মুম্বই: নাটকীয় ডিগবাজি!
মাত্র এক মাস আগেই যিনি আগ বাড়িয়ে ইস্তফা দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছিলেন, সেই এন চন্দ্রশেখরনকেই ফের আগামী পাঁচ বছরের জন্য টাটা সন্স-এর এক্সিকিউটিভ চেয়ারম্যান পদে পুনর্নিয়োগ করার সিদ্ধান্ত নিল বোর্ড। তবে সর্বসম্মতিক্রমে নয়, ভোটের লড়াইয়ে একমাত্র নোয়েল টাটা ছাড়া বাকি সব সদস্যই চন্দ্রশেখরনের পক্ষে সওয়াল করেন। এর পরেই টাটা সন্স বোর্ডের এই সিদ্ধান্তকে সরাসরি 'বেআইনি' ঘোষণা করে ময়দানে নেমে পড়েছে নোয়েল টাটার নেতৃত্বাধীন ‘টাটা ট্রাস্টস’। ফলে সাড়ে ৩৮ লক্ষ কোটি টাকার (৪০ হাজার কোটি মার্কিন ডলার) দেশের বৃহত্তম শিল্পগোষ্ঠীর অন্দরের চিড় ও ক্ষমতার অলিন্দে গোপন লড়াই এখন প্রকাশ্যে আছড়ে পড়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত গত ১২ অগস্ট। চন্দ্রশেখরন নিজেই টাটা সন্স বোর্ডকে জানিয়েছিলেন, আগামী ২০ ফেব্রুয়ারি মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তিনি আর চেয়ারম্যান পদে থাকতে চান না। কিন্তু হঠাৎ কেন এই ইস্তফার সিদ্ধান্ত? তখন থেকেই খবর ছড়ায়, মূল নিয়ন্ত্রক সংস্থা ‘টাটা সন্স’ এবং ৬৬ শতাংশ অংশীদারি থাকা ‘টাটা ট্রাস্টস’-এর মধ্যে দীর্ঘ দিন ধরেই তীব্র সংঘাত চলছিল।
সংঘাতের মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল রিজার্ভ ব্যাঙ্কের (আরবিআই) একটি নিয়ম এবং শেয়ার বাজারে নথিভুক্ত হওয়ার প্রক্রিয়া। নন-ব্যাঙ্কিং ফিন্যান্সিয়াল কোম্পানি (এনবিএফসি) বা কোর ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানি হিসেবে টাটা সন্সকে শেয়ার বাজারে আইপিও (IPO) আনার বাধ্যবাধকতা দিয়েছিল আরবিআই। কিন্তু ট্রাস্ট প্রধান নোয়েল টাটা কড়া অবস্থান নিয়ে চাননি যে, ঐতিহ্যবাহী টাটা সন্স শেয়ার বাজারে নথিভুক্ত হোক। অন্যদিকে, চন্দ্রশেখরন সেই মর্মে ট্রাস্টকে কোনো সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি দিতে রাজি হননি।
সংঘাত চরম আকার ধারণ করলে চন্দ্রশেখরন সরে দাঁড়ানোর কথা ঘোষণা করেন। রাজনৈতিক মহলে জল্পনা ছড়িয়ে পড়ে, ইস্তফা দিয়ে তিনি কেন্দ্র সরকারের অর্থমন্ত্রক কিংবা আরবিআই-এর কোনো শীর্ষ পদের দায়িত্বে আসতে পারেন, এমনকি মোদী মন্ত্রিসভাতেও স্থান পেতে পারেন। কিন্তু সেপ্টেম্বরের মাঝপথে এসে পুরো সমীকরণই উলটে গেল। অতি সম্প্রতি এনবিএফসি লাইসেন্স ছাড়ার সংক্রান্ত টাটা সন্সের আবেদন খারিজ করে দিয়েছে শীর্ষ ব্যাঙ্ক। অর্থাৎ, চলতি বছরের শেষেই টাটা সন্সকে শেয়ার বাজারে পা রাখতেই হচ্ছে।
আরবিআইয়ের এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের পরপরই টাটা সন্সের ভবিষ্যৎ ও আইপিও প্রক্রিয়া সুচারুভাবে চালনা করার জন্য অভিজ্ঞ চন্দ্রশেখরনের বিকল্প খুঁজে পায়নি বোর্ডের বড় অংশ। বৈঠক ডেকে চন্দ্রশেখরনের মেয়াদ আরও ৫ বছর বাড়ানোর প্রস্তাব ভোটাভুটিতে পাস করিয়ে নেওয়া হয়। যদিও সঙ্গে সঙ্গেই একে ‘বেআইনি’ দাবি করে তোপ দেগেছে নোয়েল শিবির।
২০১৭ সালে টাটা গোষ্ঠীর প্রথম নন-পার্সি চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর টিসিএস, টাটা মোটরস, এয়ার ইন্ডিয়ার মতো ৩০টি বৃহৎ সংস্থাকে এক সুতোয় বেঁধে সাফল্য এনে দিয়েছেন চন্দ্রশেখরন। এই পরিস্থিতিতে তিনি পুনর্নির্বাচিত হওয়ায় জল্পনা শুরু হয়েছে রাজ্যের শিল্পাঞ্চলেও।
কারণ, সম্প্রতি বাংলায় নতুন সরকার ও প্রশাসনের সঙ্গে টাটা গোষ্ঠীর সম্পর্ক পুনর্বিন্যাসের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। চন্দ্রশেখরনের এই ‘ইউ-টার্ন’ ও মসনদে টিকে থাকা কি অবশেষে টাটাকে ফের বাংলার মাটিতে ফিরিয়ে আনার পথ সুগম করবে? চন্দ্রশেখরনের হাত ধরেই কি বাংলায় বিশাল বিনিয়োগ বা টাটা মোটরসের নতুন অধ্যায় সূচিত হবে? উত্তর পেতে এখন বোম্বাই হাউসের অন্দরের এই চরম নাটক এবং শেয়ার বাজারের পরবর্তী চালের দিকেই নজর রাখছে সমগ্র শিল্প ও রাজনৈতিক মহল।

বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন