজ করেন ৪০ লক্ষাধিক শ্রমিক। চিন ও ভারতের পরেই বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রফতানিকারক দেশ হিসেবে চলতি অর্থবর্ষে এই খাত থেকে বাংলাদেশ আয় করেছে প্রায় ৩৮৭০ কোটি ডলার। দেশের এই প্রধান বাণিজ্য ক্ষেত্রকে বাঁচাতে এবং শ্রমিক বিক্ষোভ প্রশমিত করতে অবশেষে নড়েচড়ে বসেছে তারেক রহমানের প্রশাসন।
রবিবার দুপুরে এক সাংবাদিক বৈঠকে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী শ্রমিকদের দাবি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনার আশ্বাস দিয়ে ছ’সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণা করেছেন।
একই সঙ্গে তিনি আন্দোলনরত শ্রমিকদের কাজে ফিরে যাওয়ার আবেদন জানিয়েছেন। তবে সরকারের এই আশ্বাসেও শ্রমিকদের ক্ষোভ পুরোপুরি শান্ত হয়নি, যার জেরে রবিবাসরীয় ঢাকা ও পার্শ্ববর্তী শিল্পাঞ্চলগুলিতে চরম অনিশ্চয়তা ও থমথমে পরিস্থিতি বজায় রয়েছে।
Leave a comment