ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের ইতিহাসে এমন কিছু নাম আছে, যাদের কথা উঠলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে জাদুকরী ড্রিবল, অসাধারণ গোল আর দর্শকদের উন্মাদনা। সেই তালিকার অন্যতম নাম নেইমার জুনিয়র। প্রায় দেড় দশকের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের পর ২০২৬ বিশ্বকাপে নরওয়ের কাছে ব্রাজিলের বিদায়ের সঙ্গে জাতীয় দলের জার্সিকেও বিদায় জানালেন তিনি। কান্নাভেজা কণ্ঠে জানিয়ে দিলেন, ব্রাজিলের হয়ে তাঁর পথচলা এখানেই শেষ।
নেইমারের জন্ম ১৯৯২ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি, ব্রাজিলের সাও পাওলো অঙ্গরাজ্যের মোগি দাস ক্রুজেস শহরে। ছোটবেলা থেকেই ফুটবলের প্রতি ছিল অসাধারণ ঝোঁক। বাবা নেইমার সান্তোস সিনিয়র ছিলেন তাঁর প্রথম কোচ ও পথপ্রদর্শক। মাত্র ১১ বছর বয়সে যোগ দেন ব্রাজিলের ঐতিহ্যবাহী ক্লাব সান্তোসের যুব একাডেমিতে।
২০০৯ সালে মাত্র ১৭ বছর বয়সে সান্তোসের মূল দলে অভিষেক হয় তাঁর। খুব অল্প সময়েই নিজের দুর্দান্ত গতি, ড্রিবলিং ও গোল করার ক্ষমতায় পুরো ব্রাজিলকে মুগ্ধ করেন। ২০১১ সালে কোপা লিবার্তাদোরেস জিতে সান্তোসকে প্রায় অর্ধশতাব্দী পর দক্ষিণ আমেরিকার শ্রেষ্ঠত্ব এনে দেন। সেই বছরই তিনি জেতেন বিশ্বসেরা গোলের জন্য পুসকাস পুরস্কার।
২০১৩ সালে ইউরোপের অন্যতম সেরা ক্লাব বার্সেলোনায় যোগ দেন নেইমার। সেখানে লিওনেল মেসি ও লুইস সুয়ারেজ-এর সঙ্গে গড়ে ওঠে বিখ্যাত MSN ত্রয়ী। ২০১৪-১৫ মৌসুমে বার্সেলোনা জিতে নেয় ট্রেবল—লা লিগা, কোপা দেল রে এবং উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ। সেই সময় বিশ্বের অন্যতম ভয়ংকর ফরোয়ার্ড হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন নেইমার।
২০১৭ সালে ইতিহাসের সবচেয়ে দামী ফুটবলার হিসেবে প্রায় ২২২ মিলিয়ন ইউরো ট্রান্সফার ফিতে ফরাসি ক্লাব প্যারিস সেন্ট জার্মেইনে (পিএসজি) যোগ দেন। একের পর এক লিগ শিরোপা জিতলেও চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়ের স্বপ্ন পূরণ হয়নি। পরবর্তীতে সৌদি আরবের আল-হিলালে যোগ দিলেও চোট তাঁর ক্যারিয়ারের বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এরপর শৈশবের ক্লাব সান্তোসে ফিরে আবারও মাঠে নামেন।
আন্তর্জাতিক ফুটবলে নেইমারের অভিষেক হয় ২০১০ সালে। দ্রুতই ব্রাজিলের আক্রমণের প্রাণভোমরা হয়ে ওঠেন তিনি। ২০১৩ সালের কনফেডারেশনস কাপ জিতে ব্রাজিলকে শিরোপা এনে দেন। ২০১৬ সালে রিও অলিম্পিকে দেশের ইতিহাসে প্রথম অলিম্পিক ফুটবল স্বর্ণপদক জয়ের নায়কও ছিলেন তিনি।
বিশ্বকাপের মঞ্চে ২০১৪ সালে দুর্দান্ত খেললেও কোয়ার্টার ফাইনালে চোটে ছিটকে যান। এরপর জার্মানির কাছে ব্রাজিলের ঐতিহাসিক ৭-১ গোলের হার দেখতে হয় তাঁকে সাইডলাইনে বসে। ২০১৮ ও ২০২২ বিশ্বকাপেও ব্রাজিলকে শিরোপা এনে দিতে পারেননি। ২০২৬ বিশ্বকাপে শেষবারের মতো জাতীয় দলের জার্সি পরে মাঠে নামেন। কিন্তু শেষ ষোলোতে নরওয়ের কাছে ২-১ ব্যবধানে হেরে ব্রাজিল বিদায় নেয়। ম্যাচ শেষে আবেগঘন মুহূর্তে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানান নেইমার।
জাতীয় দলের হয়ে নেইমার তাঁর ক্যারিয়ার শেষ করেছেন ১৩০ ম্যাচে ৮০ গোল করে, যা তাঁকে ব্রাজিলের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতায় পরিণত করেছে।
নেইমারের ক্যারিয়ার ছিল প্রতিভা, সাফল্য, বিতর্ক এবং চোটের এক মিশ্র গল্প। অসংখ্যবার চোট তাঁকে বড় মঞ্চে পিছিয়ে দিয়েছে। তবুও তাঁর জাদুকরী ড্রিবল, সৃজনশীলতা, গোল করার ক্ষমতা এবং ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার দক্ষতা তাঁকে আধুনিক ফুটবলের অন্যতম সেরা শিল্পীতে পরিণত করেছে।
বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন অপূর্ণ থাকলেও ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের ইতিহাসে নেইমারের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। সান্তোসের এক কিশোর থেকে ব্রাজিলের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়ে ওঠার এই যাত্রা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার গল্প হয়েই থাকবে। তাঁর বিদায়ের মধ্য দিয়ে শেষ হলো ব্রাজিল ফুটবলের এক স্মরণীয় অধ্যায়।

সোমবার, ০৬ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৬ জুলাই ২০২৬

প্রিয় পাঠক, কারিগরি ত্রুটির জন্য আমাদের ওয়েবসাইটি কয়েকঘণ্টা বন্ধ থাকায় আমরা আন্তরিক দুঃখিত। ভবিষ্যতে এরকম ত্রুটি এড়াতে আমরা বদ্ধপরিকর।
— হিডেন স্টোরিজ পরিবার
আপনার মতামত লিখুন