নয়াদিল্লি: ক্যালেন্ডারের পাতা অনুযায়ী সবে অক্টোবরের শেষ। অথচ শনিবার সকালে ঘুম থেকে উঠেই শিরশিরে ঠাণ্ডায় গায়ে চাদর আর উইন্ডব্রেকার চাপাতে বাধ্য হলেন দিল্লি-এনসিআর (Delhi-NCR)-এর বাসিন্দারা।
বঙ্গোপসাগর ও পশ্চিমী ঝঞ্ঝার জোড়া প্রভাবে আচমকা টানা বর্ষণ এবং দ্রুত পারদ পতনের জেরে ৭৫ বছরের রেকর্ড ভেঙে দিল রাজধানী। শুক্রবার দিল্লির সর্বোচ্চ তাপমাত্রা নেমে দাঁড়ায় মাত্র ২০.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। আবহাওয়া দফতর সূত্রে খবর, ১৯৫১ সালের পর থেকে অক্টোবর মাসে দিনের তাপমাত্রা এতটা নামার নজির দিল্লিতে আর নেই। অকাল বৃষ্টির জেরে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের থেকে এক ধাক্কায় ১০.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস নিচে নেমে যাওয়ায় এক লহমায় যেন অকাল শীতের চাদরে মুড়ে গিয়েছে দেশের রাজধানী শহর।
ভারতীয় আবহাওয়া দফতর (IMD)-এর প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র সফদারজং ওয়েদার স্টেশনের সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, পর পর দু’দিনের অবিরাম বর্ষণের জেরেই এই অভূতপূর্ব পারদ পতন। সকাল থেকে ঘন ছাইরঙা মেঘে ঢাকা আকাশ, তার সঙ্গে থেকে থেকে ঝিরঝিরে বৃষ্টি এবং ভোর ও সন্ধ্যের দিকে হালকা কুয়াশার দাপট মিলিয়ে পুরো শীতকালের আবহ তৈরি হয়েছে দিল্লির আনাচে কানাচে।
কেবল ঠাণ্ডাই নয়, জলবায়ুর এমন খামখেয়ালিপনায় গত চার বছরের মধ্যে অক্টোবরের আর্দ্রতম দিন হিসেবেও নথিভুক্ত হয়েছে গতকালের দিনটি। শুক্রবার সকাল সাড়ে ৮টা পর্যন্ত সফদারজং স্টেশনে মোট ১২৩.৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যেখানে অক্টোবর মাসে গড়ে মাত্র ১৫.১ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়ে থাকে। এমনকি আর্দ্রতার পরিমাণও সকাল ও সন্ধ্যা, দুই সময়েই ছিল ১০০ শতাংশের কোঠায়।
তবে পারদ পতনের এই মহাজাগতিক বা প্রাকৃতিক জটলার একটি অত্যন্ত ইতিবাচক দিক প্রত্যক্ষ করেছেন দিল্লিবাসী। অকাল বৃষ্টিতে ধুয়েমুছে সাফ হয়ে গিয়েছে বায়ুদূষণের বিষাক্ত চাদর। সেন্ট্রাল পলিউশন কন্ট্রোল বোর্ড (CPCB) এবং ‘সেন্টার ফর রিসার্চ অন এনার্জি অ্যান্ড ক্লিন এয়ার’ (CREA)-এর তথ্য বিশ্লেষণ করে জানা যাচ্ছে, গত এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে চলতি বছরেই অক্টোবর মাসে দিল্লির বাতাস সবচেয়ে নির্মল ও পরিচ্ছন্ন ছিল। ২০১৫ সালের পর এত কম গড় দূষণ আর দেখা যায়নি। শুক্রবার দিল্লির সার্বিক এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স (AQI) নেমে এসেছিল মাত্র ৬০-এ, যা ২০২২ সালের ১০ অক্টোবরের (AQI ৪৪) পর সর্বনিম্নের রেকর্ড।
শনিবার সকালেও দিল্লির বাতাসের মান ছিল বেশ স্বস্তিদায়ক ‘মাঝারি’ (Moderate) বিভাগে, যার গড় সূচক ১১০। শহরের বিভিন্ন অঞ্চলের বায়ুমান পরীক্ষা করে দেখা গিয়েছে, বুরারিতে সূচক ছিল ৬৫, বসুন্ধরা এনক্লেভে ১০১, উত্তম নগরে ৯২, ঘোঘায় ৪৬ এবং নরেলার এনআইএইচে ৭৬। অন্যান্য এলাকা যেমন শাদীপুর (১৩১), সিড়িফোর্ট (১১৬), চাঁদনি চক (১২৮), আর কে পুরম (১১৮), আনন্দ বিহার (১১০) এবং রোহিণী (১৪৭)-র সূচকও দূষণের সেই চেনা ও বিপজ্জনক মাত্রার চেয়ে অনেক নিচে। বিষাক্ত ধোঁয়াশা ও দূষণের জন্য কুখ্যাত রাজধানীর বুকে দীপাবলি বা উৎসবের মরশুমের ঠিক মুখে এই নির্মল আবহাওয়া নিশ্চিতভাবেই বড়সড় স্বস্তি এনে দিয়েছে আমজনতার মনে।
আবহাওয়াবিদদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বব্যাপী আবহাওয়ার ধরণ যেভাবে বদলাচ্ছে, দিল্লির এই অকাল বৃষ্টি ও রেকর্ড ভাঙা পারদ পতন তারই এক বাস্তব প্রতিফলন। একদিকে দূষণহীন ঝকঝকে নীল আকাশ আর অন্যদিকে অক্টোবরের শেষেই কনকনে ঠাণ্ডার পরশ— দুই মিলিয়ে এক ঐতিহাসিক এবং অত্যন্ত মনোরম অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে সূচনা হল উত্তর ভারতের আসন্ন দীর্ঘ শীতকালের।
Leave a comment