Hidden Stories (বাংলা)
সর্বশেষ

দরজা খুললেই গিলতে আসছে আগুন,তারাপীঠের ‘জতুগৃহ’ হোটেলে মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ড, ভস্মীভূত ৬ প্রাণ

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৭ আগস্ট ২০২৬
দরজা খুললেই গিলতে আসছে আগুন,তারাপীঠের ‘জতুগৃহ’ হোটেলে মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ড, ভস্মীভূত ৬ প্রাণ
তারাপীঠ থানার সামনে এই হোটেলেই ভোরে আগুন লেগেছে।ছবি-সংগৃহীত

তারাপীঠ: শ্রাবণ মাসের শেষ সোমবারে মা তারার দর্শনে এসে পুণ্যার্থীদের এমন ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হবে, তা কেউ দুঃস্বপ্নেও ভাবেননি। ভোর তখন সাড়ে চারটে। চারদিক তখনও হালকা অন্ধকারে ঢাকা। বীরভূমের তারাপীঠ মন্দির থেকে ঢিলছোড়া দূরত্বে ‘বিদেশিনী’ হোটেলের একতলার ঘরগুলিতে অঘোরে ঘুমোচ্ছিলেন পুণ্যার্থীরা। উত্তর ২৪ পরগনা, আলিপুরদুয়ার কিংবা কোচবিহারের মতো রাজ্যের দূর-দূরান্তের জেলা থেকে পুজো দিতে এসেছিলেন তাঁরা। আচমকাই বিকট বিস্ফোরণ ও প্রাণপণ চিৎকারে ভাঙল ঘুম। বাইরে কী হয়েছে দেখতে ঘরের দরজা খুলতেই ছিটকে এল আগুনের লেলিহান শিখা। যেন মুহূর্তেই সবাইকে গিলে খেতে চায় সেই ভয়াল আগুন!

বাইরের সেই ভয়ঙ্কর দৃশ্য দেখে আতঙ্কিত আবাসিকেরা দ্রুত দরজা বন্ধ করে দেন। কিন্তু বিপদের সেখানেই শেষ নয়; কারণ ঘরের ভেতরে ছিল না কোনও জানলা। বৃদ্ধ ও শিশুদের নিয়ে এক-একটি মিনিট যেন এক-একটি বছরের মতো কাটছিল তাঁদের। বন্ধ ঘরে ধোঁয়া জমতে শুরু করায় অগত্যা ফোন যেতে থাকে দমকল ও পুলিশে। অনেকেই আর বদ্ধ ঘরে না থাকতে পেরে বাধ্য হয়ে বেরোনোর চেষ্টা করেন। কিন্তু বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় চারদিক তখন ঘুটঘুট অন্ধকার। হোটেলে পিছন দিকে বেরোনোর একটি নিরাপদ রাস্তা থাকলেও, জরুরি পরিস্থিতিতে দিক-নির্দেশক আলো না থাকায় বাইরের পুণ্যার্থীদের পক্ষে তা খুঁজে পাওয়া সম্ভব হয়নি। প্রাণ হাতে নিয়ে বাধ্য হয়ে সকলে সামনের রিসেপশন দিয়েই বেরোনোর মরিয়া চেষ্টা চালান। কিন্তু বিপত্তি ঘটে সেখানেই—কারণ রিসেপশনের দিকেই আগুনের দাপট ছিল সবথেকে বেশি। নিমেষের মধ্যে সেই আগুনে ঝলসে যান অনেকে, আবার পাঁচতলা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়া বিষাক্ত ধোঁয়ায় দম বন্ধ হয়ে সংজ্ঞা হারান বহু আবাসিক।

