কলকাতা: বাঙালির প্রাণের দুর্গাপূজা আজ নিছক আনন্দোৎসব নেই, তা যেন এক সর্বগ্রাসী 'উৎ-শবে' পরিণত হয়েছে। উত্তর কলকাতার চোরবাগান সর্বজনীনের সপ্তমীর সন্ধ্যায় ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক পদপিষ্টের ঘটনায় ১৯ জনের প্রাণহানির পর আজ এই প্রশ্নই বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। ভ্লগার ও সংবাদমাধ্যমের দৌলতে রাতারাতি এই মণ্ডপের যে 'সুনাম' ও প্রচার তৈরি হয়েছিল, তা শেষ পর্যন্ত ডেকে আনল এক বিভীষিকাময় বিপর্যয়। বৃষ্টি, সোশ্যাল মিডিয়ার অতিরিক্ত উন্মাদনা, নাকি আয়োজক ও পুলিশ প্রশাসনের চরম উদাসীনতা—ঠিক কার বা কাদের ভুলে ঝরে গেল এতগুলি তাজা প্রাণ, তা নিয়ে আজ তৈরি হয়েছে হাজারও প্রশ্ন।
ঘটনার দিন ঠিক কী ঘটেছিল, তার একটা টাইমলাইন যেন এক অবিশ্বাস্য ট্র্যাজেডির চিত্র ফুটিয়ে তোলে। সন্ধে সাড়ে ছ'টা নাগাদ সেন্ট্রাল এভিনিউ থেকে মহাত্মা গান্ধী রোড মেট্রো স্টেশন পর্যন্ত দীর্ঘ লাইনে উপচে পড়ে ভিড়। এরপর ঘড়িতে যখন ঠিক সাতটা, নামে প্রবল বৃষ্টি। সেই বৃষ্টি থেকে বাঁচতে এবং মণ্ডপে ঢোকার জন্য দর্শকদের মধ্যে শুরু হয় তীব্র হুড়োহুড়ি। এরপর সাতটা পনেরো মিনিট নাগাদ ধাক্কাধাক্কিতে মণ্ডপের একাংশ ভেঙে পড়ে। যে উঁচু বা এলিভেটেড কাঠামোর ওপর মণ্ডপটি তৈরি হয়েছিল, সেখান থেকে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামার সময় পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। মণ্ডপ থেকে কিছু বিভ্রান্তিকর ঘোষণাও করা হয়েছিল বলে অভিযোগ, যা আতঙ্ক আরও বাড়িয়ে দেয়। মাত্র কুড়ি মিনিটের ব্যবধানে সাতটা চল্লিশ নাগাদ একের পর এক নিথর দেহ এসে পৌঁছয় কলকাতা মেডিকেল কলেজে। রাত ন'টার মধ্যে হাসপাতালে ছুটে যান মুখ্যমন্ত্রী সহ প্রশাসনিক কর্তারা।
কিন্তু এত বড় জনজোয়ার আছড়ে পড়ার কথা জানাজানি হওয়া সত্ত্বেও কেন প্রস্তুত ছিল না প্রশাসন? প্রথম থেকেই সরু গলি ও কম জায়গার ওপর তৈরি এই মণ্ডপের ভিড় ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। অভিযোগ, সাধারণ দর্শনার্থীদের কথা না ভেবে আয়োজকরা ভিআইপি লাইন সামলাতেই বেশি ব্যস্ত ছিলেন। পর্যাপ্ত পুলিশ বা অভিজ্ঞ স্বেচ্ছাসেবকদের অনুপস্থিতি এবং দুর্ঘটনার পর অ্যাম্বুল্যান্সের অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। যদিও পুলিশের দাবি, মাত্রাতিরিক্ত ভিড় এবং আচমকা বৃষ্টির জেরে পরিস্থিতি মুহূর্তের মধ্যে হাতের বাইরে চলে গিয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই—ভিড়ের স্রোত সামলাতে গিয়ে এই মর্মান্তিক মৃত্যুমিছিল কি এড়ানো যেত না?

রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৮ অক্টোবর ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন