কলকাতা: অতীতের রক্তাক্ত জমি আন্দোলনের ক্ষত পেরিয়ে অবশেষে সিঙ্গুরে নতুন শিল্পায়নের রূপরেখা ঘোষণা করল রাজ্য সরকার। নিউটাউনে রাজ্যের নয়া শিল্পনীতি উদ্বোধনের মঞ্চ থেকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, জোর করে নয়, বরং জমিদাতাদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা ও বাজারদরের চেয়েও বেশি মূল্য দিয়ে সিঙ্গুরে শিল্প আনা হবে।
এমনকি বাণিজ্যিক গাড়ি প্রস্তুতকারী নামী সংস্থা ‘অশোক লেল্যান্ড’-এর সঙ্গে প্রাথমিক কথাবার্তাও শুরু হয়ে গিয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি। বাম আমলের জবরদস্তি বা পরবর্তী রাজনৈতিক স্থবিরতা কাটিয়ে সিঙ্গুরের মাটিতে ফের নতুন কর্মসংস্থানের আশায় বুক বাঁধছে রাজ্যবাসী।
আরও পড়ুন: রেয়াত নয় তোলাবাজি, ইপিএফে বিরাট ছাড়! বাংলায় শুরু নতুন শিল্পযুগ
রক্তাক্ত ইতিহাস ভুলে আলোচনার পথেই জমি নীতি
২০০৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পর তৎকালীন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য সরকার টাটা গোষ্ঠীর ‘ন্যানো’ প্রকল্পের জন্য সিঙ্গুরে যে জমি অধিগ্রহণ করেছিল, তা ঘিরে রাজ্য রাজনীতিতে তৈরি হয়েছিল ঐতিহাসিক ঝড়।
পুলিশের গুলি, জমি কেড়ে নেওয়ার অভিযোগ এবং পরবর্তীতে দীর্ঘ আন্দোলনের জেরে টাটা গোষ্ঠী রাজ্য ছাড়তে বাধ্য হয়। ২০১১ সালে পালাবদলের পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার সেই জমিতে কৃষকদের চাষের বীজ ফিরিয়ে দিলেও শিল্প আর আলোর মুখ দেখেনি।
এদিন সেই প্রসঙ্গ টেনে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সাফ জানিয়ে দেন, সিঙ্গুর বা নন্দীগ্রামের মতো জবরদস্তি বা রক্তের ইতিহাস এবার আর পুনরাবৃত্তি হবে না। ২০১৩ সালের জাতীয় জমি অধিগ্রহণ নীতি মেনেই সরকার এগোবে।
মহারাষ্ট্র, উত্তরপ্রদেশ ও গুজরাটের জমি নীতি খতিয়ে দেখে রাজ্যে এক নতুন মডেল তৈরি করা হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য, কৃষকদের উচ্ছেদ করা নয়, বরং সরাসরি তাঁদের সঙ্গে আলোচনা করে ইচ্ছুক জমিদাতাদের থেকে বাজারদরের চেয়েও বেশি দামে জমি কিনে একটি শক্তিশালী ‘ল্যান্ড ব্যাঙ্ক’ তৈরি করা। ইতিমধ্যেই নাবার্ড এবং আইডিবিআই ব্যাঙ্কের সঙ্গে এই বিষয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
অশোক লেল্যান্ডের সঙ্গে প্রাথমিক কথা, মোদীর মন্ত্রে জোর শিল্পে
রাজ্যের বেকারত্ব ও পরিযায়ী শ্রমিকদের সমস্যার স্থায়ী সমাধানের ওপর জোর দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী জানান, অতীতে বিশ্ববঙ্গ বাণিজ্য সম্মেলনের নামে কোটি কোটি টাকা উড়লেও কাজের কাজ কিছু হয়নি। বর্তমান সরকার লোকদেখানো মৌ (MoU) স্বাক্ষরে বিশ্বাসী নয়।
টাটকা শিল্পের বার্তা দিয়ে তিনি জানান, বাণিজ্যিক গাড়ি তৈরির বিশ্বখ্যাত সংস্থা অশোক লেল্যান্ডের সঙ্গে সিঙ্গুরে কারখানা গড়া নিয়ে ইতিমধ্যেই প্রাথমিক কথাবার্তা এগিয়েছে। আগের সরকারের আমলে চিত্তরঞ্জন ও হলদিয়া শিল্পাঞ্চল যে ভাবে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল, বর্তমান সরকার ডবল ইঞ্জিন সরকারের সহযোগিতায় এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ‘কথা কম, কাজ বেশি’ মন্ত্রে সেই খরা কাটাতে বদ্ধপরিকর।

এদিনের নতুন শিল্পনীতিতে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত স্ট্যাম্প ডিউটি ছাড়, মহিলাদের কর্মসংস্থানে বিশেষ সুবিধা, সবুজ শক্তিতে জোর এবং রুগ্ন ও বন্ধ শিল্প পুনরুদ্ধারের একাধিক প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে। রাজ্যে সিন্ডিকেট রাজ বা তোলাবাজির দিন শেষ বলে হুঙ্কার দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন, পাহাড় থেকে সাগর, বাংলার প্রতিটি জেলাকে উন্নয়নের মানচিত্রে তুলে ধরতে শিল্পপতিদের সবরকম নিরাপত্তা ও সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত রাজ্য প্রশাসন। এখন দেখার, রাজনৈতিক তরজা কাটিয়ে সিঙ্গুরের জমিতে শেষ পর্যন্ত এই শিল্পায়নের স্বপ্ন কতটা বাস্তবায়িত হয়।
Leave a comment