নয়াদিল্লি: প্রয়াত অভিনেতা সুশান্ত সিং রাজপুত এবং তাঁর প্রাক্তন ম্যানেজার দিশা সালিয়ানের রহস্যমৃত্যু মামলায় দীর্ঘ ছয় বছর পর নেমে এলো এক নজিরবিহীন ও চাঞ্চল্যকর মোড়। বম্বে হাইকোর্টের কড়া নির্দেশের পরই দিশা সালিয়ানের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা সিবিআই সোমবার একটি বিস্ফোরক প্রথম তথ্য বিবরণী (এফআইআর) রুজু করেছে।
এই নতুন এফআইআরে কেবল যৌন নির্যাতন বা হত্যার মতো গুরুতর অভিযোগই আনা হয়নি, বরং এর পিছনে এক বিরাট প্রভাবশালী রাজনৈতিক ও সামাজিক ষড়যন্ত্র এবং প্রমান লোপাটের বিস্ফোরক দাবি করা হয়েছে।
মুম্বই পুলিশের হাত থেকে তদন্তভার সিবিআই-এর হাতে যাওয়ার মাত্র দুই সপ্তাহের মাথায় গঠিত এই এফআইআরে নাম জড়িয়েছে মহারাষ্ট্রের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী উদ্ধব থাকরে, তাঁর পুত্র তথা শিবসেনা (ইউবিটি) নেতা আদিত্য থাকরে, অভিনেতা দিনো মোরিয়া, সূরজ পাঞ্চোলি, রিয়া চক্রবর্তী, তাঁর ভাই শৌভিক চক্রবর্তী-সহ একাধিক হাই-প্রোফাইল ব্যক্তি ও প্রশাসনিক কর্তার। পুরো ঘটনাকে কেন্দ্র করে এই মুহূর্তে সারা দেশের রাজনীতি এবং বিনোদন জগতে মারাত্মক শোরগোল পড়ে গিয়েছে।
সিবিআই সূত্রে খবর, দিশার বাবা সতীশ সালিয়ানের রিট পিটিশন এবং তাঁর সম্প্রতি দেওয়া বয়ানের ভিত্তিতেই মামলাটির এই নাটকীয় মোড়। ২০২০ সালের ৮ জুন মুম্বইয়ের মালাডের একটি বহুতলের ১৪ তলা থেকে পড়ে গিয়ে মৃত্যু হয় দিশা সালিয়ানের। তার ঠিক কয়েক দিনের মাথায়, ১৪ জুন বান্দ্রার ফ্ল্যাট থেকে উদ্ধার হয় সুশান্ত সিং রাজপুতের দেহ।
তৎকালীন মুম্বই পুলিশ দিশার মৃত্যুকে 'অপমৃত্যু' (এডিআর) বলে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করলেও, শুরু থেকেই পরিবার ও সাধারণ মানুষের মনে নানা প্রশ্ন জাগছিল। সম্প্রতি দিশার বাবা সিবিআই-এর কাছে দেওয়া বয়ানে অভিযোগ তোলেন যে, তাঁর মেয়েকে গণধর্ষণ ও হত্যা করা হয়েছিল এবং সেই সত্যকে ধামাচাপা দিতে তৎকালীন রাজ্য সরকার ও পুলিশ প্রশাসন যৌথভাবে প্রমান লোপাট করে।
হাইকোর্টের নির্দেশে সিবিআই এখন খুন, গণধর্ষণ, অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র, প্রমাণ লোপাট এবং সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার সংক্রান্ত ধারায় মামলা রুজু করে তদন্তে নেমেছে। এফআইআরে স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে, তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী উদ্ধব থাকরে ও আদিত্য থাকরে পুরো ষড়যন্ত্র এবং মূল অপরাধীদের বাঁচানোর কভার-আপে প্রধান ভূমিকা নিয়েছিলেন।
সিবিআই-এর নথিতে আরও যাদের নাম রয়েছে, তা এক কথায় স্তম্ভিত করার মতো। অভিযুক্তদের তালিকায় আদিত্য থাকরের নিরাপত্তারক্ষীদের পাশাপাশি নাম উঠেছে তৎকালীন বিতর্কিত মুম্বই পুলিশ অফিসার শচীন ওয়াজে, প্রাক্তন পুলিশ কমিশনার পরমবীর সিং, ডিসিপি বিশাল ঠাকুর, মহারাষ্ট্রের প্রাক্তন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অনিল দেশমুখের।
এ ছাড়া কালিনা ফরেনসিক ল্যাবের কর্মকর্তা, ময়নাতদন্তে দেরি করা ডাক্তারদের দল, মালাড থানার তৎকালীন দায়িত্বপ্রাপ্ত অফিসার এবং ওই আবাসন চত্বরের নিরাপত্তারক্ষীদের ভূমিকাও সিবিআই-এর আতশিকাচের নিচে আনা হয়েছে। তদন্তকারী সংস্থার দাবি, সরকারি ক্ষমতার বিপুল অপব্যবহার করে কেস ডায়েরি, ফাইল এবং গুরুত্বপূর্ণ নথি গায়েব ও তৈরি করা হয়েছিল।
দীর্ঘ ৬ বছর ধরে মুম্বই পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে বম্বে হাইকোর্টও তীব্র ভর্ৎসনা করেছে। বিচারাধীন বেঞ্চ প্রশ্ন তোলে, পরিবারকে কেন পাঁচ-ছয় বছর ধরে ময়নাতদন্তের রিপোর্ট ও প্রাথমিক তথ্যের কপি দেওয়া হয়নি? আদালত স্পষ্ট জানায়, মুম্বই পুলিশের তদন্তে জবাবের চেয়ে প্রশ্ন বেশি তৈরি হয়েছে এবং সেখানে স্পষ্ট গরমিল নজর এড়ায়নি।
সিবিআই-এর এই কড়া পদক্ষেপে সুবিচারের আলো দেখছেন দিশার পরিবার এবং সুশান্ত সিং রাজপুতের অনুগামীরা। দিশার বাবা সতীশ সালিয়ান প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, সত্যকে হয়তো সাময়িকভাবে চেপে রাখা যায়, কিন্তু পরাজিত করা যায় না।
ঈশ্বরের কৃপায় বিচার প্রক্রিয়া এবার সঠিক পথে এগোবে। অন্য দিকে সুশান্তের বোন শ্বেতা সিং কীর্তি সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজের উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে লিখেছেন, এই নতুন তদন্তের মাধ্যমে অবশেষে সুশান্ত ও দিশা দুই পরিবারের কাছেই সত্য উদঘাটিত হবে এবং কোটি কোটি মানুষের অপেক্ষার অবসান ঘটবে।
সুশান্তের মৃত্যুর কয়েক দিন আগের এই ঘটনা যে কেবল সাধারণ কোনো দুর্ঘটনা ছিল না, বরং তার পেছনে যে কোনো প্রভাবশালী চক্রের হাত ছিল, তা সিবিআই-এর এফআইআরের পরিধি দেখলেই স্পষ্ট বোঝা যায়।
রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে যেভাবে প্রশাসনিক কলকাঠি নাড়া হয়েছিল বলে অভিযোগ, সিবিআই এবার তার রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে সত্য সামনে আনতে মরিয়া। সুশান্ত হত্যা রহস্য ও দিশা কাণ্ডে এই নতুন চার্জ ও সিবিআই-এর জাল বিস্তার আগামী দিনে কোন কোন প্রভাবশালীকে শ্রীঘরে পাঠায়, সেদিকেই এখন তাকিয়ে গোটা দেশ।

সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন