Hidden Stories (বাংলা)
সর্বশেষ

Chorbagan Tragedy : চোরবাগানের চোরাবালি কলকাতার পুজোয় সংস্কার আনুক, শুরু করুক শুভেন্দু সরকার

প্রকাশ : ১৮ অক্টোবর ২০২৬
Chorbagan Tragedy : চোরবাগানের চোরাবালি কলকাতার পুজোয় সংস্কার আনুক, শুরু করুক শুভেন্দু সরকার

পিনাকপাণি ঘোষ: এমন বিষাদ আগে দেখেনি কলকাতা। জানি, এর পরেও মানুষ নতুন পোশাক পরবেন, ঠাকুর দেখতে বার হবেন, ভিড়ে ঠেলাঠেলি করবেন কিন্তু সকলেই কি আনন্দে থাকবেন! অনেকেই ঘরের কোণে বসে উৎসব কবে শেষ হয় তার অপেক্ষা করবেন।

আসলে সাধারণ দর্শনার্থী মানে জনতা কোনও প্রতিষ্ঠান নয় বলে তাদের দায়, দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলা তো অনর্থক। হুজুগের রাশ টানবে কে! কিন্তু টানতেই হবে। চোরবাগানের চোরাবালিতে তলিয়ে যাওয়া এত গুলো প্রাণ সেই শিক্ষাই তো দিয়ে গেল।

কলকাতার পুজো, ইদানীং জেলা শহরের দিকে তাকালেও একটা বিষয় স্পষ্ট যে, দুর্ঘটনা না ঘটাটাই আসলে অঘটন। চোরবাগানে ঘটেছে কিন্তু অন্য অনেক পুজো মণ্ডপেই সেটা হতে পারত। এখনও সতর্ক না হলে হতে পারে। 

এই দুঃসময় এক দিনে আসেনি। কলকাতায় থিম পুজো কবে শুরু হয়েছিল সেটা ইতিহাসের দিকে তাকালে নির্দিষ্ট তারিখ পাওয়া যাবে না। কারণ, প্রথম প্রথম ‘থিম’ নামটা ছিল না। কিন্তু কী ভাবে যেন প্রথমে কলকাতা এবং তার পরে ছোঁয়াচে রোগের মতো জেলায় জেলায় ‘দুর্গাপুজো’ হয়ে যায় আসলে ‘থিমপুজো’। ভক্তি নয়, আর্থিক শক্তিতে একে অপরকে টেক্কা দেওয়ার লড়াই। কংগ্রেস নেতারা পুজোয় যুক্ত থাকতেন, বাম নেতাদের মধ্যে সরাসরি যুক্ত থাকার নজির কম কিন্তু তৃণমূল জমানায় পুজোই হয়ে যায় রাজনীতির পরিচয়। বাম নেতারা যেহেতু সমাজের সব ক্ষেত্রে মজবুত সংগঠন গড়লেও পুজো মণ্ডপ থেকে দূরত্ব রাখত। আর জনংযোগের এই ফাঁকা জায়গা দখলের জন্যই তৃণমূল নেতারা একে একে বারোয়ারি পুজোকে নেতার পুজো বানিয়ে ফেলেন। আর এতে যে দলনেত্রীর সম্পূর্ণ সমর্থন ছিল সেটা মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরে পুজো নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রকাশ্য উৎসাহ স্পষ্ট করে দেয়। করোনাকালের পরে শুরু হয়ে গেল পুজোকে ভাতা নির্ভর করার ‘দুর্গা ভান্ডার’। আর এখন উবে যাওয়া তৃণমূল নেতাদের বড় বড় ‘থিমপুজো’ যেখানে ভক্তি বা আরাধনা কম, আয়োজনের ঢক্কানিনাদ বেশি সেগুলো দখল করে নিলেন বিজেপি নেতা, মন্ত্রী, বিধায়কেরা। 

