কলকাতা: আমফানের মতো ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ত্রাণের টাকাতেও চূড়ান্ত নয়ছয়, আবার জনসেবার আবরণে তৈরি ‘সেবাশ্রয়’ প্রকল্পেও নাকি দুর্নীতির পাহাড়! বিগত তৃণমূল জমানার এই আর্থিক তছরূপের অভিযোগ নিয়ে শনিবার বিধানসভায় ক্যাগ (CAG) রিপোর্ট পেশ হতেই কার্যত রাজ্য রাজনীতিতে শোরগোল পড়ে গিয়েছে। রিপোর্টের ছত্রে ছত্রে দুর্নীতির প্রমাণ মেলায় এবার সরাসরি কালীঘাট তথা তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্বকে নিশানা করলেন ‘আসল’ তৃণমূলের সাংসদ ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। রোববার এক বিস্ফোরক সাংবাদিক বৈঠকে তিনি তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দিকে সরাসরি আঙুল তুলে দাবি করেন, সেবাশ্রয় ক্যাম্প মূলত কালো টাকা সাদা করার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। শুধু তা-ই নয়, আমফানের সময় নয়ছয় করা ত্রাণের অর্থ কেম্যান বা ভানুয়াতুর মতো দূরবর্তী দ্বীপে ‘ভাইপো’র স্বার্থেই পাচার করা হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
স্মরণ করা যেতে পারে, ২০২০ সালের জুন মাসে চরম করোনা সংকটের মধ্যেই রাজ্যের উপকূলবর্তী জেলাগুলিতে ধ্বংসলীলা চালিয়েছিল অতি শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় আমফান। সুন্দরবন এলাকা কার্যত ধুলোয় মিশে গিয়েছিল। সেই সময় বিপর্যয় মোকাবিলার জন্য কেন্দ্রের তরফে বিপুল আর্থিক বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল রাজ্যকে। ভেঙে যাওয়া প্রতিটি বাড়ির পুনর্নির্মাণের জন্য কেন্দ্রের বরাদ্দ ছিল ২০ হাজার টাকা, অথচ অভিযোগ— ক্ষতিগ্রস্তদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল মাত্র ৫ হাজার টাকা। ক্যাগ রিপোর্টের ভিত্তিতে ঋতব্রতর দাবি, এইভাবে প্রায় ১৮ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, রাজ্যবাসীকে বঞ্চিত করে কেন্দ্রের পাঠানো বরাদ্দ ছেঁটে ফেলার এই মাস্টারমাইন্ড কে? এর পেছনে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, মিতুন দে, জাহাঙ্গির পুষ্পা, দেবরাজ চক্রবর্তী এবং সুমিত রায়ের সমন্বয়ে গঠিত এক ‘জ্যামিতিক নকশা’ কাজ করেছে বলে তিনি বিস্ফোরক দাবি করেন। উল্লেখ্য, অভিযুক্তদের মধ্যে মিতুন দে ছিলেন তৎকালীন পুলিশ আধিকারিক এবং সুমিত রায় ছিলেন অভিষেকের আপ্ত সহায়ক, আর বাকিরা সকলেই শাসকদলের অত্যন্ত প্রভাবশালী মুখ।
কেবল আমফানের ত্রাণেই নয়, প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের চিকিৎসার সুবিধার্থে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্যোগে যে 'সেবাশ্রয়' শিবির গড়ে তোলা হয়েছিল, ক্যাগ রিপোর্টে সেখানেও বিপুল অনিয়মের কথা উঠে এসেছে। এই প্রসঙ্গে ঋতব্রত আরও একধাপ এগিয়ে বলেন, ওটা কোনও সাধারণ দুর্নীতি ছিল না, ওটা ছিল একটি বিশাল অবৈধ আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্র। সেখানে চিকিৎসা করাতে গিয়ে সাধারণ মানুষকে হাত-পা খোয়াতে হয়েছে। এমনকী অযোগ্য ও ভুয়ো চিকিৎসকদের জোর করে এনে ওই ক্লিনিকে বসানো হয়েছিল বলে এখন অনেকেই স্বীকার করছেন। সরকারি হাসপাতালগুলি থেকে আধুনিক যন্ত্রপাতি সরিয়ে এই শিবিরে নিয়ে যাওয়া হয়। ঋতব্রতর খোঁচা, "বাঘরোল অভিষেকের স্বার্থেই এই জ্যামিতিক নকশার সাহায্যে কোটি কোটি টাকা কেম্যান ও ভানুয়াতু দ্বীপে পাচার করা হয়েছে।" শনিবার ক্যাগ রিপোর্ট প্রকাশের পর মুখ্যমন্ত্রী এই নিয়ে বিধানসভায় বিশেষ অধিবেশনে আলোচনার কথা জানিয়েছেন। তবে সেই বিষয়ে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করে ঋতব্রত জানান, পুরো রিপোর্ট এখনও পড়া শেষ হয়নি, কিন্তু যতটুকু সামনে এসেছে তাতেই চোখ কপালে ওঠার জোগাড়; বিশেষ অধিবেশনে তাদের ঠিক কী জবাব থাকবে, তা নিয়েই এখন প্রশ্ন উঠছে।
হিডেন স্টোরিজ নিউজ

সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৭ জুলাই ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন