গাইঘাটা: রাজ্যে পালাবদলের পর আর্থিক দুর্নীতি থেকে শুরু করে নানা অভিযোগে একাধিক তৃণমূল নেতা, প্রাক্তন মন্ত্রী ও বিধায়ক শ্রীঘরে গিয়েছেন। এবার সেই তালিকায় যুক্ত হলো আরও এক পরিচিত নাম।
গোপালনগর থানার পুলিশের হাতে বেআইনি আগ্নেয়াস্ত্র-সহ গ্রেফতার হলেন বনগাঁর প্রভাবশালী মতুয়া নেতা তথা প্রাক্তন বিধায়ক বিশ্বজিৎ দাস। সোমবার দুপুরে গাইঘাটা লাগোয়া বনগাঁর গোপালনগর বাজার এলাকায় তাঁর গাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে এই বেআইনি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করে পুলিশ। বিষয়টি জানাজানি হতেই রাজ্য রাজনীতি ও মতুয়া মহাসঙ্ঘের রাজনৈতিক মহলে জোর চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে।
পুলিশ সূত্রে খবর, সোমবার দুপুরে গোপালনগর থানার পুলিশ গোপন সূত্রে খবর পায় যে প্রাক্তন বিধায়কের কাছে বেআইনি আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে। খবর পাওয়া মাত্রই গোপালনগর বাজার এলাকায় বিশ্বজিৎ দাসের গাড়িটি আটকায় পুলিশ বাহিনী।
তাঁকে নামিয়ে গাড়ির ভিতরে জোরদার তল্লাশি চালানো হয়। তল্লাশিতেই উদ্ধার হয় একটি বেআইনি আগ্নেয়াস্ত্র। ওই আগ্নেয়াস্ত্র কোথা থেকে এল এবং গাড়িতে কেন রাখা ছিল, পুলিশের এই প্রশ্নের কোনও সদুত্তর দিতে পারেননি তৃণমূলের প্রাক্তন এই জেলা সভাপতি।
এরপরই তাঁকে আটক করে গোপালনগর থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। গাড়িটিকেও বাজেয়াপ্ত করা হয়। থানায় নিয়ে গিয়ে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের পর বিকেলে তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেফতার করে বনগাঁ জেলা পুলিশ। বনগাঁ পুলিশ জেলার সুপার বিদিশা কলিতা দাশগুপ্ত জানান, নির্দিষ্ট অভিযোগ ও তথ্যের ভিত্তিতেই প্রাক্তন বিধায়ককে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং ঘটনাটির পূর্ণাঙ্গ তদন্ত চলছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বজিৎ দাসের এই গ্রেফতারি কেবল একটি অপরাধমূলক ঘটনাই নয়, এর পেছনে লুকিয়ে রয়েছে গভীর রাজনৈতিক টানাপোড়েন। বনগাঁ উত্তর কেন্দ্রের দু’বারের বিধায়ক ছিলেন বিশ্বজিৎ। ২০১১ ও ২০১৬ সালে ঘাসফুল চিহ্নে জিতলেও ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তিনি বিজেপিতে চলে যান।
কিন্তু বিধায়ক হওয়ার কিছু দিনের মধ্যেই আবার ঘরে ফেরেন এবং ২০২৪ সালে তাঁকে বনগাঁ সাংগঠনিক জেলার তৃণমূল সভাপতির দায়িত্ব দেওয়া হয়। ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনে লড়তে বিধায়ক পদে ইস্তফা দিলেও বিজেপির শান্তনু ঠাকুরের কাছে তিনি পরাজিত হন। পরবর্তীতে বিধানসভা উপনির্বাচনেও বিজেপি প্রার্থী অশোক কীর্তনীয়ার কাছে হেরে যান এই মতুয়া মুখ।
ভোটের ধাক্কার পর থেকেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মূল তৃণমূল শিবিরের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল বিশ্বজিতের। সম্প্রতি তিনি বিধানসভায় গিয়ে বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাঁকেই ‘আমার নেতা’ বলে সম্বোধন করেছিলেন এবং ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন ‘গণতান্ত্রিক তৃণমূল কংগ্রেস’ শিবিরে নাম লিখিয়েছিলেন।
বিশ্বজিতের গ্রেফতারির পর হাবড়ার বিজেপি বিধায়ক দেবদাস মণ্ডল কটাক্ষ করে বলেন, “ওর আরও আগে গ্রেফতার হওয়া উচিত ছিল। পুলিশ অনেক দেরি করল। বিধায়ক ও জেলা সভাপতি থাকাকালীন প্রচুর মানুষের ওপর অত্যাচার ও বোমা-গুলির রাজনীতি করেছে সে।”
অন্যদিকে, ঘটনাটি নিয়ে মমতা তৃণমূল কিংবা ঋতব্রত তৃণমূলের পক্ষ থেকে কোনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া মেলেনি। রাজনৈতিক শিবিরের এই ঘনঘন পরিবর্তনের আবহেই বেআইনি অস্ত্র মামলায় এই মতুয়া নেতার গ্রেফতারি সীমান্ত জেলা উত্তর ২৪ পরগনার রাজনীতিকে নতুন করে উত্তপ্ত করে তুলল।

সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন