মস্কো: ল্যাবরেটরির কাচের টেস্টটিউব ভেঙে নিমেষে ছড়িয়ে পড়ল মৃত্যুবাণ!
সাইবেরিয়ার প্রত্যন্ত শহর শেলেখভে ঘটে গেল এক ভয়াবহ বিপর্যয়। 'অ্যান্টি-প্লেগ রিসার্চ ইনস্টিটিউট'-এর ২৮ বছর বয়সি তরুণী ল্যাব টেকনিশিয়ান দোরিয়া শিপিলোভা নিউমোনিক প্লেগে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন। ঘটনাকে কেন্দ্র করে আতঙ্কের পারদ তুঙ্গে। প্রায় ২০০ জন মানুষকে তড়িঘড়ি কোয়ারেন্টাইনে পাঠানো হয়েছে, বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে অন্তত পাঁচটি হাসপাতাল।
কিন্তু এই একটি দুর্ঘটনাই তুলে দিল এক ঝাঁক অস্বস্তিকর প্রশ্ন। একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে, বায়ো-সেফটির উচ্চতম মানের দাবি করা রাশিয়া কী ভাবে প্লেগের মতো প্রাচীন মহামারীর সামনে এভাবে হাঁটু মুড়ে বসল?
যে ল্যাবরেটরি খোদ মহামারীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য তৈরি, সেখানেই কেন এক যুবতী স্বাস্থ্যকর্মীকে একটি টেস্টটিউব ভাঙার মাশুল জীবন দিয়ে দিতে হল? বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ইউক্রেন যুদ্ধের আবহে যখন ক্রেমলিনের সমস্ত সম্পদ ও নজর সামরিক ক্ষেত্রে কেন্দ্রীভূত, তখন দেশের স্বাস্থ্য ও বৈজ্ঞানিক পরিকাঠামোয় ধরেছে মারাত্মক ঘুণ।
গোপন রাখার ব্যর্থ চেষ্টা ও ক্ষোভের বিস্ফোরণ!
ঘটনার সূত্রপাত সেপ্টেম্বর মাসের শেষে। নমুনা সংগ্রহের সময় অসাবধানতাবশত একটি টেস্টটিউব ভেঙে যায়। এবং তা থেকে সরাসরি নিঃশ্বাসের মাধ্যমে দোরিয়ার শরীরে ছড়িয়ে পড়ে প্রাণঘাতী নিউমোনিক প্লেগ। ২৯ সেপ্টেম্বর অত্যন্ত আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাঁকে শেলেখভ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ১ অক্টোবর ভেন্টিলেটরেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।
অথচ পুরো ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে প্রশাসনিক স্তরে চেষ্টা কম হয়নি। স্থানীয় গভর্নর ইগর কোবজেভ প্রথমে এটিকে "অজ্ঞাত কারণে মৃত্যু" বলে চালানোর চেষ্টা করেন। স্বাস্থ্য নিয়ামক সংস্থা 'রোসপোত্রেবনাদজর' (Rospotrebnadzor)-ও জানায়, মৃতের নমুনা নাকি কোনও ভয়ানক অণুজীবের সন্ধান মেলেনি!
কিন্তু প্রতিবেশী বুরিয়াতিয়া অঞ্চলের গভর্নর সোশ্যাল মিডিয়ায় সত্য প্রকাশ করে দেন। তিনি সাফ জানান, তরুণীর মৃত্যু প্লেগেই হয়েছে। এরপরই তড়িঘড়ি মস্কো থেকে উড়ে আসেন রাশিয়ার প্রধান স্যানিটারি ডক্টর আন্না পপোভা।
সম্পদের চরম ঘাটতি? প্রশ্ন পুতিন সরকারের ভূমিকা নিয়ে
যে দেশে বায়ো-লেভেল নিরাপত্তা ব্যবস্থার কথা মুখে হাঁকা হয়, সেখানে ল্যাবের ভেতরে পিপিই (PPE) বা বায়ো-সেফটি ক্যাবিনেটের মতো ন্যূনতম সুরক্ষা কেন কাজ করল না? রাশিয়ার প্রখ্যাত এপিডেমিওলজিস্টদের একাংশ সোজাসুজি আঙুল তুলছেন পুতিন প্রশাসনের দিকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গত কয়েক বছর ধরে যুদ্ধের পেছনে কোটি কোটি রুবেল ঢালতে গিয়ে রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ বৈজ্ঞানিক ল্যাবরেটরি ও স্বাস্থ্য খাত মারাত্মক অবহেলিত। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম, উন্নত বায়ো-প্রোটেক্টিভ গিয়ার এবং আধুনিক গবেষণাগারের মান বজায় রাখার ঘাটতি স্পষ্ট ফুটে উঠেছে এই ঘটনায়।
তা ছাড়া, নিউমোনিক প্লেগ অত্যন্ত ছোঁয়াচে। আক্রান্তের কাশি বা শ্বাস-প্রশ্বাসের ড্রপলেটের মাধ্যমে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তা ছড়িয়ে পড়তে পারে। সময়মতো অ্যান্টিবায়োটিক না পেলে মৃত্যু নিশ্চিত। অথচ হাসপাতালে সেই দ্রুততম চিকিৎসা দিতে কেন ব্যর্থ হলেন চিকিৎসকরা? তবে কি স্থানীয় হাসপাতালগুলিতে জরুরি প্রাণরক্ষাকারী ওষুধেরও অভাব রয়েছে?
আপাতত শেলেখভ এবং ইর্কুটস্ক শহরের বেশ কয়েকটি হাসপাতাল কোয়ারেন্টাইনে রেখে সিল করে দেওয়া হয়েছে। সংলগ্ন অ্যালুমিনিয়াম কারখানার কর্মীদের মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। আমেরিকার হোয়াইট হাউস থেকেও পরিস্থিতির ওপর নজর রাখা হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—যুদ্ধের দামামা বাজাতে গিয়ে রাশিয়া কি তবে নিজের দেশবাসীকে এক মারাত্মক মহামারীর মুখে ঠেলে দিচ্ছে? অভ্যন্তরীণ সম্পদের ঘাটতি ও প্রশাসনিক চরম গাফিলতিই আজ ভ্লাদিমির পুতিনের রাশিয়াকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিল।

সোমবার, ০৫ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৫ অক্টোবর ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন