সিউড়ি: চব্বিশের লোকসভার পর ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচনে রাজ্যে ঐতিহাসিক পালাবদলের পর থেকেই বাংলার রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সমীকরণ প্রতিনিয়ত ভোলবদল করছে। একদা রাজ্যের মসনদে থাকা তৃণমূল কংগ্রেস এখন বিরোধী আসনে বসার পর সেখানেও চরম ফাটল দেখা দিয়েছে। দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও সেকেন্ড-ইন-কম্যান্ড অভিষেকের বিরুদ্ধে কার্যত বিদ্রোহ ঘোষণা করে দলের অন্দরেই ‘হাঁড়ি আলাদা’ করেছেন বিধায়কদের একাংশ। আর এই নজিরবিহীন রাজনৈতিক ডামাডোলের সরাসরি প্রভাব পড়েছে কেষ্ট-হীন বীরভূম জেলার রাজনীতিতেও।
[TECHTARANGA-POST:9793]
যেখানে সরকারি পালাবদলের পর তৃণমূলের একাধিক প্রাক্তন মন্ত্রী ও বিধায়কদের নিরাপত্তা একে একে প্রত্যাহার করে নেওয়া হচ্ছে, সেখানে বীরভূমের ক্ষেত্রে দেখা গেল সম্পূর্ণ উলটপুরাণ। ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘ভালো তৃণমূল’ শিবিরকে সমর্থনের পুরস্কার হিসেবে জেলার পাঁচ হেভিওয়েট বিধায়কের নিরাপত্তা একধাক্কায় অনেকটাই বাড়িয়ে দিল নতুন রাজ্য সরকার।
ছাব্বিশের মহারণে রাজ্যের ২৯৪টি আসনের মধ্যে মাত্র ৮০টি আসনেই কোনোমতে ঘাসফুল ফোটাতে পেরেছে তৃণমূল কংগ্রেস। খোদ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে শুরু করে দলের তাবড় তাবড় নেতাদের সিংহভাগই ধরাশায়ী হয়েছেন। কিন্তু ভোটের এই ভরাডুবির পর তৃণমূলের ভেতরের ফাটল আরও চওড়া হয়েছে। দলবিরোধী আচরণের জন্য ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ও সন্দীপন বন্দ্যোপাধ্যায়রা মূল তৃণমূল থেকে বাদ পড়তেই ক্ষুব্ধ বিধায়কদের একটা বড় অংশ ‘ভালো তৃণমূল’ নামের নতুন শিবিরে নাম লিখিয়েছেন।
[TECHTARANGA-POST:9784]
পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, এই ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে ৫৮ জনই ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিধানসভার বিরোধী দলনেতা হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে সমর্থন জানিয়ে দেন। আর এই ঋতব্রতকে সমর্থনকারী বিদ্রোহী বিধায়কদের তালিকাতেই রয়েছেন বীরভূমের পাঁচজন। প্রশাসন সূত্রে খবর, এই আনুগত্য দেখানোর পরপরই বীরভূম জেলা পরিষদের সভাধিপতি তথা হাঁসনের বিধায়ক কাজল শেখ, বোলপুরের বিধায়ক তথা প্রাক্তন মন্ত্রী চন্দ্রনাথ সিনহা, নলহাটির রাজেন্দ্রপ্রসাদ সিং, মুরারইয়ের মোশারফ হোসেন এবং নানুরের বিধায়ক বিধানচন্দ্র মাঝির নিরাপত্তা একধাক্কায় বৃদ্ধি করা হয়েছে। এখন থেকে এই পাঁচজনের প্রত্যেকের সাথেই অতিরিক্ত দু’জন করে সশস্ত্র নিরাপত্তারক্ষী মোতায়েন থাকবে।
বিধানসভায় ভরাডুবির পর যেভাবে তৃণমূলের পরিষদীয় দলে এই বিশাল ভাঙন ধরেছে, তাতে ঘুম উড়েছে কালীঘাটের। তবে এখানেই শেষ নয়, রাজনৈতিক মহলে কান পাতলে এখন শোনা যাচ্ছে যে, এবার সংসদীয় দলেও ভাঙন ধরা স্রেফ সময়ের অপেক্ষা। জোর গুঞ্জন, লোকসভার দুই-তৃতীয়াংশ সাংসদও এবার মমতা-অভিষেকের নেতৃত্ব অস্বীকার করে মূল তৃণমূল থেকে বেরিয়ে যেতে চলেছেন। বাংলায় ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে যে ঐতিহাসিক বিদ্রোহের সূচনা হয়েছে, ঠিক একই ধাঁচে এবার দিল্লিতেও তৃণমূলের অন্দরে বড়সড় বিদ্রোহের সলতে পাকানো শুরু হয়েছে, যার মূলে রয়েছেন কাকলি ঘোষ দস্তিদারের মতো প্রবীণ সাংসদেরা। ফলে রাজ্য হাতছাড়া হওয়ার পর এবার নিজেদের সাংসদদের ধরে রাখাই ঘাসফুল শিবিরের কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
Leave a comment