নয়াদিল্লি: রাজধানী দিল্লির রাজনৈতিক পারদ এক ধাক্কায় পৌঁছে গিয়েছে চরম তুঙ্গে।
নির্বাচন কমিশনের তথাকথিত ‘ইলেক্টোরাল অনিয়ম’ এবং ভোটার তালিকা সংশোধনের (এসআইআর) সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রবিবাসরীয় রামলীলা ময়দানে এক সুবিশাল সমাবেশের ডাক দিয়েছে বিরোধী দলগুলির জোট ‘ইন্ডিয়া’ (INDIA)।
এই মেগা প্রতিবাদী সমাবেশ এবং ‘চলো দিল্লি’ অভিযানকে কেন্দ্র করে গোটা জাতীয় রাজধানী অঞ্চল কার্যত এক দুর্ভেদ্য দুর্গে পরিণত হয়েছে। একদিকে যেমন অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে এবং আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে রাজধানীর অলিগলিতে কেন্দ্রীয় আধা-সামরিক বাহিনীর হাজার হাজার জোয়ান মোতায়েন করা হয়েছে, তেমনই অন্য দিকে এই মহাসমাবেশকে ঘিরে উৎসবের মরশুমে কয়েক হাজার কোটি টাকার বাণিজ্যের অপূরণীয় ক্ষতির আশঙ্কায় কাঁপছে রাজধানীর ব্যবসায়ী সমাজ।
রবিবার সকাল থেকেই রামলীলা ময়দান এবং তার সংলগ্ন বিস্তীর্ণ এলাকা থমথমে। দিল্লির যুগ্ম পুলিশ কমিশনার মধুর বর্মা জানিয়েছেন, শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবং যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে অফিসার-ভিত্তিক বিশেষ এবং সুনির্দিষ্ট নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে।
দিল্লি পুলিশের শীর্ষ কর্তাদের পাশাপাশি র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স (আরএএফ), সিআইএসএফ, সিআরপিএফ এবং সশস্ত্র সীমা বলের (এসএসবি) অতিরিক্ত বাহিনী নামানো হয়েছে রাজধানীর রাস্তায়। দীন দয়াল উপাধ্যায় মার্গ এবং নির্বাচন কমিশন অফিসের মতো অত্যন্ত স্পর্শকাতর এলাকাগুলিতে নজিরবিহীন নজরদারি চালানো হচ্ছে।
দিল্লির সমস্ত জেলায় আপাতত ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার (বিএনএসএস) ১৬৩ ধারা জারি রয়েছে, যার ফলে যন্তর মন্তর বা ইসি অফিসের সামনে জমায়েত সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এমনকী উত্তরপ্রদেশের নয়ডা সংলগ্ন চিল্লা সীমান্তেও শুরু হয়েছে ঢালাও গাড়ি তল্লাশি।
তবে রাজনৈতিক উত্তাপ যতটাই বাড়ুক না কেন, এই মেগা সমাবেশের চরম প্রভাব গিয়ে পড়েছে দিল্লির অর্থনীতির ওপর। ধনতেরাস এবং দীপাবলির প্রাক্কালে বছরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কেনাকাটার সময়ে রামলীলা ময়দানের এই জনসভা রাজধানীর বাণিজ্য ক্ষেত্রে এক নজিরবিহীন বিপর্যয় ডেকে এনেছে বলে দাবি করেছে চেম্বার অব ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (সিটিআই)।
ট্রেডার্স বডির দেওয়া হিসেব অনুযায়ী, রামলীলা ময়দানের পাঁচ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে থাকা প্রায় আড়াই লক্ষ দোকান সম্পূর্ণ বন্ধ থাকার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর ফলে কেন্দ্রীয় ও পুরানো দিল্লির প্রায় ৮০ শতাংশ ব্যবসা-বাণিজ্য এক লহমায় পুরোপুরি স্তব্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।
সিটিআই চেয়ারম্যান ব্রিজেশ গোয়েল জানিয়েছেন, রামলীলা ময়দান সংলগ্ন প্রায় তিন লক্ষ দোকানের মধ্যে আড়াই লক্ষই আতঙ্কে দরজা খুলতে পারছে না। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী জনসভায় আগত মানুষদের স্থানীয় বাজারে গিয়ে কেনাকাটার অনুরোধ জানালেও, বাস্তব চিত্রটা সম্পূর্ণ আলাদা।
আরও পড়ুন: রবিবার রামলীলায় মমতা! জ্ঞানেশের ইমপিচমেন্টে মক পার্লামেন্ট ইন্ডিয়া জোটের
ব্রিজেশ গোয়েলের প্রশ্ন, “দোকানপাটই যদি বন্ধ থাকে, তবে দূরদূরান্ত থেকে আসা মানুষ কেনাকাটা করবেন কোথায়?” একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট করেন, দিল্লির একশোটিরও বেশি প্রধান বাজার অ্যাসোসিয়েশন কেবল নিজেদের রুটিরুজি ও মরশুমি ব্যবসা বাঁচাতে সমাবেশটি পিছোনোর আবেদন জানিয়েছিল। এর সঙ্গে কোনও রাজনৈতিক দলের যোগ নেই এবং তারা কারও হয়ে রাজনীতি করছেন না।
ব্যবসার পাশাপাশি পরিবহণ ব্যবস্থাও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। সাধারণ দিনে নারেলা, বাওয়ানা, ওখলা, ময়াপুরী এবং মুণ্ডকা-সহ ৫৬টি শিল্পাঞ্চল থেকে অন্তত পাঁচ হাজার পণ্যবাহী ট্রাক ও টেম্পো দিল্লির প্রধান বাজারগুলিতে পৌঁছায়।
কিন্তু রাস্তাঘাট অবরুদ্ধ থাকার কারণে সেই সরবরাহ শৃঙ্খল (সাপ্লাই চেইন) পুরো ভেঙে পড়েছে। গুদামে থাকা ধনতেরাসের মালামাল দোকানে পৌঁছাতেই পারছে না। এছাড়া দিল্লি সংলগ্ন সোনিপথ, পানিপথ, গুরুগ্রাম, গাজিয়াবাদ ও নয়ডার মতো শহরগুলি থেকে সাধারণ ক্রেতারা যানজটের ভয়ে দিল্লি আসা এড়িয়ে চলছেন।
সমাবেশে আসা অন্তত ১৫ থেকে ২০ হাজার বাস ও গাড়ির পার্কিং নিয়ে তৈরি হয়েছে বিশাল বিভ্রান্তি। বাহাদুর শাহ জাফর মার্গ, নেতাজি সুভাষ মার্গ এবং চাঁদনি চক রোডে তৈরি হওয়া তীব্র যানজট দিল্লির অন্তত ২০টি বড় বাজারের উৎসবের কেনাকাটাকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
সিটিআই-এর আশঙ্কা, এর ফলে দৈনিক প্রায় ১০,০০০ থেকে ১২,০০০ কোটি টাকার বাণিজ্যের ক্ষতি হতে পারে, যা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত প্রায় ৯৫ লক্ষ মানুষের জীবিকায় টান ফেলবে। সব মিলিয়ে এক তীব্র রাজনৈতিক সংঘাত এবং অর্থনৈতিক সংকটের মোড়ে দাঁড়িয়ে আজ দেশের রাজধানী।
Leave a comment