অকল্যান্ড: নিউজিল্যান্ড সফরের জন্য সম্প্রতি ভারতীয় একদিনের এবং টেস্ট দল ঘোষণা করেছে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই)। সেই দীর্ঘ প্রেস বিজ্ঞপ্তির ভিড়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সূক্ষ্ম তথ্য চোখ এড়িয়ে যাওয়াটা অস্বাভাবিক নয়।
যেমনটা আন্তর্জাতিক স্তরেও ঘটেছিল, কিউয়িদের বিরুদ্ধে সিরিজের চতুর্থ ও পঞ্চম ওডিআই ম্যাচে শুভমন গিল সহ টেস্ট স্কোয়াডের একাধিক মহাতারকার অনুপস্থিতিতে ভারতীয় দলের সহ-অধিনায়কের গুরুদায়িত্ব তুলে দেওয়া হয়েছে ঈশান কিশানের কাঁধে।
প্রথম দৃষ্টিতে এটিকে স্রেফ একটি সাময়িক প্রশাসনিক বা অধিনায়কত্বের রদবদল মনে হতে পারে। কিন্তু এর গভীরে নজর রাখলে স্পষ্ট হয়ে যায়, দক্ষিণ আফ্রিকায় আয়োজিত হতে চলা ২০২৭ সালের ৫০ ওভারের বিশ্বকাপকে পাখির চোখ করে জাতীয় নির্বাচক ও দল পরিচালন সমিতি ঠিক কীভাবে তাঁদের ভবিষ্যতের নীল নকশা সাজাচ্ছেন।
বিশ্বকাপের পনের জনের চূড়ান্ত দল তৈরি করা যে কতটা জটিল ও কঠিন এক শিল্প, তা ক্রিকেট বিশ্ব ভালো করেই জানে। দ্বি-পাক্ষিক সিরিজে আনলিমিটেড স্কোয়াড বেছে নেওয়ার সুযোগ থাকলেও বিশ্বকাপে প্রতিটি দেশকে নির্দিষ্ট ১৫ জন ক্রিকেটারের দলই পাঠাতে হয়।
আরও পড়ুন: সেডন পার্কে কিষাণ-ধামাকা! নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে তাণ্ডব, ২ হাজারি ক্লাবে ঈশান
ফলে সামান্য একটা ভুলের জন্য অনেক প্রতিভাবান ক্রিকেটারের স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। ২০১১ সালের দেশের মাটিতে বিশ্বকাপে ঠিক এই নির্মম সিদ্ধান্তেরই শিকার হতে হয়েছিল তরুণ রোহিত শর্মাকে।
সেই পুরনো ক্ষত ও আক্ষেপই আজ চল্লিশ বছর বয়সে পৌঁছেও হিটম্যানের অদম্য ইচ্ছেশক্তি ও খিদে ধরে রাখার অন্যতম প্রধান জ্বালানি। গত চার মাসে চারটি ওডিআই ইনিংসে দু’টি শতরান এবং একটি ৯২ রানের বিস্ফোরক ইনিংস খেলে নিজের স্বপ্নকে পুনরুজ্জীবিত করেছেন রোহিত।
তবে রোহিতের এই অভাবনীয় প্রত্যাবর্তনের এক পরোক্ষ প্রভাব পড়েছে অন্য এক উদীয়মান তারকার স্বপ্নের ওপর, তিনি যশস্বী জয়সওয়াল। এক সময় রোহিত শর্মার জায়গা যখন অনিশ্চিত মনে হচ্ছিল, তখন প্রথম ছয় ইনিংসে জোড়া সেঞ্চুরি করা তরুণ ওপেনার জয়সওয়াল ছিলেন তাঁর যোগ্য উত্তরসূরি। কিন্তু বর্তমানে পরিস্থিতিতে জুন মাসে আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে অপরাজিত ১১০ রান করার পর থেকে একদিনের দলে সুযোগ পাননি যশস্বী।
পরিসংখ্যান বলছে, কেবল দ্বিপাক্ষিক সিরিজ হলে তিনি নিশ্চিতভাবেই ব্যাক-আপ ওপেনার হতেন। কিন্তু বিশ্বকাপের মতো মেগা টুর্নামেন্টের ১৫ জনের স্কোয়াডে এমন কোনও বিশেষজ্ঞ ব্যাক-আপ ওপেনার রাখা সম্ভব নয়, যিনি বল করেন না কিংবা উইকেটকিপিংয়ের দক্ষতা নেই এবং ৪১টি লিস্ট-এ ম্যাচের মধ্যে ৩টির বেশি তিন নম্বরের নিচে ব্যাট করেননি।
ঠিক এই জায়গাটিতেই আবির্ভাব ঈশান কিশানের। যাকে ক্রিকেটের ভাষায় বলা যায় এক আদ্যন্ত ‘সুইস আর্মি নাইফ’। দলের প্রয়োজনে যে কোনও দরকারি অস্ত্র হয়ে উঠতে সক্ষম। ঈশান কি ভারত দলের তৃতীয় সেরা ওপেনার? নাকি দ্বিতীয় সেরা কিপার-ব্যাটার? কিংবা বিরাট কোহলি, শ্রেয়স আইয়ার ও কে এল রাহুলের পর দলের অন্যতম ভরসাযোগ্য মিডল-অর্ডার ব্যাটার?
আলাদা আলাদা প্রশ্ন গুলোর একক উত্তর হয়তো ঈশান নন, কিন্তু এই তিনটির সমন্বয়ে যদি কোনও একটি নাম বেছে নিতে হয়, তবে ঈশানের বিকল্প এই মুহূর্তে ভারতীয় ক্রিকেটে দ্বিতীয় কেউ নেই। বিশ্বকাপে ১২ নম্বর ক্রিকেটার হিসেবে ঈশান কিশান স্কোয়াডে থাকা মানে ১৩, ১৪ ও ১৫ নম্বর স্থান নির্বাচনের ক্ষেত্রে নির্বাচকদের হাতে অবাধ নমনীয়তা বা ফ্লেক্সিবিলিটি চলে আসা।
আরও পড়ুন: সিরিজ জিতেও, হ্যামিলটনে সেইফার্ট-ফিলিপস তান্ডবে চূর্ণ ভারত!
২০২৩ সালের বিশ্বকাপেও ঈশানের এই বহুমুখী ক্ষমতাই তাঁকে দলে অগ্রাধিকার দিয়েছিল। যদিও টপ অর্ডারে ভারতের সীমাহীন প্রতিভার কারণে দ্রুততম দ্বি-শতক হাঁকানো সত্ত্বেও তিনি প্রথম একাদশে নিয়মিত সুযোগ পাননি। তবে যশস্বীর মতো স্রেফ একটি নির্দিষ্ট ভূমিকায় আটকে না থেকে ঈশান পুরো টপ সিক্সের যে কোনও পজিশনে ব্যাট করতে এবং গ্লাভস হাতে উইকেটের পিছনে দাঁড়াতে পারেন।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রত্যাবর্তনের পর থেকেই টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে নিজেকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছেন ঈশান। তা সে ওপেনিং হোক কিংবা তিন নম্বর পজিশনে পেস ও স্পিনের বিরুদ্ধে যে কোনও পরিস্থিতিতে তাণ্ডব চালানো, তিনি তা অনায়াসে করছেন।
নিউজিল্যান্ড সফর চলাকালীন যখন ওডিআই দলের অন্য সদস্যরা অকল্যান্ডে কঠোর অনুশীলন করছিলেন, তখন হ্যামিল্টনে টি-টোয়েন্টি সিরিজের শেষ ম্যাচে মাত্র ৩২ বলে ৬১ রানের এক দুর্ধর্ষ ইনিংস খেলে আইসিসি টি-টোয়েন্টি ব্যাটার র্যাঙ্কিংয়ে তিন নম্বর স্থানে থাকা ঈশান নিজের স্থান আরও মজবুত করেন।
ওডিআই ফর্ম্যাটেও যে তিনি সমান কার্যকর, তা আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে চার নম্বরে নেমে ৭৯ বলে ১২৫ রানের ইনিংসই প্রমাণ করে। আন্তর্জাতিক ওডিআই ক্রিকেটে ওপেনার হিসেবে তাঁর গড় ৬১.৮৭ এবং মিডল-অর্ডারে তাঁর স্ট্রাইক রেট ৯৭.৪৫।
যদিও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফেরার পর একদিনের ম্যাচে খুব বেশি খেলার সুযোগ তিনি পাননি, তবুও নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে চতুর্থ ও পঞ্চম ওডিআই-এ শুভমন গিল এবং কে এল রাহুল টেস্ট স্কোয়াডে যোগ দিতে চলে গেলে তাঁর খেলা শতভাগ নিশ্চিত।
তবে ভারতের দূরদর্শী স্বার্থের দিকে তাকালে, সিরিজের প্রথম কয়েকটি ম্যাচেও ঈশানকে বিভিন্ন পজিশনে ব্যাটিংয়ের সুযোগ দিয়ে পরখ করে নেওয়া উচিত। কারণ, ভারতের কিটে যে বহুমুখী ‘সুইস আর্মি নাইফ’ রয়েছে, তার ধার বজায় রাখতে নিয়মিত ম্যাচ প্র্যাকটিসের চেয়ে বড় কোনও বিকল্প হতে পারে না।
Leave a comment