এখানে একটা বিষয় মনে রাখা দরকার, এই রাজ্যে যে রাজনৈতিক পরিবর্তন এসেছে তাতে হাতে গোনা কয়েকজন বাদ দিলে রাজ্য বিজেপির অধিকাংশ নেতা বা জয়ী বিধায়কের কোনও অবদান নেই। পরিবর্তন এনেছে সাধারণ মানুষ। মূলত তৃণমূলকে সরিয়ে দিতেই বিজেপিকে আনা। কিন্তু বিজেপি নেতাদের বড় অংশই সেই আত্মসমীক্ষাটা না করে নিজেদের মাতব্বর ভাবতে শুরু করেন। অভিজ্ঞতার অভাবে নিজের দফতর সামলাতে পারেন না অনেক মন্ত্রীই। ফিতে কাটা তো কোনও মন্ত্রীর সাফল্যের সূচক নয়। সরকার চালানোর এই অদক্ষতা মেরামত না করে একেবারে অভিজ্ঞতা না থাকা দুর্গাপুজো পরিচালনায় তাঁরা কেন গেলেন, এটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। 

মোটামুটি ২০০০ সালের পর থেকেই ‘দুর্গাপুজো’ হয়ে যায় ‘থিমপুজো’। এশিয়ান পেন্টস শারদ সম্মান দেওয়া শুরু করার পরে পরে। একের পর এক অখ্যাত পুজো আলোয় চলে আসে। কলকাতার পুজোর মানচিত্রটা ক্রমশ বড় হয়ে যায়। বেহালা, সন্তোষপুর, দমদম ইত্যাদি এলাকার সরু রাস্তায় বড় পুজো শুরু হয়। মানুষের ঢল নামে। আনন্দবাজার পুজোর ‘ভিড়মিটার’ চালু করে ভিড়কে অতিভিড় করার খেলায় নামে। ভিড়ের হিসেব, ঘড়ির কাঁটা মিলিয়ে।  একের পর এক পুজো প্রতিযোগিতা চালু হয়ে যায়। এখন হিসেব করলে হাজার খানেক প্রতিযোগিতা তো আছে। এর পরে শুরু হয় ‘ভিআইপি’, ‘ভিভিআইপি’ পাশের খেলা। তার বিলি নিয়ে চরম প্রতিযোগিতা। আগেই বিজ্ঞপনের দাপট ছিল, সেটা আরও বাড়ে। তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পরে শুরু হয় চিটফান্ডের অর্থ পুজোয় বিনিয়োগ।

নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু থেকে সুব্রত মুখোপাধ্যায়রা পুজো করেছেন ‘থিমপুজো’ নয়। ২০০১ সালে কসবা বোসপুকুর শীতলা মন্দিরে ভাঁড়ের মন্ডপ। ২০০৩ সালে প্রথমবার সুকান্ত সেতু পেরিয়ে প্রথমবার এশিয়ান পেন্টসের ফাইনাল রাউন্ডে সন্তোষপুর ত্রিকোণ পার্ক। ততদিনে দুর্গাপুজোর মেগাস্টার শিল্পী অমর সরকার। ত্রিকোণ পার্কে সেবার গালার পুতুল দিয়ে তৈরি হয়েছিল মন্ডপ। সেবারেই লেকপল্লী মন্ডপে প্রখ্যাত ছৌ শিল্পী গম্ভীর সিং মুরার ছৌ দল লাইভ নাচ দেখিয়েছিল লেকপল্লীর মন্ডপে। ২০০৪-এ শিল্পী সুশান্ত পালের থিম আলোকের এই ঝর্ণাধারা ত্রিকোণ পার্কে। ২০০৫-এ শিল্পী রবীন রায়ের মাদুরের মন্ডপ। ২০০৬- এ অমর সরকারের মাশান শিল্প। ২০০৪ সালে লেকপল্লীতে মনসামঙ্গলের চাঁদ সদাগরের বজরা। হাতপাখার মণ্ডপ। কোথাও পোড়ামাটির কাজ, কোথাও সনাতন দিন্দার নবগ্রহ দ্বাদশ রাশি। নতুন নতুন শিল্পীদের মধ্যেও ‘স্টার’ হওয়ার লড়াই। এ সবের মধ্যেই কবে যেন, সারদা পার্ক হয়ে গেছে চোরবাগান।

