নয়াদিল্লি: আলো ঝলমলে দীপাবলির আনন্দের রেশ কাটতে না কাটতেই উৎসবের মরশুমি খাদ্যাভ্যাসের খেসারত দিতে শুরু করেছে আমাদের শরীর। উৎসবের ক’টা দিন মানেই পাতে নিয়ম ভেঙে ভুরিভুরি ভাজা স্ন্যাক্স, ঘিয়ে ডোবানো রিচ গ্রেভি, ময়দা-চিনির হরেক মিষ্টি এবং তেল-মশলাদার ভারী খাবারের রমরমা।
কিন্তু আনন্দ উদযাপনের এই মোড়কে অজান্তেই যে আমাদের অন্ত্র বা পরিপাকতন্ত্রে বড়সড় বিপর্যয় ডেকে আনছি আমরা, সে বিষয়ে হুঁশ নেই অধিকাংশেরই। পুজো বা দিওয়ালির কয়েকদিনের অনিয়মিত খাওয়া-দাওয়া সরাসরি থাবা বসাচ্ছে পরিপাকতন্ত্রের স্বাস্থ্য এবং পেটের উপকারী মাইক্রোবায়োমের ওপর, যার জেরে উৎসবের আনন্দ ফিকে হতে বসেছে গ্যাস, অম্বল ও পেটের গোলমালে।
তৈলাক্ত খাবার ও দীর্ঘক্ষণ খাওয়ার খেসারত
উৎসবের মরশুমে প্রতিদিনের ডায়েট থেকে ফাইবার বা ফাইবার সমৃদ্ধ শাকসবজি, ফল, ডাল ও গোটা শস্যের উপস্থিতি হঠাৎ করেই তলানিতে ঠেকে। এর বদলে প্লেট দখল করে ফাস্টফুড, ডিপ ফ্রাই স্ন্যাক্স আর প্রক্রিয়াজাত খাবার।
পুষ্টিবিদ ও চিকিৎসকদের মতে, অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত এবং ভাজা খাবার হজম প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটায়। ফাইবার পরিপাক প্রক্রিয়াকে দীর্ঘায়িত করে এবং পাকস্থলীতে খাবার অনেকক্ষণ জমিয়ে রাখে, যার ফলস্বরূপ অতিরিক্ত পেট ভরা ভাব, ঢেকুর ওঠা, বুক জ্বালা (অ্যাসিডিটি) এবং রিফ্লাক্সের মতো সমস্যা গ্রাস করে।
বিশেষ করে যাঁদের আগে থেকেই হজমের সমস্যা রয়েছে, দীপাবলির রাতে অতিরিক্ত তেলযুক্ত খাবার এবং তার ঠিক পরেই মিষ্টিমুখ বা গভীর রাতে স্ন্যাক্স খাওয়ার প্রবণতা এই কষ্টকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
তার ওপর অতিরিক্ত ভোজন বা বড় আকারের মিল পাকস্থলীর ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে। উৎসবের আমেজে রাতের দিকে ভারী ডিনারের পরপরই শুয়ে পড়ার অভ্যাস অ্যাসিড রিফ্লাক্সের ঝুঁকি মারাত্মকভাবে বাড়িয়ে দেয়। গবেষণা বলছে, উৎসবের এই অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস ও উচ্চ ক্যালোরিযুক্ত খাবারের পর সাধারণ মানুষের মধ্যে পেটের অস্বস্তি এবং বমিভাব বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।
আরও পড়ুন : নখের ডগায় জ্বলন্ত প্রদীপ! দীপাবলির নতুন ট্রেন্ড নজর কাড়ছে তরুণীদের
অন্ত্রের স্বাস্থ্য ও ফাইবারের মারাত্মক ঘাটতি
খাদ্যতালিকা থেকে ফাইবার বা অদ্রবণীয় উদ্ভিজ্জ উপাদানের হঠাৎ এই অনুপস্থিতি মলের স্বাভাবিক গঠন এবং গতিপ্রকৃতি বদলে দেয়। ফলস্বরূপ দেখা দেয় কোষ্ঠকাঠিন্য বা অনিয়মিত পেট পরিষ্কারের সমস্যা। ফাইবার কেবল পেট পরিষ্কার রাখাই নয়, অন্ত্রের উপকারী ব্যাকুলিয়া বা মাইক্রোবায়োমের প্রধান খাদ্য হিসেবে কাজ করে।
এই ভাল ব্যাকটেরিয়াগুলি ফাইবার গেঁজে শর্ট চেইন ফ্যাটি অ্যাসিড (SCFAs)— যেমন বুটাইরেট, অ্যাসিটেট এবং প্রোপিওনেট তৈরি করে, যা কোলনের দেওয়াল ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে শক্তিশালী রাখে। কিন্তু রিফাইন্ড কার্বোহাইড্রেট ও ভাজাভুজি নির্ভর খাবার অন্ত্রের এই উপকারী ব্যাকটেরিয়াদের পুষ্টি কেড়ে নেয়, যার সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়ে আমাদের মেটাবলিজমে।
ঘড়ির কাঁটা এবং জীবনযাত্রার ছন্দপতন
উৎসব মানেই প্রতিদিনের বায়োলজিক্যাল ক্লক বা জৈবিক ছন্দের পতন। রাত জেগে পার্টি, দেরিতে খাওয়া, একটানা অনেকক্ষণ বসে থাকা এবং জলের পরিমাণ কমিয়ে দেওয়া, এই সমস্ত কিছু গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল ট্র্যাক্টের স্বাভাবিক চলন বা গতিশীলতাকে শ্লথ করে দেয়।
যাঁদের ইরিটেবল বাওয়েল সিন্ড্রোম (IBS) কিংবা গ্যাস্ট্রোসোফেজিয়াল রিফ্লাক্স ডিজিজ (GERD)-এর মতো সমস্যা রয়েছে, উৎসবের অনিয়ম তাঁদের কষ্টকে কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেয়। অতিরিক্ত অ্যালকোহল ও ক্যাফেইন গ্রহণের ফলে শরীরের হাইড্রেশনের ভারসাম্য নষ্ট হয়, যা কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যাকে আরও ত্বরান্বিত করে।
কীভাবে বাঁচাবেন আপনার পেটকে?
উৎসবের আনন্দ বজায় রেখেও পেটের স্বাস্থ্য সুরক্ষিত রাখা সম্ভব, যদি সামান্য কিছু নিয়ম মেনে চলা যায়। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ:
- উৎসবের রিচ খাবারের পাশাপাশি লাঞ্চ ও ডিনারে এক টুকরো করে সালাদ বা শাকসবজি আবশ্যিক রাখুন।
- খাবারে ডাল, ওটস, গোটা শস্য ও মরশুমি ফলের উপস্থিতি বজায় রাখুন যাতে ফাইবারের ঘাটতি না হয়।
- বিশেষ করে ভ্রমণ বা উৎসবের ব্যস্ততার মাঝেও সারাদিন ধরে পর্যাপ্ত পরিমাণে জল পান করুন।
- একবারে অনেকটা না খেয়ে পরিমিত পরিমাণে খান এবং পরপর দুটি খাবারের মাঝে পর্যাপ্ত বিরতি দিন।
- ভারী খাবার খাওয়ার পর কিছুক্ষণ হালকা হাঁটার অভ্যাস করুন এবং ঘুমানোর অন্তত দু’ঘণ্টা আগে রাতের খাবার সেরে নিন।
চিকিৎসকদের সতর্কবার্তা, যাঁদের ফাইবার খাওয়ার অভ্যাস কম, তাঁরা হঠাৎ করে ফাইবার বাড়াতে গেলে গ্যাসে ভুগতে পারেন। তাই ধীরে ধীরে অভ্যাস বদলান। তবে যদি পেটে তীব্র ব্যথা, বারবার বমি, মলের সঙ্গে রক্তপাত বা দীর্ঘস্থায়ী ডায়রিয়া-কোষ্ঠকাঠিন্যের মতো উপসর্গ কয়েক দিন ধরে চলতে থাকে, তবে দেরি না করে অবিলম্বে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। উৎসবের আনন্দ হোক ভরপুর, তবে পাতে সঠিক ভারসাম্য বজায় রেখেই সুস্থ রাখুন আপনার পরিপাকতন্ত্রকে।
Leave a comment