কলকাতা: রাজ্যভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থায় পঠনপাঠনের মান ফেরাতে নবান্নের নয়া ‘শর্ত’ ঘিরে তোলপাড় রাজ্য রাজনীতি। স্কুল সার্ভিস কমিশনের (এসএসসি) মাধ্যমে আগামী দিনে যে সমস্ত শিক্ষক-শিক্ষিকা নিয়োগ হবেন, তাঁদের জন্য ভোট-রাজনীতিতে অংশ নেওয়া নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
বুধবার রাজ্য মন্ত্রিসভার (ক্যাবিনেট) বৈঠকে এই প্রস্তাব অনুমোদন পাওয়ার পরেই আড়াআড়ি বিভক্ত রাজনৈতিক মহল। সরকারের এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে কড়া সুর চড়িয়ে আইনি লড়াইয়ের হুঁশিয়ারি দিয়েছে সিপিআই(এম)। অনতিবিলম্বে সিদ্ধান্তের আইনি চিঠি প্রকাশ পেলেই তারা কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হবে বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে আলিমুদ্দিন।
বুধবার নবান্নে ক্যাবিনেট বৈঠকের সিদ্ধান্ত জানাতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এক ঐতিহাসিক ঘোষণা করেন। তিনি জানান, এসএসসি-র মাধ্যমে সরকারি, সরকার-পোষিত বা সাহায্যপ্রাপ্ত স্কুলে নতুন নিয়মে যাঁরা চাকরি পাবেন, তাঁরা আর পঞ্চায়েত, পুরসভা, এমনকি বিধানসভা বা লোকসভা নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না।
মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট করে দেন, শিক্ষা ক্ষেত্রকে সম্পূর্ণভাবে রাজনীতিমুক্ত করতেই এই পদক্ষেপ। তবে ইতিপূর্বে যাঁরা পদে রয়েছেন এবং জনপ্রতিনিধিত্ব করছেন, তাঁদের ওপর এই নিয়ম প্রযোজ্য হবে না। একই সঙ্গে এই দিন ক্যাবিনেটে পূর্বের ৪৫ হাজারের পর আরও প্রায় ১২০০ পদে নতুন নিয়োগে অনুমোদন এবং আগামী ৫ নভেম্বর রাজ্যের বহুল প্রতীক্ষিত ‘নতুন শিল্পনীতি’ প্রকাশের কথাও জানান মুখ্যমন্ত্রী।
তবে শুভেন্দু অধিকারীর এই নির্বাচনী ‘বারণ’ সামনে আসতেই তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে সিপিআই(এম)। দলের বর্ষীয়ান নেতা, প্রাক্তন রাজ্যসভার সাংসদ তথা প্রবীণ আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য নবান্নের এই পদক্ষেপকে সম্পূর্ণ ‘অসংবিধানিক’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।
প্রাক্তন এই মেয়র স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ‘‘সাধারণ মানুষের এবং নাগরিকদের গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নেওয়া বা দমিয়ে রাখা এত সহজ নয়। শিক্ষকতার মতো পেশায় যুক্ত হওয়া মানেই তাঁর ভোটাধিকার বা লড়াই করার আইনি অধিকার খর্ব হতে পারে না। এই সিদ্ধান্ত অফিশিয়ালি কার্যকর হলেই আমি এটাকে কলকাতা হাইকোর্টে চ্যালেঞ্জ করব। আইনি পথে সমস্ত রকম লড়াই করা হবে।’’
কেবল রাজনৈতিক দলের নেতারাই নন, সরকারের এই ঘোষণায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন খোদ রাজ্যের শিক্ষকদের একাংশও। এক উচ্চমাধ্যমিক স্কুলের প্রধান শিক্ষকের বক্তব্য, ‘‘শিক্ষা ক্ষেত্রকে যদি রাজনীতিমুক্ত করতে হত, তবে সমস্ত শিক্ষা সংক্রান্ত কমিটি থেকে রাজনৈতিক স্বজনপোষণ ও ব্যক্তিদের সরানো উচিত ছিল। রাজ্য শিক্ষা আইনে এখনও পর্যন্ত শিক্ষকদের রাজনীতিতে যুক্ত থাকার ওপর কোনও বিধিনিষেধ নেই। মূল আইন না বদলে স্রেফ নিয়োগবিধি বদলে নির্বাচন করার অধিকার কেড়ে নিলে আদালতে তা কতটা টিকবে, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে।’’
শিক্ষা সংস্কার এবং নতুন নিয়োগের প্যাকেজের পাশাপাশি শিল্পনীতির ঢাকঢোল পেটাতে চাইছে নবান্ন। তবে বামেদের এই আইনি চ্যালেঞ্জের হুঁশিয়ারিতে স্পষ্ট, নতুন শিক্ষানীতি চালুর শুরুতেই রাজ্য সরকারকে বেশ বড়সড় আইনি লড়াইয়ের মুখোমুখি হতে হবে। আদালত নবান্নের এই সিদ্ধান্তে সিলমোহর দেয় নাকি শিক্ষকদের গণতান্ত্রিক অধিকার সুরক্ষায় স্থগিতাদেশ বজায় রাখে, এখন সে দিকেই তাকিয়ে গোটা রাজ্য।
Leave a comment