কলকাতা: বিনিয়োগ টানতে এবং শিল্পমহলের দীর্ঘদিনের বকেয়া আস্থার সঙ্কট দূর করতে এক ঝাঁক বড় সিদ্ধান্তের পথে হাঁটছে রাজ্য সরকার। জমি অধিগ্রহণের দীর্ঘদিনের জটিলতা কাটানো, বন্ধ কারখানা ও অব্যবহৃত জমির পুনর্ব্যবহার এবং বৃহৎ লগ্নির ক্ষেত্রে ইনসেনটিভ ফেরানোর মতো একাধিক যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়ে লক্ষ্মীবারে নবান্নে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষিত হতে চলেছে রাজ্যের নতুন শিল্পনীতি। বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পমহল, সকলের নজরই এখন এই নীতিগত রূপরেখার দিকে।
ইনসেনটিভ ফেরানো ও বকেয়া মেটানোর বার্তা
তৃণমূল সরকারের শেষদিকে আইন এনে শিল্পে যে ইনসেনটিভ পলিসি বাতিল করা হয়েছিল, তা আবার সসম্মানে ফিরিয়ে আনছে বর্তমান বিজেপি সরকার। সেই সময়কার সরকারের ভুল নীতির কারণে বিনিয়োগকারীরা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন। বর্তমানে সেই বকেয়ার পরিমাণ প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা ঠেকেছে, যা নিয়ে আদালতেও মামলা চলছে। এই সমস্ত জটিলতা কাটিয়ে লগ্নিকারীদের কাছে ইতিবাচক ও সুনির্দিষ্ট বার্তা দিতেই এই নতুন নীতি আনা হচ্ছে।
শিল্পমন্ত্রী তাপস রায় স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, পূর্বের সরকারের আমলে বিনিয়োগকারীরা যে সমস্ত কারণে মুখ ফিরিয়েছিলেন, নয়া নীতিতে সেই বিষয়গুলি আমূল বদল ঘটিয়ে লগ্নির পথ সুগম করা হচ্ছে। নবান্ন সূত্রে জানা গিয়েছে, ইনসেনটিভ পাওয়ার ক্ষেত্রে কিছু নির্দিষ্ট মাপকাঠি রাখা হচ্ছে। যার মধ্যে প্রথমটি হলো লগ্নির অঙ্ক, যা কম করে ১০০ কোটি টাকা হতে হবে। দ্বিতীয়ত, শিল্পে কর্মসংস্থানের সুযোগ থাকতে হবে এবং স্থানীয়দের অগ্রাধিকার দিতে হবে।

বলপ্রয়োগ নয়, বাজারমূল্যে জমি অধিগ্রহণের নতুন পথ
শিল্পনীতির পরই পৃথক জমিনীতি ঘোষণার পথে হাঁটছে সরকার। অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্তকে মাথায় রেখে গঠিত মন্ত্রীগোষ্ঠী এর খসড়া তৈরি করছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী আগেই স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, সিঙ্গুর বা নন্দীগ্রামের মতো অতীতের মতো বলপ্রয়োগ করে জমি অধিগ্রহণ করা হবে না। তার বদলে বাজারমূল্যে জমির মালিকদের কাছ থেকে সরাসরি জমি কেনার নীতি নেওয়া হবে।
ইতিমধ্যেই সীমান্তে বিএসএফের জমি পাওয়া এবং রেল ও বিমানবন্দরের জমির সমস্যা মেটানোর এই ফর্মুলাতেই শিল্পের জট কাটানো হবে। ক্ষতিপূরণের ক্ষেত্রেও বড় পরিবর্তন এনে গ্রামীণ এলাকায় কৃষিজমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে উৎপাদন ক্ষমতা বিচার করে বাজারমূল্যের চেয়ে সর্বোচ্চ আড়াই গুণ পর্যন্ত এককালীন অর্থ মালিকের হাতে তুলে দেওয়ার ভাবনা রয়েছে। এর ফলে কৃষির ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলি আর্থিক নিরাপত্তার মুখ দেখবে।
প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পকে অগ্রাধিকার ও তিন বছরের সময়সীমা
নতুন শিল্পনীতিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), সেমিকন্ডাক্টর এবং ডেটা সেন্টারের মতো অত্যাধুনিক প্রযুক্তি-নির্ভর ক্ষেত্রগুলিকে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। শুধু তাই নয়, অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা উত্তরবঙ্গে শিল্প গড়লে লগ্নিকারীদের জন্য অতিরিক্ত ইনসেনটিভ দেওয়ার ব্যবস্থাও থাকছে।
তবে কড়াকড়িও থাকছে সমানভাবে। শিল্পের জন্য জমি বরাদ্দের পর ঠিক তিন বছরের মধ্যে সেখানে উৎপাদন প্রক্রিয়া শুরু করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কাজ শুরু না হলে সেই জমি সরকারের পক্ষ থেকে পুনরায় ফিরিয়ে নেওয়া হবে। পাশাপাশি, সিঙ্গুর, হিন্দমোটর, আসানসোল-রানিগঞ্জ, বড়জোড়া এবং হাওড়ার বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে পড়ে থাকা বন্ধ কারখানা বা অব্যবহৃত জমিও যাতে পুনরায় শিল্পকাজে ব্যবহার করা যায়, তার জন্য বিশেষ রূপরেখা থাকছে এই নয়া নীতিতে।
আরও পড়ুন: বাংলাকে লুঠেছেন মমতা! স্মৃতির অভিযোগ ওড়াল কালীঘাট
স্থানীয়দের কর্মসংস্থান ও অংশীদারিত্বের ভাবনা
নতুন শিল্পগুলিতে স্থানীয় তরুণ-তরুণীদের কাজের সুযোগ নিশ্চিত করতে বিশেষ নজর দিচ্ছে নবান্ন। শিল্পে জমিদাতাদের পরিবারের যোগ্য সদস্যদের উপযুক্ত কাজের সুযোগ করে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। সেই লক্ষ্যপূরণে সংশ্লিষ্ট শিল্পগোষ্ঠীর সঙ্গে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ এবং আর্থিক সহায়তার প্রস্তাবও রাখা হবে। ক্যাবিনেটের শিল্প সংক্রান্ত মন্ত্রিগোষ্ঠী এবং অর্থদপ্তর ইতিমধ্যে এই নীতিতে অনুমোদন দিয়েছে। সার্বিকভাবে, বাংলার শিল্প মানচিত্রে নতুন গতি আনতে এবং বিশ্বমানের বিনিয়োগ টানতে এই নয়া শিল্পনীতি কতটা কার্যকরী হয়, এখন সেটাই দেখার।
Leave a comment