২০১১ সালে এল রাজনৈতিক পরিবর্তন। তৃণমূলের নেতামন্ত্রীদের কল্যাণে সুরুচি সঙ্ঘ, বোসপুকুর শিতলা মন্দির, আহিরীটোলা, বড়িশা, নাকতলা উদয়ন, শ্রীভূমি আরও কত কত পুজো হয়ে গেল ‘ভিভিআইপি’। যাঁর পুজোয় যত ভিড় তাঁর ওজন তত বেশি। এবারে তৃণমূল নেতাদের সেই জুতোয় পা গলালেন বিজেপির বড় তো বটেই, মেজ, সেজ, ছোট নেতারাও। যাঁদের অনেকের রাজনৈতিক শক্তির হিসাব কষলে দেখা যাবে ঢাল, তলোয়ার কিছুই নেই। কিন্তু সেই নিধিরাম সর্দারেরা পুজোর ব্যানারে নিজেদের ছবি ছাপিয়ে রাতারাতি খ্যাত হতে চাইলেন। দলের সমর্থন ও প্রশ্রয় নিশ্চয়ই ছিল।

অনেকে হয় তো ভাববেন ধান ভাঙতে শিবের গীত কেন! আসলে এই উপক্রমনিকা না থাকলে কেমন সংস্কার প্রয়োজন তা বোঝা দুষ্কর হবে। কারণ, প্রথম যে সংস্কার দরকার সেটা হল যত বড় নেতারই পুজো হোক না কেন, তিনি যত বড় প্রভাবশালীই হোন পুলিশ যেন নিরপেক্ষ ভাবে যাবতীয় শর্তাবলী মানানোর বিষয়ে সক্রিয় হন। নতুন যুগে মানুষ মোবাইলে ভিডিয়ো করতে করতে কিংবা প্রিয়জনকে লাইভ দেখাতে দেখাতে মণ্ডপে যান। তাদের চোখ থাকে মোবাইল স্ক্রিনে। সামনে কী হচ্ছে কেউ দেখে না। মণ্ডপে মোবাইল বার করাটাই নিষিদ্ধ হওয়া দরকার।

হিন্দু মতে পুজোর উৎসব মানে অন্ধকার থেকে আলোয় ফেরা। সেখানে দেবীর মণ্ডপে থিমের উৎপাতে অন্ধকার করা হবে কেন! শিল্পের চেয়ে তো জীবন দামী। তাই মণ্ডপে আলোর কারসাজি নয়, আলো চাই। সব কিছু দেখতে পাওয়ার মতো আলো। শব্দের ব্যবহার নয়, পাশের মানুষটার কষ্ট বা কথা শুনতে পাওয়ার সুবিধা দরকার। মণ্ডপে দর্শনার্থী পরিচালনার জন্য স্বেচ্ছাসেবকের বাঁশি নয়, দরকার প্রশিক্ষিত কর্মী। আয় বাড়ানোর জন্য যত্র তত্র স্টল বসিয়ে পথ সংকীর্ণ করার নেশাও বন্ধ করতে হবে। মানুষের মধ্য হুজুগ তৈরি যাতে না হয় তার জন্য কী কী করা দরকার কে জানে! কারণ, সবাই জানে— গতকালের দুর্ঘটনার পরেও মানুষের ভিড় আর স্রোত চলবে। চোরবাগান নয়, অন্য কোথাও।

চোরবাগানের ঘটনা থেকে শিক্ষা নিতে হবে সরকার, প্রশাসন, আয়োজকদের। আর দর্শনার্থীরা কী করবেন! থিম-দর্শন না করলে মা দুর্গা পাপ দেন না। মায়ের কাছে থিমের চেয়ে সন্তানের জীবনের মূল্য যে অনেক অনেক বেশি।

বিষয় : WestBengalNews KolkataNews HiddenStoriesNews durgapuja2026 ChorbaganTragedy VIPPass

আপনার মতামত লিখুন

Hidden Stories (বাংলা)

রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬


Chorbagan Tragedy : চোরবাগানের চোরাবালি কলকাতার পুজোয় সংস্কার আনুক, শুরু করুক শুভেন্দু সরকার

প্রকাশের তারিখ : ১৮ অক্টোবর ২০২৬

featured Image
পিনাকপাণি ঘোষ: এমন বিষাদ আগে দেখেনি কলকাতা। জানি, এর পরেও মানুষ নতুন পোশাক পরবেন, ঠাকুর দেখতে বার হবেন, ভিড়ে ঠেলাঠেলি করবেন কিন্তু সকলেই কি আনন্দে থাকবেন! অনেকেই ঘরের কোণে বসে উৎসব কবে শেষ হয় তার অপেক্ষা করবেন।আসলে সাধারণ দর্শনার্থী মানে জনতা কোনও প্রতিষ্ঠান নয় বলে তাদের দায়, দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলা তো অনর্থক। হুজুগের রাশ টানবে কে! কিন্তু টানতেই হবে। চোরবাগানের চোরাবালিতে তলিয়ে যাওয়া এত গুলো প্রাণ সেই শিক্ষাই তো দিয়ে গেল।কলকাতার পুজো, ইদানীং জেলা শহরের দিকে তাকালেও একটা বিষয় স্পষ্ট যে, দুর্ঘটনা না ঘটাটাই আসলে অঘটন। চোরবাগানে ঘটেছে কিন্তু অন্য অনেক পুজো মণ্ডপেই সেটা হতে পারত। এখনও সতর্ক না হলে হতে পারে। এই দুঃসময় এক দিনে আসেনি। কলকাতায় থিম পুজো কবে শুরু হয়েছিল সেটা ইতিহাসের দিকে তাকালে নির্দিষ্ট তারিখ পাওয়া যাবে না। কারণ, প্রথম প্রথম ‘থিম’ নামটা ছিল না। কিন্তু কী ভাবে যেন প্রথমে কলকাতা এবং তার পরে ছোঁয়াচে রোগের মতো জেলায় জেলায় ‘দুর্গাপুজো’ হয়ে যায় আসলে ‘থিমপুজো’। ভক্তি নয়, আর্থিক শক্তিতে একে অপরকে টেক্কা দেওয়ার লড়াই। কংগ্রেস নেতারা পুজোয় যুক্ত থাকতেন, বাম নেতাদের মধ্যে সরাসরি যুক্ত থাকার নজির কম কিন্তু তৃণমূল জমানায় পুজোই হয়ে যায় রাজনীতির পরিচয়। বাম নেতারা যেহেতু সমাজের সব ক্ষেত্রে মজবুত সংগঠন গড়লেও পুজো মণ্ডপ থেকে দূরত্ব রাখত। আর জনংযোগের এই ফাঁকা জায়গা দখলের জন্যই তৃণমূল নেতারা একে একে বারোয়ারি পুজোকে নেতার পুজো বানিয়ে ফেলেন। আর এতে যে দলনেত্রীর সম্পূর্ণ সমর্থন ছিল সেটা মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরে পুজো নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রকাশ্য উৎসাহ স্পষ্ট করে দেয়। করোনাকালের পরে শুরু হয়ে গেল পুজোকে ভাতা নির্ভর করার ‘দুর্গা ভান্ডার’। আর এখন উবে যাওয়া তৃণমূল নেতাদের বড় বড় ‘থিমপুজো’ যেখানে ভক্তি বা আরাধনা কম, আয়োজনের ঢক্কানিনাদ বেশি সেগুলো দখল করে নিলেন বিজেপি নেতা, মন্ত্রী, বিধায়কেরা। এখানে একটা বিষয় মনে রাখা দরকার, এই রাজ্যে যে রাজনৈতিক পরিবর্তন এসেছে তাতে হাতে গোনা কয়েকজন বাদ দিলে রাজ্য বিজেপির অধিকাংশ নেতা বা জয়ী বিধায়কের কোনও অবদান নেই। পরিবর্তন এনেছে সাধারণ মানুষ। মূলত তৃণমূলকে সরিয়ে দিতেই বিজেপিকে আনা। কিন্তু বিজেপি নেতাদের বড় অংশই সেই আত্মসমীক্ষাটা না করে নিজেদের মাতব্বর ভাবতে শুরু করেন। অভিজ্ঞতার অভাবে নিজের দফতর সামলাতে পারেন না অনেক মন্ত্রীই। ফিতে কাটা তো কোনও মন্ত্রীর সাফল্যের সূচক নয়। সরকার চালানোর এই অদক্ষতা মেরামত না করে একেবারে অভিজ্ঞতা না থাকা দুর্গাপুজো পরিচালনায় তাঁরা কেন গেলেন, এটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। মোটামুটি ২০০০ সালের পর থেকেই ‘দুর্গাপুজো’ হয়ে যায় ‘থিমপুজো’। এশিয়ান পেন্টস শারদ সম্মান দেওয়া শুরু করার পরে পরে। একের পর এক অখ্যাত পুজো আলোয় চলে আসে। কলকাতার পুজোর মানচিত্রটা ক্রমশ বড় হয়ে যায়। বেহালা, সন্তোষপুর, দমদম ইত্যাদি এলাকার সরু রাস্তায় বড় পুজো শুরু হয়। মানুষের ঢল নামে। আনন্দবাজার পুজোর ‘ভিড়মিটার’ চালু করে ভিড়কে অতিভিড় করার খেলায় নামে। ভিড়ের হিসেব, ঘড়ির কাঁটা মিলিয়ে।  একের পর এক পুজো প্রতিযোগিতা চালু হয়ে যায়। এখন হিসেব করলে হাজার খানেক প্রতিযোগিতা তো আছে। এর পরে শুরু হয় ‘ভিআইপি’, ‘ভিভিআইপি’ পাশের খেলা। তার বিলি নিয়ে চরম প্রতিযোগিতা। আগেই বিজ্ঞপনের দাপট ছিল, সেটা আরও বাড়ে। তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পরে শুরু হয় চিটফান্ডের অর্থ পুজোয় বিনিয়োগ।নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু থেকে সুব্রত মুখোপাধ্যায়রা পুজো করেছেন ‘থিমপুজো’ নয়। ২০০১ সালে কসবা বোসপুকুর শীতলা মন্দিরে ভাঁড়ের মন্ডপ। ২০০৩ সালে প্রথমবার সুকান্ত সেতু পেরিয়ে প্রথমবার এশিয়ান পেন্টসের ফাইনাল রাউন্ডে সন্তোষপুর ত্রিকোণ পার্ক। ততদিনে দুর্গাপুজোর মেগাস্টার শিল্পী অমর সরকার। ত্রিকোণ পার্কে সেবার গালার পুতুল দিয়ে তৈরি হয়েছিল মন্ডপ। সেবারেই লেকপল্লী মন্ডপে প্রখ্যাত ছৌ শিল্পী গম্ভীর সিং মুরার ছৌ দল লাইভ নাচ দেখিয়েছিল লেকপল্লীর মন্ডপে। ২০০৪-এ শিল্পী সুশান্ত পালের থিম আলোকের এই ঝর্ণাধারা ত্রিকোণ পার্কে। ২০০৫-এ শিল্পী রবীন রায়ের মাদুরের মন্ডপ। ২০০৬- এ অমর সরকারের মাশান শিল্প। ২০০৪ সালে লেকপল্লীতে মনসামঙ্গলের চাঁদ সদাগরের বজরা। হাতপাখার মণ্ডপ। কোথাও পোড়ামাটির কাজ, কোথাও সনাতন দিন্দার নবগ্রহ দ্বাদশ রাশি। নতুন নতুন শিল্পীদের মধ্যেও ‘স্টার’ হওয়ার লড়াই। এ সবের মধ্যেই কবে যেন, সারদা পার্ক হয়ে গেছে চোরবাগান।