মুম্বই: আলোর উৎসব দেওয়ালিতে বাজি না ফাটিয়ে পরিবেশবান্ধব ও দূষণমুক্ত উদযাপনের পরামর্শ দিয়ে শেষমেশ রাজনৈতিক তোপের মুখে পড়লেন বলিউড অভিনেত্রী দিয়া মির্জা। বৃহন্মুম্বই পুরসভার (বিএমসি) একটি সচেতনতামূলক ভিডিও প্রচারকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে তীব্র রাজনৈতিক চাপানউতোর।
শাসক দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) প্রবল বিরোধিতার মুখে পড়ে শেষ পর্যন্ত ভিডিওটি নিজেদের সামাজিক মাধ্যমের হ্যান্ডেল থেকে মুছে ফেলতে বাধ্য হয়েছে মুম্বই পুরসভা। তবে এই বিতর্কের পর সংবাদসংস্থা আইএএনএস (IANS)-কে দেওয়া এক বিশেষ বিবৃতিতে নিজের অবস্থানে অনড় থেকে কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ‘রহনা হ্যায় তেরে দিল মেঁ’ খ্যাত তারকা। দিয়া স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, বায়ুদূষণ কোনও নির্দিষ্ট ধর্মীয় বিষয় নয়, এটা সরাসরি জনস্বাস্থ্যের মতো এক অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়।
ঘটনার সূত্রপাত বিএমসি-র দেওয়ালি সচেতনতামূলক প্রচারকে ঘিরে। প্রতি বছরের মতো এবারও আলোর উৎসবের মৌসুমে বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে একটি বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছিল বিএমসি।
যেখানে সাধারণ মানুষকে ধোঁয়া ও শব্দদূষণ এড়িয়ে সচেতনভাবে পরিবেশবান্ধব উপায়ে দেওয়ালি পালনের আর্জি জানানো হয়। পুরসভার এই উদ্যোগে যোগ দিয়ে সচেতনতামূলক বার্তা রেকর্ড করেছিলেন বিনোদন ও ক্রীড়া জগতের একাধিক প্রখ্যাত ব্যক্তিত্ব। সেই তালিকায় দিয়া মির্জা ছাড়াও ছিলেন বর্ষীয়ান অভিনেত্রী মাধুরী দীক্ষিত এবং ভারতীয় তারকা ক্রিকেটার অজিঙ্ক রাহানে।
কিন্তু বিএমসি-র সেই ভিডিও প্রচার প্রকাশ্যে আসতেই বেঁকে বসে মুম্বই বিজেপি। বিশেষ করে দিয়া মির্জার অংশগ্রহণে তীব্র আপত্তি জানায় পদ্ম শিবির। মুম্বই বিজেপি সভাপতি তাড়া সাটম সরাসরি প্রশ্ন তোলেন, সনাতন সংস্কৃতি বা ধর্মীয় উৎসব পালনের বিষয়ে কেন বাইরে থেকে কাউকে উপদেশ দিতে হবে?
সমাজমাধ্যম ‘এক্স’-এ (সাবেক টুইটার) ক্ষোভ উগরে দিয়ে বিজেপি নেতা লেখেন, ‘‘কী ভাবে দেওয়ালি পালন করতে হবে, তা দিয়া মির্জার কাছ থেকে শেখার বা পাঠ নেওয়ার প্রয়োজন আমাদের নেই। আমাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের শিকড় অত্যন্ত গভীর।’’ বিজেপি নেতার এই আক্রমণের পর তড়িঘড়ি দেওয়ালি সচেতনতার ওই বিতর্কিত ভিডিওটি নিজেদের সমস্ত সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম থেকে মুছে দেয় বৃহন্মুম্বই পুরসভা।
আরও পড়ুন: বদলের বাংলায় রেকর্ড দীপাবলি! ১,১১,১১১ প্রদীপে সাজবে নিউটাউন, মুখ্যমন্ত্রীকে ঘিরে বড় চমক!
পুরসভার এই পদক্ষেপে রাজনৈতিক মহলে হইচই শুরু হতেই বিবৃতি প্রকাশ করেন পরিবেশ সচেতনতার কাজে যুক্ত অভিনেত্রী দিয়া মির্জা। তিনি বলেন, ‘‘দেওয়ালি উৎসব হল অজ্ঞতার ওপর জ্ঞানের জয়, অন্ধকারের ওপর আলোর জয় এবং হতাশার ওপর আশার জয়ের এক মহান প্রতীক। ওই ভিডিও বার্তাটি সম্পূর্ণরূপে জনস্বার্থেই রেকর্ড করা হয়েছিল, যাতে সবাই সুস্থ ও সচেতনভাবে উৎসব উদযাপন করতে উৎসাহিত হন। বায়ুদূষণ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখার মতো একটি জনস্বাস্থ্য সংক্রান্ত বিষয়। দূষণ কমানোর প্রতিটি ইতিবাচক প্রচেষ্টাই সবার জন্য এক সুস্থ ও ভালো পরিবেশ গড়ে তোলার দিশায় এক একটা জরুরি পদক্ষেপ।’’
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে শাসক-বিরোধী রাজনৈতিক তর্জাও চরম রূপ নিয়েছে। বিজেপি-র একাংশ যখন দিয়া মির্জার বার্তার বিরুদ্ধে সুর চড়িয়েছে, তখন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী তথা আরপিআই (অঠাওলে) প্রধান রামদাস অঠাওলে কিছুটা অন্য সুর গেয়েছেন। আইএএনএস-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি স্পষ্ট জানান, এই বিষয়টিকে কোনও নির্দিষ্ট ধর্মের সঙ্গে যুক্ত করে দেখা একেবারেই উচিত নয়।
রামদাস অঠাওলে বলেন, ‘‘দিয়া মির্জা একজন প্রতিষ্ঠিত অভিনেত্রী এবং তিনি মুসলিম সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু এটা কোনও নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের বিষয় নয়। ভারত এমন একটি দেশ যেখানে ড. বি আর আম্বেদকরের দেওয়া সংবিধান দেশের প্রতিটি নাগরিককে নিজ নিজ ধর্ম ও উৎসব নিজের মতো করে পালনের পূর্ণ অধিকার দিয়েছে।’’
অঠাওলে আরও যোগ করেন, ‘‘যেমন মুসলিম ভাই বোনেরা ইদ ও রমজান উদযাপন করেন এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষও তাতে অংশ নিয়ে সেই ধর্মীয় রীতিকে সম্মান জানান, ঠিক তেমনি হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ সানন্দে দেওয়ালি পালন করেন। বাজি না ফাটলে দেওয়ালির আনন্দ বা তাৎপর্য খানিকটা ম্লান হয়ে যায় ঠিকই, তবে একই সঙ্গে মাত্রাতিরিক্ত দূষণ নিয়েও আমাদের সবাইকে সমান সচেতন হতে হবে।’’
দেওয়ালির মুখে পরিবেশ সচেতনতা বনাম ধর্মীয় প্রথার এই টানাপোড়েন ঘিরে এখন তোলপাড় মহারাষ্ট্রের রাজনীতি। এক দিকে সচেতনতার আর্জি, অন্যদিকে ঐতিহ্যে আঘাতের পাল্টা যুক্তি, দুইয়ের সংঘাতে দীপাবলির আগেই উত্তপ্ত মুম্বইয়ের রাজনৈতিক মহল।
Leave a comment