ফ্লোরিডা: ৩৫ হাজার ফুট উচ্চতা থেকে তখন নেমে আসছিল একটি ছোট বাণিজ্যিক জেট।
হঠাৎই মাঝ-আকাশে চরম যান্ত্রিক ত্রুটি এবং তীব্র বরফ জমার কবলে পড়ে বিমানটি। এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলে (এটিসি) পৌঁছায় পাইলটের শেষ বাঁচার আকুতি— ‘‘মে ডে, মে ডে! আমরা ১০ হাজার ফুট প্রতি মিনিট গতিতে নীচের দিকে নামছি!’’ তার পরেই সব শেষ।
রবিবার মার্কিন সময় দুপুরে দক্ষিণ ফ্লোরিডার জনবসতিপূর্ণ এলাকার মূল সড়কে ক্ষেপণাস্ত্রের বেগে মুখ থুবড়ে পড়ল লিয়ারজেট ৬০ মডেলের ওই বিমানটি। বিকট শব্দে বিস্ফোরণ এবং মুহূর্তের মধ্যে আগুনের গোলায় ঢেকে যাওয়া এই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় পাইলট-সহ বিমানে থাকা সমস্ত যাত্রীরই মৃত্যু হয়েছে।
মার্কিন পরিবহণ সচিব সিন ডাফি এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, রবিবার স্থানীয় সময় দুপুর ১২টা ৫০ মিনিট নাগাদ পাম বিচ কাউন্টির ক্রিসহ্যাভেন এলাকায় এই দুর্ঘটনাটি ঘটে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সুপরিচিত মার-এ-লাগো রিসর্ট থেকে মাত্র ১৪ কিলোমিটার দূরে এই বিপর্যয় ঘটে। টেক্সাসের অস্টিন-বার্গস্ট্রম আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের বাহামাসের উদ্দেশে রওনা দিয়েছিল বিমানটি। পথেই দক্ষিণ ফ্লোরিডার আকাশসীমায় এসে আবহাওয়ার চরম প্রতিকূলতা এবং যান্ত্রিক ত্রুটির মুখে পড়ে সেটি।
প্রাথমিক তদন্তে জানা গিয়েছে, দুর্ঘটনার সময় ওই এলাকায় আকাশ মেঘলা ছিল, প্রবল বৃষ্টির সঙ্গে বজ্রপাত হচ্ছিল এবং ১৫ থেকে ২৫ মাইল বেগে বাতাস বইছিল। ৩৫ হাজার ফুট উঁচুতে ওড়ার সময় প্রথম ঝাঁকুনি অনুভূত হয়।
প্রাথমিক ভাবে জানা গিয়েছে, বিমানের গায়ে তীব্র বরফ জমায় তা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। এরপরই বিমানটিকে আরও উঁচুতে নিয়ে যাওয়ার অনুমতি চাওয়া হয়। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। পাইলট ও ক্রুরা লড়াই চালালেও বিমানটি অত্যন্ত দ্রুত গতিতে উচ্চতা হারাতে শুরু করে।
সামনে আসা রোমহর্ষক এটিসি অডিও রেকর্ডিং অনুযায়ী, পাইলটের কণ্ঠস্বর দ্রুত আতঙ্কজনক রূপ নেয়। তিনি জানান, বিমানটি প্রথমে প্রতি মিনিটে ১০ হাজার ফুট এবং পরবর্তীতে ২০ হাজার থেকে ৩০ হাজার ফুট গতিতে নিচের দিকে নামতে শুরু করে।
বিমানের বাইরে তখন তাপমাত্রা ছিল মাইনাস ৪৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। শেষ মুহূর্তে পাইলট রেডিওতে আর্তনাদ করে ওঠেন, ‘‘সেভেন টু টু ব্রাভো ডেল্টা… আমরা নামছি— মে ডে, মে ডে! আমরা ১০,০০০ ফুট প্রতি মিনিটে নিচে নামছি। একেবারে রাস্তায় গিয়ে আছাড় খেতে চলেছে আমাদের বিমান।’’
প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান অনুযায়ী, লিয়ারজেট ৬০ বিমানটি যেন কোনো যুদ্ধক্ষেত্রের ক্ষেপণাস্ত্রের মতো আকাশ থেকে খাড়া নেমে আসে। বিমানের নাক ছিল মাটির দিকে এবং লেজ আকাশের দিকে। নিচে পড়ার আগে সেটি এলাকার কয়েকটি গাছ ও বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে মূল সড়কের ঠিক পাশেই আছড়ে পড়ে। রাস্তার ওপর যেখানে বিমানটি পড়ে, সেখানে একটি বিশাল গর্তের সৃষ্টি হয় এবং প্রচণ্ড বিস্ফোরণে মুহূর্তেই চারপাশ কালো ধোঁয়ায় ঢেকে যায়।
সবচেয়ে মর্মান্তিক বিষয় হল, বিমানটি যেখানে আছড়ে পড়েছে তার থেকে মাত্র কয়েক হাত দূরেই একাধিক জনবহুল বসতবাড়ি এবং ব্যস্ত রাস্তা ছিল। সেই সময় রাস্তায় অবিরাম গাড়ি চলাচল করছিল। পথচলতি কিছু গাড়ির ক্যামেরায় সেই ভেঙে পড়ার ছবি বন্দি হয়েছে। যার সত্যতা যাচাই করেনি হিডেন স্টোরিজ নিউজ। যা দেখলে যে কারও রক্ত হিম হয়ে যাবে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বিমানটি যদি আর সামান্য এদিক-ওদিক পড়ত, তবে তা সরাসরি কোনো চলন্ত গাড়ি কিংবা জনবহুল বাড়িতে আঘাত হানত, যার জেরে প্রাণহানির সংখ্যা আরও বহু গুণে বেড়ে যেতে পারত।
আরও পড়ুন: গণপিটুনিতে রক্তের দাগ! বেতনবৃদ্ধির দাবিতে ঢাকায় শ্রমিক অসন্তোষ, নামল বিজিবি
দুর্ঘটনার তীব্রতায় এলাকার বেশ কয়েকটি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ঘটনার পরই পুলিশ মিলিটারি ট্রেইলের সমস্ত লেন সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয় এবং সাধারণ মানুষের যাতায়াতের জন্য বিকল্প পথ ব্যবহারের নির্দেশ জারি করে।
আমেরিকার ফেডেরাল অ্যাভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফএএ) এবং ন্যাশনাল ট্রান্সপোর্টেশন সেফটি বোর্ড (এনটিএসবি)-এর উচ্চপর্যায়ের তদন্তকারী দল ইতিমধ্যেই ঘটনাস্থলে পৌঁছে ব্ল্যাক বক্স ও অন্যান্য ধ্বংসাবশেষ খতিয়ে দেখা শুরু করেছে। কী কারণে পাইলট চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিলেন, তা খতিয়ে দেখছে মার্কিন পরিবহন দফতর। জনবহুল এলাকায় এই আকস্মিক বিমান বিপর্যয়ে গোটা ফ্লোরিডাজুড়ে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।
Leave a comment