২০১১ সালে এল রাজনৈতিক পরিবর্তন। তৃণমূলের নেতামন্ত্রীদের কল্যাণে সুরুচি সঙ্ঘ, বোসপুকুর শিতলা মন্দির, আহিরীটোলা, বড়িশা, নাকতলা উদয়ন, শ্রীভূমি আরও কত কত পুজো হয়ে গেল ‘ভিভিআইপি’। যাঁর পুজোয় যত ভিড় তাঁর ওজন তত বেশি। এবারে তৃণমূল নেতাদের সেই জুতোয় পা গলালেন বিজেপির বড় তো বটেই, মেজ, সেজ, ছোট নেতারাও। যাঁদের অনেকের রাজনৈতিক শক্তির হিসাব কষলে দেখা যাবে ঢাল, তলোয়ার কিছুই নেই। কিন্তু সেই নিধিরাম সর্দারেরা পুজোর ব্যানারে নিজেদের ছবি ছাপিয়ে রাতারাতি খ্যাত হতে চাইলেন। দলের সমর্থন ও প্রশ্রয় নিশ্চয়ই ছিল।অনেকে হয় তো ভাববেন ধান ভাঙতে শিবের গীত কেন! আসলে এই উপক্রমনিকা না থাকলে কেমন সংস্কার প্রয়োজন তা বোঝা দুষ্কর হবে। কারণ, প্রথম যে সংস্কার দরকার সেটা হল যত বড় নেতারই পুজো হোক না কেন, তিনি যত বড় প্রভাবশালীই হোন পুলিশ যেন নিরপেক্ষ ভাবে যাবতীয় শর্তাবলী মানানোর বিষয়ে সক্রিয় হন। নতুন যুগে মানুষ মোবাইলে ভিডিয়ো করতে করতে কিংবা প্রিয়জনকে লাইভ দেখাতে দেখাতে মণ্ডপে যান। তাদের চোখ থাকে মোবাইল স্ক্রিনে। সামনে কী হচ্ছে কেউ দেখে না। মণ্ডপে মোবাইল বার করাটাই নিষিদ্ধ হওয়া দরকার।হিন্দু মতে পুজোর উৎসব মানে অন্ধকার থেকে আলোয় ফেরা। সেখানে দেবীর মণ্ডপে থিমের উৎপাতে অন্ধকার করা হবে কেন! শিল্পের চেয়ে তো জীবন দামী। তাই মণ্ডপে আলোর কারসাজি নয়, আলো চাই। সব কিছু দেখতে পাওয়ার মতো আলো। শব্দের ব্যবহার নয়, পাশের মানুষটার কষ্ট বা কথা শুনতে পাওয়ার সুবিধা দরকার। মণ্ডপে দর্শনার্থী পরিচালনার জন্য স্বেচ্ছাসেবকের বাঁশি নয়, দরকার প্রশিক্ষিত কর্মী। আয় বাড়ানোর জন্য যত্র তত্র স্টল বসিয়ে পথ সংকীর্ণ করার নেশাও বন্ধ করতে হবে। মানুষের মধ্য হুজুগ তৈরি যাতে না হয় তার জন্য কী কী করা দরকার কে জানে! কারণ, সবাই জানে— গতকালের দুর্ঘটনার পরেও মানুষের ভিড় আর স্রোত চলবে। চোরবাগান নয়, অন্য কোথাও।চোরবাগানের ঘটনা থেকে শিক্ষা নিতে হবে সরকার, প্রশাসন, আয়োজকদের। আর দর্শনার্থীরা কী করবেন! থিম-দর্শন না করলে মা দুর্গা পাপ দেন না। মায়ের কাছে থিমের চেয়ে সন্তানের জীবনের মূল্য যে অনেক অনেক বেশি।

Hidden Stories (বাংলা)


কপিরাইট © ২০২৬ Hidden Stories (বাংলা) । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত