পাটনা: ‘সুশাসন’ শব্দটার সংজ্ঞা যে বিহারের এনডিএ সরকারের ঝুলিতে কতখানি স্থিতিস্থাপক, তা আর এক বার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন রাজ্যের মন্ত্রী অশোক চৌধুরী। জামুই কিংবা সমস্তিপুরের মতো জেলাগুলিতে যখন পর পর শ্লীলতাহানি, যৌন নির্যাতন ও গণ-উৎপীড়নের ঘটনায় নারীদের নিরাপত্তা নিয়ে হাহাকার উঠেছে, তখন মন্ত্রীর ব্যাখ্যা, এসব তো আমেরিকা কিংবা জাপানেও হয়! অর্থাৎ, পাটনা থেকে সমস্তিপুর, রাজ্যের শাসক শিবিরের যুক্তি স্পষ্ট, বিশ্বজয়ের দৌড়ে টেক্সাস বা টোকিওর সমকক্ষ হতে পারুক বা না পারুক, অপরাধের বিশ্বায়নে বিহার অন্তত পিছিয়ে নেই!
সম্প্রতি বিহারের সমস্তিপুরে এক তরুণীকে প্রকাশ্য রাস্তায় ঘিরে ধরে একদল যুবকের অসভ্যতামি এবং চরম হেনস্থার খবর সামনে আসতেই শোরগোল পড়ে যায়। এই একটি ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়, জামুই ও দরভাঙ্গাতেও গত কয়েক দিনে একই ধাঁচে পর পর নারী নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। কিন্তু সমস্তিপুরে পুলিশ ৪ জনকে গ্রেফতার করেই আত্মতুষ্টির সাগরে ভাসছে। রাস্তায় মহিলাদের সুরক্ষা কোথায়, প্রশাসনিক দাপট কোথায় গেল? সাংবাদিকদের এই ক্ষোভের মুখে পড়ে মন্ত্রীর উত্তর ছিল চরম ঔদ্ধত্যে ভরা। সুর চড়িয়ে সাংবাদিকদের ‘নেতিবাচক’ প্রশ্ন না করার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলে উঠলেন, “ন্যারেটিভ তৈরি করবেন না!”
সাংবাদিকদের প্রশ্নবাণে জেরবার হয়ে সরকারের ‘ক্ষমতা’ জাহির করতে গিয়ে মন্ত্রী অশোক চৌধুরী ইংরেজি-হিন্দির অদ্ভুত মিশেলে যা বললেন, তা বস্তুত ডাবল ইঞ্জিনের বিহার সরকারের আসল চেহারাটাই উন্মুক্ত করে দিল। তাঁর দাবি, ১৪ কোটি মানুষের রাজ্যে শিক্ষা ও সংস্কৃতির অভাব থাকা কিছু ‘বর্বর, অসভ্য ও মূর্খ’ মানুষ নিয়ম ভাঙবেই। কিন্তু সেই অপরাধ দমন করার বদলে তাঁর সওয়াল, “আমেরিকাতেও কি এমন ঘটনা ঘটে না? জাপান তো আমাদের চেয়ে অনেক উন্নত, সেখানেও তো অপরাধ হয়!” অর্থাৎ, খোদ মার্কিন মুলুক যখন অপরাধের হাত থেকে মুক্ত নয়, তখন বিহারে মহিলাদের সুরক্ষা নিয়ে কেন এত প্রশ্ন তোলা হবে? এটাই যেন শাসক জোটের নতুন যুক্তি।
বিরোধীরা অবশ্য এই সুযোগ হাতছাড়া করতে নারাজ। কংগ্রেস নেতা শাকিল আহমেদ খান সাফ জানিয়েছেন, রাজ্যে আইনের শাসন বলে কিছু বেঁচে নেই। দুষ্কৃতীরা এখন বেশ জানে, অপরাধ করলে সর্বোচ্চ জেলে যেতে হবে, আর কিছুদিন পর অনায়াসে জামিন পেয়ে ঘুরে বেড়ানো যাবে। প্রশাসনিক চরম শিথিলতার কারণেই অপরাধীদের মনে আইনের কোনও ভয় অবশিষ্ট নেই।
মুখ্যমন্ত্রী সম্রাট চৌধুরীর ‘বুলডোজার’ শাসনের গল্প যে কার্যক্ষেত্রে কতটা ফাপা, তা জামুই ও সমস্তিপুরের পর পর ঘটনাই প্রমাণ করছে। যে সরকার মহিলাদের সুরক্ষার ফিরিস্তি দিয়ে ক্ষমতায় টিকে রয়েছে, তাদের মন্ত্রীদের মুখে যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের দোহাই শোনা যায়, তখন বুঝে নিতে বাকি থাকে না যে, কুখ্যাত ‘জঙ্গলরাজ’ আসলে মোড়ক বদলে নতুন চেহারায় হাজির হয়েছে। মন্ত্রী যতই ক্ষোভ প্রকাশ করে বলুন যে কোনও মুখ্যমন্ত্রী বা বিশ্বনেতা অপরাধ বন্ধের গ্যারান্টি দিতে পারেন না, আসল সত্যটা অলিতে-গলিতেই লেখা রয়েছে, বিহার কিন্তু সেই বিহারেই থমকে রয়েছে!

বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন