নয়াদিল্লি: আঁধার রাতে শ্রীহরিকোটার আকাশ চিরে গর্জে উঠল ভারতের মহাশূন্যের নতুন রূপকার। মহাকাশ গবেষণার আঙিনায় আরও এক সোনার পাতায় নাম লিখিয়ে স্বদেশি প্রযুক্তিকে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিল ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা (ইসরো)।
শুক্রবার গভীর রাতে অন্ধ্রপ্রদেশের সতীশ ধাওয়ান স্পেস সেন্টারের দ্বিতীয় লঞ্চ প্যাড থেকে সফলভাবে উৎক্ষেপণ করা হল দ্বিতীয় প্রজন্মের নেভিগেশন স্যাটেলাইট সিরিজের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৃত্রিম উপগ্রহ ‘এনভিএস-০৩’ (NVS-03)।
মহাকাশে এই উপগ্রহকে নির্দিষ্ট কক্ষপথে পৌঁছে দেওয়ার ঐতিহাসিক দায়িত্ব নিখুঁতভাবে পালন করেছে ইসরোর নির্ভরযোগ্য রকেট ‘জিএসএলভি-এফ১৮’ (GSLV-F18)। মহাকাশবিজ্ঞানীদের এই অভাবনীয় সাফল্যে উচ্ছ্বসিত গোটা দেশ।
শনিবার ভোরেই সোশাল মিডিয়ায় বিজ্ঞানিদের আন্তরিক অভিনন্দন জানানোর পাশাপাশি ভারতের নিজস্ব জিপিএস ব্যবস্থা ‘নেভিক’ (NavIC)-এর শক্তিবৃদ্ধির বার্তা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।
ইসরো সূত্রে জানা গিয়েছে, শুক্রবার রাত ঠিক ১১টা ৫১ মিনিটে শ্রীহরিকোটার উপকূলীয় আকাশ লাল আলোয় ভাসিয়ে উৎক্ষেপণ করা হয় ২২৫০ কেজি ওজনের এই সুবিশাল স্যাটেলাইটটি। এই জিএসএলভি রকেটের ২০তম সফল উড়ান।
উৎক্ষেপণের ঠিক ২০ মিনিটের মাথায় রকেটের মূল পে-লোড থেকে আলগোছে আলাদা হয়ে যায় এনভিএস-০৩ এবং নিখুঁতভাবে পৌঁছে যায় তার নির্ধারিত ‘জিওসিনক্রোনাস ট্রান্সফার অরবিট’-এ (GTO)। নিয়ন্ত্রণ কক্ষে বসে এই ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী থাকার পর আনন্দিত ইসরোপ্রধান ডক্টর ভি নারায়ণন মিশন সফল বলে ঘোষণা করেন। এই অভাবনীয় সাফল্যের পথপ্রদর্শক বিজ্ঞানী, প্রযুক্তিবিদ এবং যন্ত্রাংশ তৈরির সঙ্গে যুক্ত দেশীয় সংস্থাগুলির কর্মীদের প্রশংসায় ভরিয়ে দেন তিনি।
ভারতের মহাকাশ গবেষণার ইতিহাসে এই দিনটি এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল। কৃত্রিম উপগ্রহের মাধ্যমে দিকনির্ণয় বা ‘পজিশনিং, নেভিগেশন অ্যান্ড টাইমিং’ ব্যবস্থার ক্ষেত্রে এতদিন বিশ্বজুড়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জিপিএস প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা ছিল প্রবল।
কিন্তু কৌশলগত, সামরিক ও সাধারণ নাগরিক পরিষেবার স্বার্থে ভারত নিজস্ব প্রযুক্তি ‘নেভিগেশন উইথ ইন্ডিয়ান কনস্টেলেশন’ বা ‘নেভিক’ তৈরি করে। সেই নেভিক ব্যবস্থার ক্ষমতাকে বহু গুণে বাড়িয়ে তুলতে এবং সিগন্যালকে আরও স্পষ্ট ও নিরবচ্ছিন্ন করতে দ্বিতীয় প্রজন্মের নেভিগেশন সিরিজের এই তৃতীয় স্যাটেলাইট এনভিএস-০৩ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বেসামরিক ও বাণিজ্যিক দিকনির্দেশের পাশাপাশি দেশের নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও এই উপগ্রহ গেমচেঞ্জারের ভূমিকা নিতে চলেছে।
বিজ্ঞানীদের এই অসাধারণ কৃতিত্বকে কুর্নিশ জানিয়ে শনিবার সকালে এক্স হ্যান্ডেলে একটি বিশেষ পোস্ট করেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। তিনি লেখেন, ‘‘এনভিএস-০৩-কে বহনকারী জিএসএলভি-এফ১৮-এর সফল উৎক্ষেপণের জন্য আমাদের বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তিবিদদের অভিনন্দন। এই মিশন আমাদের নিজস্ব স্যাটেলাইট দিকনির্ণয় ব্যবস্থা ‘নেভিক’-কে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অত্যাধুনিক ক্ষমতাসম্পন্ন এনভিএস-০৩ স্যাটেলাইট জটিল প্রযুক্তির ক্ষেত্রে আমাদের স্বনির্ভর হওয়ার প্রচেষ্টাকে অনেকটা এগিয়ে দেবে। দেশজুড়ে সাধারণ মানুষ উপকৃত হবেন এর ফলে। এ দেশের মহাকাশবিজ্ঞানীদের নিষ্ঠা ও উদ্ভাবনী শক্তি আমাদের দেশকে বারবার গর্বিত করে চলেছে।’’
বিশ্ব রাজনীতি ও প্রযুক্তির আঙিনায় স্যাটেলাইট নির্ভর নেভিগেশন ব্যবস্থা এখন যে কোনও দেশের সার্বভৌমত্বের অন্যতম হাতিয়ার। ভারতের এই স্বনির্ভরতার পদক্ষেপকে তাই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক মহাকাশ বিশেষজ্ঞরা।
একদিকে শত্রুপক্ষের নজরদারি এড়িয়ে ভারতীয় বাহিনীর নিখুঁত দিকনির্ণয়, অন্যদিকে আপামর দেশবাসীর মোবাইলে আরও দ্রুত ও নির্ভুল ম্যাপ ও জিপিএস পরিষেবা পৌঁছ দেওয়া— উভয় ক্ষেত্রেই নতুন দিগন্ত খুলে দিল এনভিএস-০৩। সব মিলিয়ে, দেওয়ালির আবহে শ্রীহরিকোটার মাটি থেকে ইসরোর এই মহাজাগতিক সাফল্য ভারতীয় বিজ্ঞানের বিজয়রথকে আরও এক ধাপ এগিয়ে দিল।
Leave a comment