ঘটনার খবর পেয়েই তারাপীঠ ও রামপুরহাট থানার পুলিশ এবং দমকল বাহিনী পৌঁছায় ঘটনাস্থলে। অঝোর বৃষ্টির মাঝেই শুরু হয় যুদ্ধকালীন তৎপরতায় উদ্ধারকাজ। আগুনে ঝলসে ও ধোঁয়ায় শ্বাসরুদ্ধ হয়ে অন্তত ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। এ ছাড়া আশঙ্কাজনক অবস্থায় অন্তত ১২ থেকে ১৩ জন রামপুরহাট মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। হোটেলের মালিক কল্যাণ পাল জানিয়েছেন, ভোরের দিকে হঠাৎই মেন ইলেকট্রিক এনসিবি ফেটে গিয়ে আগুন ধরে যায়। রাতপাহারায় থাকা কর্মীরা অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র দিয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা করলেও ফাইবারের অন্দরসজ্জা থাকায় তা বিদ্যুৎ গতিতে ছড়িয়ে পড়ে।

অন্যদিকে, কোচবিহারের দিনহাটার বাসিন্দা দেবাদৃতা দত্তর মতো ভাগ্যবশত বেঁচে যাওয়া আবাসিকদের গলায় ফুটে উঠেছে সেই রাতের বীভৎসতা। দোতলার বারান্দার পাইপ বেয়ে কোনও রকমে নিচে নেমে প্রাণ বাঁচান তাঁরা। দমকলের ওসি নীলাদ্রি মজুমদার জানান, ভবনটিতে জানলা সব বন্ধ থাকায় ধোঁয়া বাইরে বেরোতে পারেনি, যার ফলে এত বেশি মানুষ সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়েন। বীরভূমের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নীলেশ শ্রীকান্ত গায়কোয়াড় জানান, আহতদের হাসপাতালে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এই মর্মান্তিক ঘটনার পর হোটেলের অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ও পরিকাঠামো নিয়ে তীব্র ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন স্থানীয় বিজেপি বিধায়ক ধ্রুব সাহা। শ্রাবণের পুণ্যলগ্নে তারাপীঠের এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা গোটা রাজ্যজুড়ে গভীর শোক ও আতঙ্কের ছায়া ফেলেছে।

হিডেন স্টোরিজ নিউজ

বিষয় : WBNews TarapithFire HotelFire TarapithTragedy Rampurhat

আপনার মতামত লিখুন

Hidden Stories (বাংলা)

সোমবার, ১৭ আগস্ট ২০২৬


দরজা খুললেই গিলতে আসছে আগুন,তারাপীঠের ‘জতুগৃহ’ হোটেলে মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ড, ভস্মীভূত ৬ প্রাণ

