বাংলা ছবির পর্দা থেকে আরও একটি পরিচিত মুখ চিরতরে সরে গেল। প্রয়াত বর্ষীয়ান অভিনেত্রী মিঠু মুখোপাধ্যায়। তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে যেন শেষ হয়ে গেল বাংলা ছবির এক বিশেষ অধ্যায়ও। উত্তমকুমারের সময়ের শেষভাগ থেকে পরবর্তী দশকের বাংলা সিনেমা এই বদলের সময়টাকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন মিঠু। অভিনয় করেছেন সেই সময়ের একাধিক তাবড় অভিনেতার সঙ্গে। তাই মিঠুর চলে যাওয়া শুধু একজন অভিনেত্রীর প্রয়াণ নয়, বাংলা ছবির একটি সময়েরও পরিসমাপ্তি।
মিঠুর অভিনয়জীবন শুরু চিত্ত বসুর ‘শেষ পর্ব’ দিয়ে। তারপর ‘মর্জিনা আবদুল্লা’য় মর্জিনা চরিত্রে অভিনয় করে দ্রুত দর্শকের নজরে চলে আসেন তিনি। এরপর ‘নিশিকন্যা’, ‘মৌচাক’, ‘স্বয়ংসিদ্ধা’-র মতো ছবিতে একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে দেখা যায় তাঁকে। সাতের দশকের জনপ্রিয় মূলধারার সিনেমার অন্যতম পরিচিত মুখ হয়ে উঠেছিলেন মিঠু। আর এই জায়গাতেই মিঠুর কেরিয়ারটা বেশ অন্যরকম। ‘মৌচাক’-এ উত্তমকুমার ও রঞ্জিত মল্লিকের সঙ্গে, ‘নিশিকন্যা’য় সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে, ‘মর্জিনা আবদুল্লা’য় দেবরাজ রায়ের সঙ্গে কাজ করেছেন তিনি। পরে হিন্দি ছবিতে গিয়ে শত্রুঘ্ন সিন্হার সঙ্গেও অভিনয় করেছেন।
তবে মিঠুর সময়ের বাংলা সিনেমাকে শুধু সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক বা মৃণাল সেনের ছবির আলো দিয়ে দেখলে তাঁর জায়গাটা বোঝা যাবে না। মিঠু মূলত ছিলেন জনপ্রিয় মূলধারার বাংলা ছবির নায়িকা। সত্যজিৎ বা ঋত্বিকের ছবিতে তাঁকে দেখা যায়নি ঠিকই, কিন্তু এই নয় যে বাংলা ছবির দর্শকের উপর তাঁর প্রভাব কম ছিল। বরং ‘মর্জিনা আবদুল্লা’, ‘মৌচাক’, ‘স্বয়ংসিদ্ধা’-র মতো ছবিতে তাঁর উপস্থিতি তাঁকে বিপুল দর্শকের কাছে পৌঁছে দিয়েছিল। বিশেষ করে ‘মৌচাক’ মিঠুর জনপ্রিয়তার ক্ষেত্রে বড় জায়গা করে নেয়।
ছবির নীপা চরিত্রে তাঁর প্রাণবন্ত উপস্থিতি, রঞ্জিত মল্লিকের সঙ্গে জুটি এবং ছবির তারকাখচিত অভিনয়শিল্পী সব মিলিয়ে ‘মৌচাক’ হয়ে উঠেছিল সেই সময়ের স্মরণীয় জনপ্রিয় ছবিগুলির একটি। ‘মর্জিনা আবদুল্লা’ও তাঁকে দর্শকের কাছে আলাদা পরিচিতি দিয়েছিল। ফলে মিঠুর নাম তখন শুধু একটি নতুন নায়িকার নাম ছিল না, বরং বাংলা ছবির বাণিজ্যিক সাফল্যের সঙ্গে জড়িয়ে যাওয়া একটি পরিচিত মুখ। সত্তরের দশকের সেই বদলে যাওয়া সময়ে সাদা-কালো থেকে রঙিন দুই পর্দাতেই নিজের অভিনয়ের ছাপ রেখেছিলেন মিঠু। তাঁর সৌন্দর্য নিয়েও তখন কম আলোচনা হয়নি। পর্দায় মিঠুর চেহারা, সাজ, গ্ল্যামার এবং সহজাত আকর্ষণের সঙ্গে দর্শক বলিউডের রেখার মিল খুঁজে পেতেন। সেই থেকেই তাঁকে ‘কলকাতার রেখা’ নামে ডাকতে শুরু করেন অনেকে।
মিঠু যেমন একদিকে গ্ল্যামারাস চরিত্রে দর্শকের নজর কেড়েছেন, অন্যদিকে ভিন্ন মেজাজের চরিত্রেও অভিনয় করেছেন। ১৯৭৬ সালে ‘খান দোস্ত’ দিয়ে হিন্দি ছবিতে পা রাখেন মিঠু। এরপর বাসু চট্টোপাধ্যায়ের ‘সফেদ ঝুট’, ‘দিল্লাগি’ এবং ‘দো লড়কে দোনো কড়কে’-তেও কাজ করেন। কিন্তু সেই পথটাও দীর্ঘ হয়নি। একটা সময় অভিনয় থেকে সরে যান মিঠু। দীর্ঘ বিরতির পর ১৯৯০ সালে ‘আশ্রিতা’ দিয়ে ফেরেন পর্দায়। ছবিটি সফল হয় এবং মিঠুর প্রত্যাবর্তনও নজর কাড়ে। কিন্তু সেটিই শেষ।
‘আশ্রিতা’-র পর আর নিয়মিত অভিনয়ে ফেরেননি তিনি। বরং সাফল্যের পরেও গ্ল্যামার দুনিয়া থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে অন্তরালেই ছিলেন। আর সেই কারণেই মিঠু মুখোপাধ্যায়ের গল্পটা শুধু একজন জনপ্রিয় নায়িকার গল্প নয়। এটি উত্তমকুমার-পরবর্তী বাংলা সিনেমার এক বদলে যাওয়া সময়ের গল্পও। যে সময়ে পুরনো তারকাদের পাশাপাশি নতুন নায়ক-নায়িকারা নিজেদের জায়গা তৈরি করছিলেন। যে সময়ে মূলধারার বাংলা ছবি দর্শককে হলমুখী করছিল, সেই সময়ের অন্যতম পরিচিত মুখ ছিলেন মিঠু।
বিষয় : Mithu Mukherjee

সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন