বাঁকুড়া: কর্মজীবন জুড়ে একের পর এক বিতর্ক, সাসপেনশনের খাড়া আর অতীতের রক্তক্ষয়ী রহস্যের ঘনঘটা। সব ছাপিয়ে এবার ট্রেনের ধাক্কায় মর্মান্তিক পরিণতি বাঁকুড়া পুলিশ লাইনের ইনস্পেক্টর (ডিআইবি) জয়ন্ত পালের।
শুক্রবার সন্ধ্যায় বাঁকুড়া শহরের কেঠারডাঙা রেলগেটের কাছে আরণ্যক এক্সপ্রেসের ধাক্কায় ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় বছর পঁয়তাল্লিশের এই পুলিশ আধিকারিকের দেহ। নিছক দুর্ঘটনা নাকি সুপরিকল্পিত আত্মহত্যা, তা নিয়ে এখন পুলিশ মহলে ও সাধারণ মানুষের অন্দরে শুরু হয়েছে জোর ফিসফিসানি।
শনিবার দুপুরে বাঁকুড়া সম্মিলনী মেডিক্যাল কলেজে ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হওয়ার পর এই রহস্যমৃত্যু ঘিরে প্রশ্নচিহ্ন আরও জোরালো হয়েছে। অতীতের একটি চাঞ্চল্যকর আত্মহত্যার চেষ্টার ঘটনার সঙ্গে এই বর্তমান মৃত্যুর যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।
শুক্রবার ঠিক কী ঘটেছিল ?
বাঁকুড়ার কেঠারডাঙা রেলগেট সংলগ্ন এলাকায়? পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, শুক্রবার সন্ধ্যায় ডাউন আরণ্যক এক্সপ্রেস যখন বাঁকুড়া স্টেশনের দিকে আসছিল, ঠিক সেই সময় রেললাইন পারাপার করতে গিয়ে ট্রেনের ধাক্কায় প্রাণ হারান জয়ন্ত।
প্রত্যক্ষদর্শীদের একটি বড় অংশের দাবি, এটা নিছক দুর্ঘটনা নয়, সজ্ঞানে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছিলেন ওই পুলিশ আধিকারিক। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী সুদাম শীট নামের এক স্থানীয় বাসিন্দা দৃঢ়তার সঙ্গে জানান, তাড়াহুড়ো থাকায় তিনি নিজেও সেদিন সাবওয়ে ব্যবহার না করে রেললাইন পার হচ্ছিলেন। তাঁর চোখের সামনেই চলন্ত ট্রেনের ঠিক সামনে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন এক ব্যক্তি। সেই সময় তিনি বুঝতে না পারলেও পরে জানতে পারেন যে ওই ব্যক্তি আসলে খোদ একজন পুলিশ অফিসার।
তদন্তকারীদের মনেও একাধিক প্রশ্ন দানা বেঁধেছে। বছরখানেক আগে ওই রেলগেটটি পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়ে সাধারণের যাতায়াতের জন্য পাশেই একটি সাবওয়ে তৈরি করে দিয়েছিল রেল কর্তৃপক্ষ। বন্ধ রেলগেট দিয়ে পারাপার করলে মোটা অঙ্কের জরিমানার নিয়মও রয়েছে।
তা সত্ত্বেও সাবওয়ে ব্যবহার না করে জয়ন্ত কেন আচমকা রেললাইন পেরোচ্ছিলেন? শুধু তাই নয়, যেখান থেকে তাঁর ক্ষতবিক্ষত দেহ উদ্ধার হয়েছে, সেই স্থানটি রেলগেট থেকে প্রায় ৫০ মিটার দূরে। প্রশ্ন উঠছে, তাড়াহুড়ো থাকলেও কেউ কি ৫০ মিটার পথ রেললাইন ধরে হেঁটে এগিয়ে গিয়ে মৃত্যুর মুখে দাঁড়ায়?
আরও পড়ুন: মা ফ্লাইওভারে ফের দুর্ঘটনা! মুখোমুখি ধাক্কায় দুমড়ে-মুচড়ে গেল দুই গাড়ি, আহত ৪!
এদিকে, এই আত্মহত্যার তত্ত্ব মানতে নারাজ জয়ন্তের পরিবার। ঘটনার খবর পেয়েই বাঁকুড়ায় ছুটে আসেন তাঁর দিদি ও জামাইবাবু। পরিবারের দাবি, ছোটবেলা থেকেই অত্যন্ত হাসিখুসি ও বন্ধুর মতো মিশুকে স্বভাবের ছিলেন জয়ন্ত।
জামাইবাবু রাজীব মুখোপাধ্যায় জানিয়েছেন, তাঁর কাছে এটাকে আত্মহত্যা বলে মনে হচ্ছে না। মানসিক অবসাদের কোনও বিষয় থাকলে তা তাঁরা বুঝতে পারতেন। জয়ন্তর পরিবার সূত্রে জানা যাচ্ছে, মাত্র ৪৫ দিন আগে বাঁকুড়া থানায় যোগ দিয়েছিলেন তিনি।
কিন্তু যোগদানের পরই অসুস্থতার কারণে টানা ৪০ দিনের ছুটি নেন। শুক্রবারই ফের কাজে যোগ দিয়েছিলেন তিনি। হঠাৎ এমন কী ঘটল, যার জেরে এই চরম পরিণতি? তাঁর মানসিক অবস্থা কেমন ছিল তা জানতে সহকর্মীদের জিজ্ঞাসাবাদ করার পাশাপাশি তাঁর মোবাইল ফোনটিও পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
জয়ন্ত পালের অতীত জীবনও কম বর্ণময় বা বিতর্কিত ছিল না। বিগত ২০২৫ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি হাওড়ার ঘোষপাড়া পেট্রল পাম্পের সামনে নিজের সার্ভিস রিভলভার থেকে নিজের বাঁ হাতে গুলি চালিয়েছিলেন তিনি। সেই সময় তিনি হুগলির চণ্ডীতলা থানার আইসি পদে কর্মরত ছিলেন।
ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বিনা অনুমতিতে থানা থেকে অনেক দূরে অন্য জেলায় এক রহস্যময়ী তরুণীকে নিয়ে তাঁর উপস্থিতি নিয়ে সেই সময় রাজ্য জুড়ে প্রবল জলঘোলা হয়েছিল। সাঁকরাইলের সেই তরুণীর সঙ্গে সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে তাঁর ঘনিষ্ঠতা এবং হাওড়ার একটি বহুতলে তাঁদের যাতায়াত নিয়ে শোরগোল পড়ে গিয়েছিল।
ঘটনার পর কর্তব্যে গাফিলতি ও নিয়মভঙ্গের অভিযোগে তৎকালীন রাজ্য পুলিশের এডিজি (আইনশৃঙ্খলা) জাভেদ শামিমের নির্দেশে তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত (সাসপেন্ড) করা হয়েছিল। সাসপেনশন ওঠার পর খানাকুল, চণ্ডীতলা ও সিঙ্গুরের মতো বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ থানায় দায়িত্ব সামলে সম্প্রতি তিনি বাঁকুড়া পুলিশ লাইনে ডিআইবি ইনস্পেক্টর হিসেবে বদলি হয়ে এসেছিলেন।
অতীতে নিজের গুলিতে আহত হওয়া এক পুলিশ আধিকারিকের এমন রহস্যজনক মৃত্যু স্রেফ আকস্মিক দুর্ঘটনা, না কি এর নেপথ্যে রয়েছে অন্য কোনো গভীর অবসাদ বা রহস্য, ময়নাতদন্তের প্রাথমিক রিপোর্ট এবং পুলিশি তদন্তের ফল হাতে এলেই তা পরিষ্কার হবে। তবে ছুড়ির ফলার মতো এই আকস্মিক মৃত্যুতে রাজ্য পুলিশ মহলে নেমে এসেছে গভীর শোক ও বিস্ময়ের ছায়া।
Leave a comment