কলকাতা: এটা ব্রাজিল! না ‘শান্তিগোপাল’।
শনিবাসরীয় যুবভারতী পরবর্তী সময়ে এটাই প্রশ্ন সবচেয়ে বড় ব্রাজিল সমর্থকদের শহর কলকাতার। যারা সাম্বার ছোঁয়া দেখার জন্য রাতের পর রাত জেগে থাকে, তাঁরাই হতাশ কার্লো অ্যালচেলোত্তির এই ব্রাজিলকে দেখে। তাঁদের প্রশ্ন যে দলের কোচ ভারতের ফুটবল সংস্কৃতি নেই বলে প্রশ্ন তোলেন, তাঁর দলে ফুটবল সংস্কৃতি যে তলানিতে এসে ঠেকেছে, সেটা কী বুঝতে পারছেন।
অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে একটি ম্যাচে হারতে হারতে ড্র। দ্বিতীয় ম্যাচে দু গোলে পিছিয়ে থেকে জয়। চুম্বকে এই পারফরম্যান্স নিয়েই কলকাতায় এসেছিল পাঁচ বারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। কিন্তু ৯০ মিনিটের ম্যাচে প্রথম ৬০ মিনিট যুবভারতী দেখল এক অন্য ভারতীয় ফুটবল।
খালিদ জামিলের স্ট্র্যাটেজিতে সাম্বাবাহিনীকে রীতিমতো চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিল মনবীর সিং, আনোয়ার আলিরা। শেষ পর্যন্ত ৪-০ গোলে ব্রাজিল জিতলেও কলকাতার মাঠ থেকে তারা ছড়াল শুধুই হতাশা। প্রাক্তনদের স্পষ্ট বক্তব্য, এই ব্রাজিলের কিস্যু নেই! বরং ইউরোপীয় ফুটবলকে নকল করতে গিয়ে তাদের কাছে আরও দূরহ দেখাচ্ছে বিশ্বকাপ।
গত কয়েক বছরে ব্রাজিলীয় ফুটবলের এই ধ্বংসের নেপথ্যে রয়েছে ইউরোপীয় ফুটবলকে অন্ধভাবে নকল করা। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আর্জেন্টিনার ফুটবলাররাও ইউরোপে খেলেন, কিন্তু তাঁরা নিজেদের নিজস্ব স্বকীয়তা ও ঘরানা বিসর্জন দেননি। এমনটাই মত প্রাক্তনদের।
ব্রাজিল সেখানেই সবচেয়ে বড় ভুলটি করেছে। নিজস্ব সাম্বা ছন্দ হারিয়ে তারা এখন ইউরোপের দিশাহীন কপির সমাহার। আরও বড় অসংগতি ব্রাজিল ফুটবল ফেডারেশনের ভুল কোচ নির্বাচন। কার্লো অ্যানচেলোত্তিকে উদ্ধারকর্তা করে আনা হলেও পরিসংখ্যান ও বাস্তব বলছে অন্য কথা।
২০০২ সালে দক্ষিণ কোরিয়াকে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে তোলা ছাড়া বিশ্ব ফুটবলে জাতীয় দলের কোচ হিসেবে তাঁর উল্লেখ করার মতো সাফল্য কোথায়? যুবভারতীতে ভারতের বিরুদ্ধে খেলেও তিনি বুঝে উঠতে পারলেন না ব্রাজিলের আসল গলদ কোথায়।
ম্যাচের আগে 'ভারতে ফুটবল সংস্কৃতি নেই' বলে তাচ্ছিল্য করা অ্যানচেলোত্তি খেলা শেষে অবশ্য সুর বদলাতে বাধ্য হলেন। ভারতের লড়াকু মানসিকতা এবং গতিময় কাউন্টার অ্যাটাকের প্রশংসা করে তিনি মানলেন, "ভারত নিজেদের মতো খুব ভাল খেলেছে। যেমন শক্ত রক্ষণ, তেমনই ধারালো প্রতি-আক্রমণ। আমাদের প্রথম গোলটি তুলতেই যথেষ্ট কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে।"
কিন্তু আড়ালে ঢেকে রাখা গেল না সেলেকাওদের কঙ্কালসার চেহারা। নিজেদের সেরাটা না দিয়ে জয় পেলেও ব্রাজিলের খেলায় সেই পুরনো ধার, ছন্দ বা দূরদর্শিতা বিন্দুমাত্র ছিল না। কলকাতা আরও বিরক্ত ভিনিসিয়াস জুনিয়রের পারফরম্যান্সকে নিয়ে। সমর্থকদের প্রশ্ন, কেন মাত্র ৪৫ মিনিটের মাঠে নামান হল ভিনিকে ?
অন্যদিকে, ব্রাজিলের এই অগোছালো ভাবমূর্তির উল্টো পিঠে উজ্জ্বল ভারতের লড়াই। গুরপ্রীত সিং সান্ধুর পর পর দুটি ক্ষমার অযোগ্য ভুলে প্রথমার্ধে জোড়া গোল হজম করতে হয়েছিল ভারতকে। তবে ম্যাচ শেষে দলের এক নম্বর গোলকিপারকে একক ভাবে বলির পাঁঠা না বানিয়ে আগলে রাখেন কোচ খালিদ জামিল। দ্বিতীয়ার্ধে প্রভসুখন সিং গিলকে নামিয়ে সাহসের পরিচয় দেন কোচ।
রক্ষণে আনোয়ার আলি ঠান্ডা মাথায় ডিফেন্স সামলালেন, আকাশ মিশ্র সঙ্গ দিলেন নিখুঁতভাবে। বিরতির আগে ও পরে মনবীর সিং এবং রায়ান উইলিয়ামস অন্তত দুটি নিশ্চিত গোলের সুযোগ তৈরি করেছিলেন। পরিসংখ্যান বলছে, ভারত সাতটি শট মেরেছে, যার মধ্যে দুটি ছিল টার্গেটে।
ম্যাচ শেষে অ্যানচেলোত্তি নিজে খালিদকে জড়িয়ে ধরে বলে গিয়েছেন, "তোমরা বেশ ভাল খেলেছ, এ ভাবেই এগিয়ে যাও।" তবে বিশ্বফুটবলের বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্রাজিল দলটির মধ্যে কোনও ভবিষ্যৎ নেই।
তরুণদের সুযোগ দেওয়ার নাম করে অ্যানচেলোত্তি যে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাচ্ছেন, তা ব্রাজিলের গৌরবোজ্জ্বল অতীতকে আরও বেশি আঁধারে ঠেলে দিচ্ছে। নিজেদের ভুল শুধরে জাদুকরী ফুটবল ফিরিয়ে আনতে না পারলে, আগামী দুই দশকেও ব্রাজিলের বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন স্রেফ অলীক কল্পনা হয়েই থেকে যাবে।

রোববার, ০৪ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৪ অক্টোবর ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন