আবু ধাবি: মাথার পেছনে একের পর এক কুঠারের কোপ, ঝাপসা হয়ে আসা দৃষ্টিশক্তি আর হু-হু করে হাজার হাজার ফুট নিচে নেমে আসা বিমান। তার মাঝেই একলব্য এক লড়াই। মৃত্যুর মুখ থেকে ফ্লাইদুবাইয়ের বিজি-১০৭৩ বিমান এবং ১৭৪ জন যাত্রীকে ছিনিয়ে এনেছিলেন ভারতীয় ক্যাপ্টেইন স্মিত মচ্ছর।
সংযুক্ত আরব আমিরশাহির (ইউএই) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মুম্বইয়ের ঘাটকোপারের বাসিন্দা এই চালক এবার নিজের জবানবন্দিতে শোনালেন সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা। ইজরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সে কথা বলার সময় স্মিত ফাঁস করলেন, কী ভাবে কেবল প্রার্থনার বাহানা করে তাঁর সহ-পাইলট তাঁর উপর প্রাণঘাতী হামলা চালিয়েছিল।
ঘটনার দিন দুবাই থেকে তেল আবিবগামী বিমানটি যখন শূন্যে ভাসছিল, তখন সব কিছুই স্বাভাবিক ছিল। হঠাৎই ওমানি কো-পাইলট হামাম আল-হামামি জানায়, সে ককপিটে একটু প্রার্থনা করবে। স্মিতের কথায়, "উপসাগরীয় অঞ্চলের পাইলটদের মধ্যে ওড়ার মাঝে প্রার্থনা করা খুব সাধারণ ঘটনা। সৌজন্য ও শ্রদ্ধার খাতিরে আমি আর পেছনের দিকে তাকাইনি। সোজাসুজি সামনের উইন্ডস্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে বিমান চালাচ্ছিলাম। কিন্তু ঠিক চার-পাঁচ মিনিট পরেই মাথার পেছনে আছড়ে পড়ল এক প্রচণ্ড আঘাত।" প্রথমটায় স্মিত ভেবেছিলেন বিমানে হয়তো কোনও বিপর্যয় ঘটেছে। কিন্তু পর পর কুঠারের কোপ পড়তে থাকায় তিনি বুঝে যান, বিপদ আকাশ থেকে আসেনি, এসেছে ককপিটের ভেতর থেকেই।
আক্রমণের ধাক্কায় স্মিতের দৃষ্টিশক্তি প্রায় পুরোপুরি ঝাপসা হয়ে গিয়েছিল। সেই অবস্থাতেই তিনি বুঝতে পারেন বিমানটি তীব্র গতিতে নিচের দিকে নেমে যাচ্ছে। ককপিটে জখম অবস্থায় শুয়ে শুনতে পাচ্ছিলেন বিমানের গায়ে তীব্র বাতাসের গর্জন আর যাত্রীদের বুকফাটা আর্তনাদ।
কিন্তু হারের পাত্র ছিলেন না বছর ৩৫-এর এই ভারতীয় পাইলট। তিনি বলেন, "প্রথমবার রক্তাক্ত অবস্থায় উঠে দাঁড়িয়ে কোনও মতে ককপিটের দরজাটা খুলেছিলাম। কিন্তু কো-পাইলট ছুটে এসে আবার সেটা বন্ধ করে দেয়। আমি ককপিটের মেঝেতে লুটিয়ে পড়ি। তখন মনে হয়েছিল, আর একটা সুযোগই আমার হাতে আছে। আমি যদি এখন চেষ্টা না করি, তবে আমি তো মরবই, বাকিদেরও বাঁচাতে পারব না।"
নিজের শেষ শক্তিটুকু নিংড়ে দিয়ে জীবনের চূড়ান্ত লড়াইটা লড়েন স্মিত। কুঠারবিদ্ধ অবস্থাতেই দ্বিতীয়বার ককপিটের দরজার দিকে ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং লক খুলে দিতে সক্ষম হন। বাইরে কেবিনে দরজার জন্য অপেক্ষা করছিলেন কয়েক জন ক্ষুব্ধ ও সাহসী যাত্রী।
দরজা খোলামাত্রই ইজরায়েলি যাত্রী এবং কেবিন ক্রুরা ককপিটে ঢুকে পড়ে এবং ওমানি চালককে আক্রমণ করে তাকে পরাস্ত করে। মুহূর্তের মধ্যে আবার বিমানের নিয়ন্ত্রণ ফিরে আসে এবং একটি বড়সড় বিমান দুর্ঘটনা তথা সম্ভাব্য জঙ্গি হামলা প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়।
ঘটনার পর দ্রুত বিমানটিকে সৌদি আরবের বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করানো হয় এবং পরবর্তীতে আহত স্মিতকে চিকিৎসার জন্য নিয়ে আসা হয় আবু ধাবিতে। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী স্বয়ং ফোন করে স্মিতের সাহসিকতা ও অসামান্য মানসিক বলের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।
নেতানিয়াহু তাঁকে "ভারত, ইজরায়েল তথা বিশ্বমানবতার নায়ক" বলে অভিহিত করেছেন এবং তেল আবিবের স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে স্মিত ও মোদীকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। অন্যদিকে, হামাম আল-হামামির কট্টরপন্থী মনোভাবের খবর আগেই ছিল বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের সূত্রে জানা যাচ্ছে। কিন্তু সেই আতঙ্ক ও রক্তস্নাত অধ্যায় পেরিয়ে বিশ্ব আজ সম্মান জানাচ্ছে এক ভারতীয় পাইলটের অদম্য সংকল্পকে, যিনি নিজের প্রাণ বাজি রেখে ককপিটের দরজা খুলে হাজারও জীবনকে নয়া আলো দেখিয়েছেন।

রোববার, ০৪ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৪ অক্টোবর ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন