জলপাইগুড়ি : উত্তরবঙ্গের শান্ত শহর জলপাইগুড়ি সোমবার রাতে আচমকাই পরিণত হল রাজনৈতিক রণক্ষেত্রে। সিপিএমের জেলা কার্যালয়ে ব্যাপক হামলা, ভাঙচুর এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনাকে কেন্দ্র করে চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ল গোটা এলাকায়।
ঘটনার পর থেকেই অভিযোগের তির সরাসরি রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের ছাত্র সংগঠন অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ বা এবিভিপি (ABVP)-র দিকে। যদিও অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে। খোদ পুলিশের উপস্থিতিতেই বাম এবং গেরুয়া শিবিরের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে যে ভাবে রক্তক্ষয়ী হাতাহাতি এবং খণ্ডযুদ্ধের সৃষ্টি হয়, তা শহরের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত সোমবার বিকেলে। স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, এদিন বিকেল থেকেই একটি স্থানীয় ইস্যুকে কেন্দ্র করে বামেদের ছাত্র সংগঠন এসএফআই (SFI) এবং এবিভিপি সমর্থকদের মধ্যে তীব্র বাদানুবাদ এবং গন্ডগোল শুরু হয়। ছাত্র রাজনীতির সেই উত্তাপ বিকেলের আলো নিভতে না নিভতেই আছড়ে পড়ে শহরের মূল স্রোতের রাজনীতিতে।
সিপিএম নেতৃত্বের অভিযোগ, বিকেলের সেই ঘটনার রেশ ধরেই রাতের অন্ধকারে সম্পূর্ণ পরিকল্পিতভাবে তাদের জলপাইগুড়ি জেলা কার্যালয়ে হামলা চালায় এবিভিপি এবং বিজেপির আশ্রিত দুষ্কৃতীরা। অভিযোগ, আচমকাই একদল উন্মত্ত যুবক পার্টি অফিসের সামনে জড়ো হয়ে গালিগালাজ ও ইটবৃষ্টি শুরু করে।
এরপর কার্যালয়ের ভেতরে জোর করে ঢুকে অবাধে চলে চেয়ার-টেবিল ও অন্যান্য আসবাবপত্র ভাঙচুর। এখানেই শেষ নয়, তাণ্ডব চালানোর পাশাপাশি পার্টি অফিসের একাংশে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয় বলেও গুরুতর অভিযোগ তুলেছে বাম নেতৃত্ব। আগুনের লেলিহান শিখা এবং ভাঙচুরের বিকট শব্দে গোটা এলাকায় তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ভয়ে আশেপাশের দোকানপাট দ্রুত বন্ধ করে দেন ব্যবসায়ীরা।
এই ঘটনায় সবথেকে বেশি সমালোচিত হচ্ছে পুলিশের ভূমিকা। অভিযোগ, খবর পেয়ে বিশাল পুলিশ বাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছলেও, তাদের সামনেই কার্যত অবাধে তাণ্ডব চলতে থাকে। পুলিশের ব্যারিকেড বা উপস্থিতির তোয়াক্কা না করেই সিপিএম এবং এবিভিপি সমর্থকরা একে অপরের দিকে তেড়ে যায়। শুরু হয় দু'পক্ষের মধ্যে তুমুল হাতাহাতি ও মারপিট।
পুলিশের সামনেই এই ধরনের নজিরবিহীন সংঘর্ষে রীতিমতো স্তম্ভিত ওয়াকিবহাল মহল। বিরোধীদের প্রশ্ন, খোদ পুলিশের সামনেই যদি এই মাত্রায় অশান্তি ছড়াতে পারে, তবে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ঠিক কোথায়? সার্বিক ভাবে পুলিশের ভূমিকায় ক্ষুব্ধ বিজেপি নেতা ও রাজ্য়ের মন্ত্রী দিলীপ ঘোষও। কলকাতার তিনি জানিয়েছেন, পুলিশ ঠিক ভাবে কাজ করছে না।
ঘটনাকে কেন্দ্র করে জলপাইগুড়ির রাজনৈতিক পারদ এখন তুঙ্গে। সিপিএমের স্থানীয় নেতৃত্বের স্পষ্ট দাবি, উত্তরবঙ্গে বামপন্থীদের পায়ের তলার মাটি ক্রমশ শক্ত হচ্ছে দেখেই ভয় পেয়েছে গেরুয়া শিবির। আর সেই রাজনৈতিক হতাশা থেকেই রাতের অন্ধকারে গুন্ডা বাহিনী লেলিয়ে দিয়ে এই কাপুরুষোচিত হামলা চালানো হয়েছে। অবিলম্বে দোষীদের গ্রেফতার করা না হলে বৃহত্তর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছে সিপিএম।
অন্যদিকে, বামেদের তোলা এই যাবতীয় অভিযোগ ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়েছে ভারতীয় জনতা পার্টি (BJP)। স্থানীয় বিজেপি নেতৃত্বের পালটা দাবি, এই ঘটনার সঙ্গে তাদের বা তাদের ছাত্র সংগঠনের কোনও দূরতম সম্পর্ক নেই। বিজেপির সাফ কথা, নিজেদের সাংগঠনিক দুর্বলতা ঢাকতে এবং পায়ের তলার জমি হারিয়ে এখন স্রেফ সাধারণ মানুষের সহানুভূতি কুড়োতে বিজেপির নামে মিথ্যা অপপ্রচার চালাচ্ছে সিপিএম।
আপাতত গোটা জলপাইগুড়ি শহর জুড়ে থমথমে পরিবেশ বিরাজ করছে। পরিস্থিতি যাতে নতুন করে হাতের বাইরে না বেরিয়ে যায়, তার জন্য রাত থেকেই ওই এলাকায় মোতায়েন করা হয়েছে বিশাল পুলিশ বাহিনী এবং র্যাফ। বাড়ানো হয়েছে পুলিশি টহল এবং কড়া নজরদারি। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জলপাইগুড়ির এই ঘটনা বাংলার বুকে বাড়তে থাকা রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতারই আরও একটি নগ্ন রূপ।
হিডেন স্টোরিজ নিউজ

মঙ্গলবার, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন