কলকাতা: ইউনেস্কোর নাম ভাঁড়িয়ে দুর্গাপুজোর প্রিভিউ শো-এর পাস বিক্রির চাঞ্চল্যকর দুর্নীতি মামলায় এবার আরও ঘনীভূত হচ্ছে রহস্যের জাল। প্রাক্তন মন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেনকে গ্রেপ্তারের মাত্র তিনদিনের মাথায়, শনিবার লালবাজারে এক বিশেষ তদন্তকারী দলের (সিট) মুখোমুখি হলেন তাঁর স্ত্রী মধুছন্দা সেন। একটানা দীর্ঘ সময় ধরে চলে এই ম্যারাথন জেরা। রাত আটটা পর্যন্ত দফায় দফায় তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন গোয়েন্দারা। আর এই জেরার মুখেই সামনে এসেছে একের পর এক বিস্ফোরক তথ্য।
যে সংস্থার ব্যানারে এই পুজোর পাস বিক্রি হয়েছিল, তার নাম ‘মাস আর্ট’। এই সংস্থার প্রেসিডেন্ট পদে ছিলেন খোদ মধুছন্দা সেন নিজে। এমনকি, বেআইনিভাবে ইউনেস্কোর লোগো ব্যবহারের অনুমতি থেকে শুরু করে সংস্থার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র— সব জায়গাতেই তাঁর সই ছিল। গত জুন মাসে বউবাজার থানায় এই বিষয়ে যে এফআইআর দায়ের হয়, তাতে দু’নম্বার অভিযুক্ত হিসেবে নাম ছিল মধুছন্দারই। প্রথম অভিযুক্ত ছিলেন তাঁর স্বামী ইন্দ্রনীল সেন। গোয়েন্দারা জানিয়েছেন, দীর্ঘ জেরার মুখে মধুছন্দা দাবি করেছেন যে, ‘মাস আর্ট’-এর অন্য কর্তারা তাঁকে যেখানে যেখানে সই করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন, তিনি ঠিক সেখানেই সই করেছিলেন। এই জেরার পরই প্রশ্ন উঠছে, তবে কি স্বামীর চাপেই এই সমস্ত নথিতে চোখ বুজে সই করেছিলেন তিনি? নাকি এর পেছনে অন্য কোনো গভীর চক্রান্ত রয়েছে? তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।
মধুছন্দাকে জিজ্ঞাসাবাদ করার পর ‘মাস আর্ট’-এর সম্পাদক ধ্রুবজ্যোতি বসু সহ এফআইআর-এ নাম থাকা অন্য অভিযুক্তদের নামও উঠে এসেছে। গোয়েন্দারা পরিকল্পনা করছেন, খুব শীঘ্রই এই অভিযুক্তদের মুখোমুখি বসিয়ে জেরা করা হবে। পাশাপাশি, তদন্তে নেমে পুলিশ জানতে পেরেছে যে, ইন্দ্রনীল সেনের একটি অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সংস্থা ‘থার্ড লাইন ক্রিয়েশন’ থেকে প্রায় ৬৬ লক্ষ টাকা মাস আর্ট সোসাইটিকে পাঠানো হয়েছিল। যার মধ্যে ২২ লক্ষ টাকারও বেশি অর্থ ‘আইস্কেপ’ ও ‘মায়রা’ নামের দুটি ভিন্ন সংস্থায় স্থানান্তরিত হয়। পুলিশের কাছে খবর রয়েছে যে, এই সংস্থা দুটি সরাসরি ইন্দ্রনীল সেনের মেয়ের দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত হতো। আর সেই কারণেই এবার প্রাক্তন মন্ত্রীর মেয়েকেও লালবাজারে তলব করে জেরা করা হতে পারে বলে জোরালো সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে, এই গোটা দুর্নীতি চক্রে যুক্ত থাকা ওই তিনটি সংস্থার সাধারণ কর্মচারীদেরও খুব শীঘ্রই তলব করে জিজ্ঞাসাবাদ করতে চান তদন্তকারী গোয়েন্দারা। ইতিমধ্যেই বিভিন্ন পুজো উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে প্রচুর গুরুত্বপূর্ণ নথি ও তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। পুজো উদ্যোক্তারা পুলিশকে জানিয়েছেন যে, ইউনেস্কোর লোগো আসল ভেবেই তাঁরা এই প্রিভিউ শো-তে অংশগ্রহণ করেছিলেন। মাস আর্টের কর্মীরা নিজে পুজো মণ্ডপগুলিতে গিয়ে সব আয়োজন করতেন, যার বিনিময়ে পুজো কমিটিকে যৎসামান্য টাকা এবং মণ্ডপে একটি করে এলইডি গেট লাগানোর সুযোগ দেওয়া হতো। কিন্তু পাস বিক্রির বিরাট অঙ্কের টাকা কোথায় গেল, সেটাই এখন পুলিশি তদন্তের মূল কেন্দ্রবিন্দু।
Leave a comment