প্রকাশের তারিখ : ১৭ আগস্ট ২০২৬

featured Image
তারাপীঠ: শ্রাবণ মাসের শেষ সোমবারে মা তারার দর্শনে এসে পুণ্যার্থীদের এমন ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হবে, তা কেউ দুঃস্বপ্নেও ভাবেননি। ভোর তখন সাড়ে চারটে। চারদিক তখনও হালকা অন্ধকারে ঢাকা। বীরভূমের তারাপীঠ মন্দির থেকে ঢিলছোড়া দূরত্বে ‘বিদেশিনী’ হোটেলের একতলার ঘরগুলিতে অঘোরে ঘুমোচ্ছিলেন পুণ্যার্থীরা। উত্তর ২৪ পরগনা, আলিপুরদুয়ার কিংবা কোচবিহারের মতো রাজ্যের দূর-দূরান্তের জেলা থেকে পুজো দিতে এসেছিলেন তাঁরা। আচমকাই বিকট বিস্ফোরণ ও প্রাণপণ চিৎকারে ভাঙল ঘুম। বাইরে কী হয়েছে দেখতে ঘরের দরজা খুলতেই ছিটকে এল আগুনের লেলিহান শিখা। যেন মুহূর্তেই সবাইকে গিলে খেতে চায় সেই ভয়াল আগুন!বাইরের সেই ভয়ঙ্কর দৃশ্য দেখে আতঙ্কিত আবাসিকেরা দ্রুত দরজা বন্ধ করে দেন। কিন্তু বিপদের সেখানেই শেষ নয়; কারণ ঘরের ভেতরে ছিল না কোনও জানলা। বৃদ্ধ ও শিশুদের নিয়ে এক-একটি মিনিট যেন এক-একটি বছরের মতো কাটছিল তাঁদের। বন্ধ ঘরে ধোঁয়া জমতে শুরু করায় অগত্যা ফোন যেতে থাকে দমকল ও পুলিশে। অনেকেই আর বদ্ধ ঘরে না থাকতে পেরে বাধ্য হয়ে বেরোনোর চেষ্টা করেন। কিন্তু বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় চারদিক তখন ঘুটঘুট অন্ধকার। হোটেলে পিছন দিকে বেরোনোর একটি নিরাপদ রাস্তা থাকলেও, জরুরি পরিস্থিতিতে দিক-নির্দেশক আলো না থাকায় বাইরের পুণ্যার্থীদের পক্ষে তা খুঁজে পাওয়া সম্ভব হয়নি। প্রাণ হাতে নিয়ে বাধ্য হয়ে সকলে সামনের রিসেপশন দিয়েই বেরোনোর মরিয়া চেষ্টা চালান। কিন্তু বিপত্তি ঘটে সেখানেই—কারণ রিসেপশনের দিকেই আগুনের দাপট ছিল সবথেকে বেশি। নিমেষের মধ্যে সেই আগুনে ঝলসে যান অনেকে, আবার পাঁচতলা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়া বিষাক্ত ধোঁয়ায় দম বন্ধ হয়ে সংজ্ঞা হারান বহু আবাসিক।ঘটনার খবর পেয়েই তারাপীঠ ও রামপুরহাট থানার পুলিশ এবং দমকল বাহিনী পৌঁছায় ঘটনাস্থলে। অঝোর বৃষ্টির মাঝেই শুরু হয় যুদ্ধকালীন তৎপরতায় উদ্ধারকাজ। আগুনে ঝলসে ও ধোঁয়ায় শ্বাসরুদ্ধ হয়ে অন্তত ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। এ ছাড়া আশঙ্কাজনক অবস্থায় অন্তত ১২ থেকে ১৩ জন রামপুরহাট মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। হোটেলের মালিক কল্যাণ পাল জানিয়েছেন, ভোরের দিকে হঠাৎই মেন ইলেকট্রিক এনসিবি ফেটে গিয়ে আগুন ধরে যায়। রাতপাহারায় থাকা কর্মীরা অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র দিয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা করলেও ফাইবারের অন্দরসজ্জা থাকায় তা বিদ্যুৎ গতিতে ছড়িয়ে পড়ে।অন্যদিকে, কোচবিহারের দিনহাটার বাসিন্দা দেবাদৃতা দত্তর মতো ভাগ্যবশত বেঁচে যাওয়া আবাসিকদের গলায় ফুটে উঠেছে সেই রাতের বীভৎসতা। দোতলার বারান্দার পাইপ বেয়ে কোনও রকমে নিচে নেমে প্রাণ বাঁচান তাঁরা। দমকলের ওসি নীলাদ্রি মজুমদার জানান, ভবনটিতে জানলা সব বন্ধ থাকায় ধোঁয়া বাইরে বেরোতে পারেনি, যার ফলে এত বেশি মানুষ সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়েন। বীরভূমের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নীলেশ শ্রীকান্ত গায়কোয়াড় জানান, আহতদের হাসপাতালে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এই মর্মান্তিক ঘটনার পর হোটেলের অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ও পরিকাঠামো নিয়ে তীব্র ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন স্থানীয় বিজেপি বিধায়ক ধ্রুব সাহা। শ্রাবণের পুণ্যলগ্নে তারাপীঠের এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা গোটা রাজ্যজুড়ে গভীর শোক ও আতঙ্কের ছায়া ফেলেছে।হিডেন স্টোরিজ নিউজ

Hidden Stories (বাংলা)


কপিরাইট © ২০২৬ Hidden Stories (বাংলা) । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত