নয়াদিল্লি: দিল্লির ঐতিহাসিক রামলীলা ময়দান রবিবার সাক্ষী হয়ে রইল এক অভূতপূর্ব রাজনৈতিক সংঘাতের। নির্বাচন কমিশনের তথাকথিত ‘ভোটচুরি’ এবং বিতর্কিত বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে বিরোধী ‘ইন্ডি’ (INDIA) জোটের আয়োজিত ‘চলো দিল্লি’ মেগা সমাবেশ থেকে মোদী-শাহ ও নির্বাচন কমিশনকে চাঁচাছোলা ভাষায় নিশানা করলেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী।
স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিলেন, দেশে গণতন্ত্র ও সংবিধান বাঁচাতে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারকে শুধু পদত্যাগই নয়, বরং ‘ভোটচুরি’র অপরাধে কাটগড়ায় দাঁড়িয়ে জেলেও যেতে হবে। এর পাশাপাশি অমিত শাহের বিখ্যাত ‘আঙ্গদের পা’ মন্তব্যকে পাল্টা কটাক্ষে চূর্ণ করেন সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদব। এসবের মধ্যেই দিল্লির রামলীলা ময়দান থেকে তাঁর নেত্রী সনিয়া গান্ধী বলেই ইঙ্গিত দিয়ে রাখলেন তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্য়ায়। সব মিলিয়ে রবিবাসরীয় দিল্লিতে বিরোধীদের যৌথ মঞ্চ থেকে ঝাঁঝালো আক্রমণের পথ বেছে নিল বিরোধী শিবির।
রবিবার বিকেলে রামলীলা ময়দানে জনসমুদ্রের উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখতে গিয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য করেন রাহুল গান্ধী। তিনি দাবি করেন, দেশের ১৩.৫ কোটি ভোটারের নাম বেআইনিভাবে তালিকা থেকে ছেঁটে ফেলে এবং ইভিএম কারচুপির মাধ্যমে যে ‘ভোটচুরি’ করা হয়েছে, তা আইনি পরিভাষায় ‘বিরল থেকে বিরলতম’ অপরাধ।
রাহুল গর্জে উঠে বলেন, “প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের জন্য সিইসি জ্ঞানেশ কুমার যা করেছেন, তা দেশদ্রোহিতা এবং দেশের প্রতিটি নাগরিকের মতপ্রকাশের অধিকারকে চুরি করার সমান।”
ভারতের সংস্থাসমূহকে আরএসএস এবং কেন্দ্রীয় সরকার নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে বলে অভিযোগ তুলে রাহুল সতর্কবার্তা দেন যে, সিইসি জ্ঞানেশ কুমার, মোদী এবং শাহকে এই অপকর্মের জন্য নিশ্চিতভাবে শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে। একই সঙ্গে নিজের পুরনো কথা স্মরণ করিয়ে তিনি ঘোষণা করেন, সাধারণ মানুষের ভালবাসায় বিশ্বাসী ‘মহব্বত কি দোকান’ আবারও দ্রুত দেশজুড়ে খুলতে চলেছে।
তবে ভার্চুয়াল জগত ও স্যোশাল মিডিয়ার উন্মাদনার বাইরে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ রাহুলের এই অতি-আক্রমণাত্মক রূপকে ‘সিংহাসনচ্যুত রাজপুত্রের হতাশা’ বলেই বর্ণনা করছেন। কারণ স্যোশাল মিডিয়ায় বিরোধীদের রিল ও ভিডিও যতটাই সাড়া ফেলুক না কেন, বাস্তব চিত্রটা অনেকটাই আলাদা। সম্প্রতি ৪টি রাজ্যের ২৮টি এমএলসি আসনের নির্বাচনে কংগ্রেস কেবল একটি আসনেই জয়লাভ করেছে।
আরও পড়ুন: তাঁকে চক্রান্ত করে হারানো হয়েছে! রামলীলায় আর কী বললেন মমতা?
তা ছাড়াও বিহার নির্বাচন বা ২০২৬-এর বঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে ‘এসআইআর’ নিয়ে রাহুলের সরব হওয়া সত্ত্বেও সাধারণ মানুষ বড় সংখ্যায় এনডিএ-র পক্ষেই ভোট দিয়েছে। এমনকি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, আখিলেশ যাদব, মেহবুবা মুফতি, ফারুক আবদুল্লার মতো যেসব শীর্ষ নেতৃত্ব রাহুলের খোলা বাসের পিছনে বসেছিলেন, তাঁরা প্রত্যেকেই সাম্প্রতিক নির্বাচনে নিজ নিজ রাজ্যে চরম রাজনৈতিক ধাক্কা খেয়েছেন।
সমাবেশে উপস্থিত হয়ে অমিত শাহকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেন সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদব। সম্প্রতি উত্তরপ্রদেশ বিধান পরিষদ নির্বাচনে বারাণসী সহ ৫টি আসনে এনডিএ-র পরাজয়কে হাতিয়ার করে অখিলেশ বলেন, “যাঁরা বলতেন উত্তরপ্রদেশে তাঁদের সরকার ‘আঙ্গদের পায়ের’ মতো অটল, তাঁরা এখন জেনে রাখুন যে আপনাদের পায়ের তলা থেকেই মাটি সরে গিয়েছে! মাটিই যদি না থাকে, তবে আর আঙ্গদের পা রাখবেন কোথায়?”
২০২৭-এর উত্তরপ্রদেশ নির্বাচনে বিজেপিকে ধূলিসাৎ করার হুঙ্কার দিয়ে অখিলেশ বলেন যে রামলীলা ময়দান আজ ‘গণতন্ত্রের অলিন্দে এক নতুন বিপ্লবের বার্তা’ দিচ্ছে। রামমন্দিরের অনুদান চুরির অভিযোগ তুলে তিনি বিজেপি ও নির্বাচন কমিশনের গোপন আঁতাতকে ফের প্রকাশ্যে এনেছেন।
এদিকে, এই গোটা কর্মসূচির মধ্যে সবচেয়ে চর্চিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অবস্থান ও রাজনৈতিক ভোলবদল। ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে বাংলায় তৃণমূলের নজিরবিহীন বিপর্যয়ের পর জাতীয় রাজনীতিতে টিকে থাকতে মমতা এখন পুরোপুরি কংগ্রেসের শরণাপন্ন বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
আরও পড়ুন: ড্রাইভার সিটে রাহুল! তিন নম্বর সিটে মমতা। রামলীলার আগে কি স্পষ্ট জোট সমীকরণ?
রামলীলা ময়দানের মঞ্চে বক্তব্য রাখতে উঠে প্রথা ভেঙে সনিয়া গান্ধীকে ‘আমার নেত্রী’ বলে সম্বোধন করেন মমতা। একই সঙ্গে কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গেকে নিজের ‘নেতা’ এবং রাহুল গান্ধীকে ‘ইয়ং লিডার’ বলে ভূয়সী প্রশংসা করেন তিনি।
মঞ্চ থেকে বামেদেরও সাধুবাদ জানান মমতা। হুডখোলা গাড়ির পিছনের সারিতে বসা থেকে শুরু করে সনিয়া-রাহুলের প্রকাশ্যে প্রশংসা, সমস্ত ঘটনাপ্রবাহই স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, বাংলায় ক্ষমতা হারানোর পর কেন্দ্রে প্রাসঙ্গিক থাকতে কংগ্রেসের ‘হাত’ ধরা ছাড়া মমতার সামনে আর অন্য কোনও রাস্তা খোলা নেই।
Leave a comment