কলকাতা: মাধ্যমিক পরীক্ষার ফলপ্রকাশের দীর্ঘসূত্রিতা কাটাতে এবং নির্দিষ্ট সময়ের আগেই একাদশ শ্রেণির পাঠদান শুরু করতে খাতা মূল্যায়ন পদ্ধতিতে ঐতিহাসিক বদলের পথে হাঁটছে পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ।
খাতা দেখার প্রক্রিয়াকে আরও দ্রুত, ত্রুটিমুক্ত ও সম্পূর্ণ স্বচ্ছ করে তুলতে এবার প্রবীণ শিক্ষকদের একচ্ছত্র আধিপত্য ভেঙে নবীন ও তরুণ শিক্ষকদের ওপর মূল্যায়নের বড় দায়িত্ব সঁপে দেওয়ার রূপরেখা তৈরি হয়েছে।
পর্ষদ সূত্রে খবর, গতি বাড়াতে গিয়ে শিক্ষার মানে যাতে বিন্দুমাত্র আঁচ না লাগে, তার জন্য এক জন পরীক্ষককে আগের তুলনায় অনেক বেশি সংখ্যক উত্তরপত্র মূল্যায়ন করতে হবে এবং নতুন শিক্ষকদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণেরও ব্যবস্থা করা হবে। একই সঙ্গে খাতা মূল্যায়নে সামান্য গাফিলতি বরদাস্ত না করে রিভিউয়ের নিয়মে আনা হচ্ছে নজিরবিহীন কড়াকড়ি।
মাধ্যমিক পরীক্ষার ফলপ্রকাশের প্রক্রিয়াকে উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনার লক্ষ্যেই মূলত এই সংস্কার। পর্ষদ সূত্রে জানা যাচ্ছে, প্রতি বছর খাতা দেখার ধীরগতির কারণে ফলপ্রকাশে দীর্ঘ সময় লেগে যায়, যার ফলে একাদশ শ্রেণির ক্লাস শুরু হতেও দেরি হয়।
আরও পড়ুন: রবিবার কলকাতা মেট্রোয় আংশিক পরিষেবা, কোন স্টেশন থেকে কোথায় চলবে ট্রেন?
এই চক্রব্যূহ থেকে বেরিয়ে আসতেই রাজ্য প্রশাসন ও পর্ষদের যৌথ উদ্যোগে এই নতুন ভাবনা। প্রবীণ শিক্ষকদের একাংশের দীর্ঘসূত্রিতার অভ্যাস এড়াতে এবার অপেক্ষাকৃত তরুণ ও নবীন শিক্ষকদের দিয়ে খাতা মূল্যায়ন করানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
এর ফলে স্বাভাবিকভাবেই একেকজন পরীক্ষককে আগের চেয়ে অনেক বেশি খাতা দেখতে হবে। তবে দ্রুততার এই প্রতিযোগিতায় মূল্যায়নের গুণগত মান বজায় রাখতে বিন্দুমাত্র আপস করতে নারাজ পর্ষদ কর্তৃপক্ষ। খাতা দেখার নির্ভুল কৌশল শেখাতে নবীন শিক্ষকদের জন্য বিশেষ কর্মশালা বা প্রশিক্ষণের বন্দোবস্ত করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও নির্ভুলতা নিশ্চিত করতে খাতা পুনর্মূল্যায়ন বা ‘রিভিউ’ (Review)-এর নিয়মে আনা হচ্ছে মারাত্মক কড়াকড়ি। পর্ষদ সূত্রে খবর, সাম্প্রতিক অতীতে দেখা গিয়েছে অনেক সময় খাতা রি-চেকিংয়ের সময় নম্বরের আকাশ-পাতাল তফাত ধরা পড়ে।
এই ধরনের দায়িত্বজ্ঞানহীনতা বা গাফিলতি কঠোর হাতে দমন করতে পর্ষদ নতুন নীতি গ্রহণ করেছে। নিয়ম অনুযায়ী, কোনো পরীক্ষার্থীর খাতা রিভিউ করার পর যদি মূল নম্বরের সঙ্গে ১০ বা তার বেশি নম্বর বাড়ে, তবে তা অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখা হবে।
সেক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পরীক্ষক এবং প্রধান পরীক্ষক (Head Examiner)-কে তলব করে তল্লাবস্থা ও তার সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা চাওয়া হবে। প্রয়োজনে ওই পরীক্ষকদের বিরুদ্ধে শোকজ বা সতর্কতামূলক কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও নেওয়া হতে পারে।
পর্ষদের এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানিয়েছে শিক্ষামহলের একটি বড় অংশ। তবে একই সঙ্গে শিক্ষক সংগঠনের প্রতিনিধিরা তীব্র সতর্কতাও প্রকাশ করেছেন। তাঁদের মতে, অতিরিক্ত খাতা দেখার চাপে শিক্ষকদের ওপর চরম মানসিক চাপ ও অবসাদ তৈরি হতে পারে, যা পরোক্ষভাবে মূল্যায়নের মানকে প্রভাবিত করতে পারে। এই আশঙ্কার জবাবে পর্ষদ সভাপতি রামানুজ গঙ্গোপাধ্যায় স্পষ্ট জানিয়েছেন, পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকদের প্রতি পর্ষদের সর্বাঙ্গীন দায়বদ্ধতা রয়েছে। ছাত্রছাত্রীদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতে এবং স্বচ্ছ ও নির্ভুলভাবে দ্রুত ফল প্রকাশ করতেই পর্ষদ এই কঠিন অথচ সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়েছে।
সব মিলিয়ে, আগামী মাধ্যমিক শিক্ষাবর্ষ থেকেই খাতা দেখা থেকে শুরু করে ফলপ্রকাশের পুরো সিস্টেমটিতে এক বিরাট ধাক্কা বা পরিবর্তন আসতে চলেছে। প্রবীণ-নবীন সমীকরণ এবং কড়া শাস্তির খাঁড়ার তলায় দাঁড়িয়ে রাজ্যের লাখ লাখ পরীক্ষার্থীর খাতা মূল্যায়ন কতটা ত্রুটিমুক্ত হয়, এখন সেটাই দেখার।
Leave a comment