ওয়াশিংটন: আটলান্টিকের ওপারে মধ্যবর্তী নির্বাচনে ক্যাপিটল হিল জুড়ে ফের স্পষ্ট প্রবাসী ভারতীয়দের জয়জয়কার। ডোনাল্ড ট্রাম্পের গড়ে থাবা বসিয়ে মার্কিন হাউস অফ রিপ্রেজেন্টেটিভসে ইতিহাস গড়লেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত ডেমোক্র্যাট প্রার্থী পিয়া কিংবা পিয়া দাাঁডিয়া।
অন্যদিকে, ভার্জিনিয়া থেকে দ্বিতীয়বারের জন্য হাউস অফ রিপ্রেজেন্টেটিভসে নির্বাচিত হয়ে মার্কিন আইনসভায় নিজের জমি আরও শক্ত করলেন সুহাস সুব্রহ্মণ্যম। ডেমোক্র্যাট শিবিরের এই জোড়া জয়ের দিনে মেরিল্যান্ডে নিজের আসন ধরে রেখেছেন লেফটেন্যান্ট গভর্নর অরুনা মিলারও। তবে ফলাফলের এই রাতে ফ্লপ শো রিপাবলিকান তারকা প্রার্থী বিবেক রামাস্বামীর। ওহাইওর গভর্নর পদে লড়াইয়ে নেমে ডেমোক্র্যাট প্রতিদ্বন্দ্বীর কাছে স্পষ্ট ব্যবধানে পিছিয়ে পড়েছেন তিনি।
ট্রাম্পের দুর্গ ভেঙে ফ্লোরিডায় পিয়ার ইতিহাস
আমেরিকায় দলীয় রাজনীতির হিসেব-নিকেশ বদলে সবচেয়ে বড় চমক এসেছে ফ্লোরিডার ২২ নম্বর কনগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্ট থেকে। মার-এ-লাগো অর্থাৎ প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের ফ্লোরিডার আবাসের লাগোয়া এলাকাটিতে পরিকল্পিতভাবে সীমানা পুনর্বিন্যাস (রিড্রয়িং বা রেডিস্ট্রিক্টিং) করা হয়েছিল রিপাবলিকানদের বাড়তি সুবিধা পাইয়ে দিতে।
কিন্তু সমস্ত সমীকরণ বানচাল করে ৫১.৯ শতাংশ ভোট পেয়ে শেষ হাসি হেসেছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী পিয়া দাাঁডিয়া। প্রতিদ্বন্দ্বী রিপাবলিকান প্রার্থী কেসি আসকারকে হারিয়ে প্রথমবার প্রতিনিধি সভায় পা রাখছেন হার্ভার্ডের প্রাক্তন এই পড়ুয়া।
রাজস্থানের এক অভিবাসী চিকিৎসকের কন্যা পিয়ার জীবন সফর অবশ্য বরাবরই চমকপ্রদ। ‘টিচ ফর আমেরিকা’ ভলান্টিয়ার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করে নিউ ইয়র্কের হারলেম এলাকায় পিছিয়ে পড়া পরিবারের শিশুদের জন্য স্কুল গড়েছিলেন তিনি।
পরবর্তীতে হোয়াইট হাউস ফেলোশিপ এবং বিশ্বখ্যাত অ্যাপল সংস্থায় কাজের অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। নির্বাচনে নিজের জয়ের পর আবেগে ভেসে পিয়া জানান, “মা-বাবা আমাকে শিখিয়েছিলেন সমাজকে আরও সুন্দর করে গড়ে তুলতে।”
বিপুল জনসমর্থন সঙ্গে নিয়ে মধ্যবিত্তের কর হ্রাস এবং প্রবীণদের সামাজিক সুরক্ষা বৃদ্ধির বার্তা দিয়েই মার্কিন ক্যাপিটলে ঢুকছেন তিনি। ১৯৫৬ সালে দিলীপ সিং সৌন্দের ইতিহাস গড়ার পর পিয়া হলেন মার্কিন হাউসে নির্বাচিত নবম ভারতীয় বংশোদ্ভূত জনপ্রতিনিধি।

বেঙ্গালুরু-চেন্নাই যোগ: জয়ের ধারা বজায় রাখলেন সুহাস
উত্তর ভার্জিনিয়ার ১০ নম্বর কনগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্ট থেকে ফের শেষ হাসি হেসেছেন সুহাস সুব্রহ্মণ্যম। রিপাবলিকান প্রার্থী ডেভ বেকউইথকে ৬১.৪ শতাংশ ভোটে হারিয়ে দ্বিতীয় মেয়াদের জন্য কংগ্রেস সদস্য নির্বাচিত হলেন তিনি।
সুহাসের পারিবারিক শিকড় গভীরভাবে জড়িয়ে ভারতের সঙ্গে। তাঁর মা বেঙ্গালুরুর এবং বাবা চেন্নাই ও সিকান্দরাবাদের সন্তান। পারিবারিক ইতিহাস টেনে সুহাস আগেই জানিয়েছিলেন, ১৯৭৯ সালে তাঁর মা যখন ডালস বিমানবন্দরে নেমেছিলেন, সেটাই ছিল তাঁদের কাছে স্বপ্নের আমেরিকা ছোঁয়ার ‘এলিস আইল্যান্ড’। প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার প্রযুক্তি উপদেষ্টা থেকে জরুরি পরিষেবা কর্মী (ইএমটি) হিসেবে কাজ করা সুহাস ২০১৯ সালে প্রথম ভারতীয় আমেরিকান হিসেবে ভার্জিনিয়া অ্যাসেম্বলিতে জেতেন।
ক্যাপিটল হিলে প্রবেশের পর থেকেই এইচ-১বি (H-1B) ভিসা সংস্কার এবং ভারতীয় পেশাদারদের স্বার্থরক্ষায় সরব ভূমিকা নিয়েছেন সুহাস। ট্রাম্প প্রশাসনের লাখ টাকার অতিরিক্ত ভিসা ফি চাপানোর সিদ্ধান্তকে প্রকাশ্যেই “অর্থনৈতিক তোঘলকি” বলে তীব্র তোপ দাগেন তিনি। পুনর্নির্বাচিত হয়েই সোশাল মিডিয়ায় তাঁর অঙ্গীকার, “প্রচার পর্ব শেষ, এবার ওয়াশিংটনে কাজ শুরু করার পালা।”
জয়যাত্রায় অরুনা, ওহাইওতে ধাক্কা বিবেকের
ডেমোক্র্যাট শিবিরের জয়ের জোয়ার বজায় থেকেছে পাশের রাজ্য মেরিল্যান্ডেও। গভর্নর ওয়েস মোরের সঙ্গেই দ্বিতীয়বারের জন্য লেফট্যানেন্ট গভর্নর পদে নিজেদের আসন নিশ্চিত করেছেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত অরুনা মিলার।
তবে ডেমোক্র্যাটদের উদ্যাপনের মাঝে ঘোর দুশ্চিন্তায় রিপাবলিকান শিবিরের ভারতীয় মুখ বিবেক রামাস্বামী। ওহাইওর গভর্নর পদের হাই-প্রোফাইল লড়াইয়ে ট্রাম্পের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এই বায়োটেক শিল্পপতি পিছিয়ে পড়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী অ্যামি অ্যাক্টনের থেকে। গণনা যত এগিয়েছিল, রিপাবলিকান প্রার্থীর জয়ের পথ ততই কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। অন্যদিকে উত্তর ক্যারোলিনায় ভারতীয় বংশোদ্ভূত রিপাবলিকান মহেশ ‘ম্যাক্স’ গানোরকারও বড় ব্যবধানে হেরে গিয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থীর কাছে।
সব মিলিয়ে, এই মধ্যবর্তী নির্বাচনে মার্কিন সেনেট ও হাউসের ক্ষমতার রাশ কার হাতে থাকবে তা নিয়ে চরম টানাটানি চললেও, ওয়াশিংটনের রাজনীতিতে যে ভারতীয় বংশোদ্ভূতদের প্রভাব এবং গ্রহণযোগ্যতা কয়েক গুণ বেড়ে গেল, ফলাফলের ট্রেন্ড কিন্তু সেই সাক্ষ্যই দিচ্ছে।
Leave a comment