কলকাতা: উৎসবের আনন্দ নিমেষে বিষাদে বদলে যাওয়ার নেপথ্যে ঠিক কী ঘটেছিল, তার রোমহর্ষক ও মর্মান্তিক চিত্রটি এবার স্পষ্ট হল ময়নাতদন্তের প্রাথমিক রিপোর্টে। সপ্তমীর সন্ধ্যায় কলকাতার চোরবাগান সর্বজনীনের মণ্ডপে পদপিষ্ট হয়ে ১৯ জনের মৃত্যুর ঘটনায় রবিবার যে ময়নাতদন্তের রিপোর্ট সামনে এসেছে, তাতে দেখা যাচ্ছে ভিড়ের বিপুল চাপে অনেকেরই পাঁজরের হাড় ভেঙে তা সরাসরি ঢুকে গিয়েছিল ফুসফুসে। প্রশাসনিক ও চিকিৎসকদের প্রাথমিক রিপোর্ট অনুযায়ী, উৎসবের আবহে চরম হুড়োহুড়ি আর মানুষের সমুদ্রসম চাপের ফলেই প্রাণ হারিয়েছেন ওই ১৯ জন দুর্ভাগ্যজনক মানুষ।
শনিবার সন্ধ্যা ৭টা ৪০ মিনিট নাগাদ হঠাৎ বৃষ্টি নামতেই চোরবাগান মণ্ডপ থেকে বেরোনোর গেটে ভিড়ের চাপ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গিয়েছিল। সরু গেট কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে যাওয়ায় এবং একসঙ্গে হাজার হাজার মানুষ বাইরে বেরোনোর চেষ্টা করায় মণ্ডপের ভিতরে তৈরি হয় ভয়াবহ পরিস্থিতি। হুড়োহুড়িতে একের পর এক দর্শনার্থী নিচে পড়ে যান, আর তাঁদের মাথার উপর দিয়ে চলে যায় উত্তাল জনস্রোত।
রবিবার প্রকাশিত ময়নাতদন্তের প্রাথমিক রিপোর্ট অনুযায়ী, কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ পুলিশ মর্গে ১৭ জন, আরজি কর মেডিক্যাল কলেজে একজন এবং এনআরএস মেডিক্যাল কলেজে একজনের দেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। চিকিৎসকদের মতে, মৃত্যুর কারণগুলিকে প্রধানত তিনটি ভাগে ভাগ করা হচ্ছে, মাথায় গুরুতর আঘাত ও অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ, দমবন্ধ হয়ে মৃত্যু এবং পাঁজরের হাড় ভেঙে ফুসফুস ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া।
রিপোর্টে উঠে এসেছে অত্যন্ত মর্মান্তিক কিছু তথ্য। ভিড়ের চাপে মারাত্মকভাবে বুক চেপে যাওয়ায় (যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘ট্রমাটিক অ্যাসফিক্সিয়া’ বলা হয়) বহু মানুষের শ্বাস-প্রশ্বাস ও রক্তসঞ্চালন সম্পূর্ণ ব্যাহত হয়। অন্তত ছ’জন বা সাত জনের ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছে, নিচে পড়ে যাওয়ার পর মানুষের লাগাতার চাপের কারণে তাঁদের পাঁজরের হাড় ভেঙে তা সোজা ঢুকে গিয়েছিল ফুসফুসের ভিতরে। এর পাশাপাশি, ভিড়ের চাপে দম বন্ধ হয়ে এবং শিশুদের ক্ষেত্রে ফুসফুস বিকল হয়ে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। অনেকের মাথায় গুরুতর আঘাত লাগার ফলে মস্তিষ্কের ভিতর রক্তক্ষরণের চিহ্নও পাওয়া গিয়েছে। হাত-পা ভাঙার পাশাপাশি বহু আহত ব্যক্তির শরীরে একাধিক আঘাতের ক্ষতচিহ্ন স্পষ্ট ছিল।
এই বীভৎস দুর্ঘটনা থেকে বড় শিক্ষা নিয়ে নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন। ভবানীভবনে জরুরি উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের পর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী একাধিক কঠোর নির্দেশিকা জারি করেছেন। শহরের বড় পুজো মণ্ডপগুলিতে ভিআইপি পাস সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এখন থেকে জাতি-ধর্ম-নির্বিশেষে সকলকেই একটিমাত্র সাধারণ লাইনে দাঁড়িয়েই মণ্ডপে প্রবেশ করতে হবে। পাশাপাশি, এই মর্মান্তিক ঘটনার জেরে আগামী ২৬ তারিখে রাজ্যের উদ্যোগে আয়োজিত বিজয়া সম্মিলনী অনুষ্ঠান সম্পূর্ণ আড়ম্বরবর্জিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ওই দিন সমস্ত পুজো কমিটিকে ডেকে মৃতদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাজ্ঞাপন এবং আহত ও নিহতদের পরিবারকে আর্থিক সহায়তা তুলে দেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে। ইতিমধ্যে এই ঘটনায় পুলিশ সাতজনকে গ্রেপ্তার করেছে এবং রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে মৃতদের পরিবারকে ২৫ লক্ষ টাকা ও পরিবারের একজনকে সরকারি চাকরি এবং আহতদের ৫ লক্ষ টাকা আর্থিক সহায়তার ঘোষণা করা হয়েছে।

সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৯ অক্টোবর ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন